হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল আবারও যুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য ইকনোমিস্ট। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলে তিন বছর আগে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হয়েছিল, তা পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে।
ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ও টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)-এর মধ্যে হওয়া শান্তি চুক্তি এখন কার্যত ভঙ্গের পথে। সীমান্ত এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে এবং ইথিওপিয়ান সেনাবাহিনী ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। টিপিএলএফ ৭ নভেম্বর অভিযোগ তোলে যে সরকার তাদের বিরুদ্ধে ‘নির্মূল করার কৌশল’ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ শুধু টাইগ্রে অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হবে না, বরং গোটা হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেবে, যা বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংঘাতের অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে
টাইগ্রে অঞ্চলে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু ইথিওপিয়ার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল জুরে। বর্তমানে এই অঞ্চলটি এমনিতেই নানা সংঘাতে অস্থির। সুদানে চলছে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। ইরিত্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরশাসনের কারণে সংকটে রয়েছে।
ইথিওপিয়া সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে চায়। কারণ ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া আলাদা দেশ হওয়ার পর থেকে ইথিওপিয়া সাগরপথ হারিয়ে ফেলে। এই দাবি ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। অনেকে মনে করেন, ইরিত্রিয়ার বন্দরগুলো নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হতে পারে। এমনকি ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে, যদি পরিস্থিতি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে যদি ইরিত্রিয়ান সেনারা টিগ্রের পক্ষে লড়াইয়ে যুক্ত হয়। একদিকে ইথিওপিয়া-টিগ্রে সংঘাত, অন্যদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া উত্তেজনা, সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ শরণার্থী হয়ে পড়তে পারে, অস্ত্র পাচার বাড়তে পারে এবং মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

শক্তিধর দেশগুলোর ভূমিকা
এখনো সময় আছে পুরো পরিস্থিতি ঠিক করার। এর জন্য দরকার আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি ইথিওপিয়াকে রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। অপরদিকে ইরিত্রিয়া সম্প্রতি মিশরের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে।
এই দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি আবিয় আহমেদ এবং ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাইছেন। তাই আমেরিকার পক্ষে এখন চাপ প্রয়োগ করা সহজ।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়নি, বরং ইথিওপিয়ার সামরিক অবস্থানকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছিল। কিন্তু এবার তারা ভিন্ন নীতি নিয়েছে। মার্কিন কূটনীতিকরা ইথিওপিয়া ও টাইগ্রে-উভয় পক্ষকেই শান্ত থাকা এবং চুক্তিতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন। সেপ্টেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফ্রিকা বিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বুলোস ইথিওপিয়ায় গিয়ে আবিয়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং সতর্ক করেন যে, জোর করে সমুদ্রপথ দখলের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। এছাড়া, টাইগ্রের কিছু নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শান্তি ফেরাতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, আমিরাত ও মিশর একসঙ্গে চাপ তৈরি করে ইথিওপিয়া এবং টিপিএলএফকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। ২০২২ সালের শান্তিচুক্তিটিকে আবার কার্যকর করতে পারলেই সংঘাত ঠেকানো সম্ভব।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংকটে মধ্যস্থতা করেছেন, যেমন পূর্ব কঙ্গো ও কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড বিরোধ। যদিও এসব সমাধান পুরোপুরি নিখুঁত নয়, তবুও যুদ্ধ প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছে।
সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তা থামানোই সবচেয়ে সহজ। যুদ্ধ একবার শুরু হলে তা থামানো অনেক কঠিন হয়ে যায়। তাই ইথিওপিয়ার সরকার এবং টাইগ্রে নেতৃত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকেও এখন সবচেয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।