মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান এক অনন্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশটিকে আমেরিকা ও ইসরায়েল বিশেষভাবে সমীহ করে মূলত একটি কারণে—ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার শুধু সংখ্যা বা বৈচিত্র্যের দিক দিয়েই নয়, ভৌগোলিক কভারেজের ক্ষেত্রেও শত্রুপক্ষকে আতঙ্কিত করার মতো। যদিও ইরানের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা সীমিত, তবে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা আকাশপথে নিজেদের দুর্বলতাকে সামলাতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার রয়েছে ইরানের কাছেই। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইআইএসএসের হিসেবে, দেশটির কাছে ৫০টির বেশি মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চার ও শতাধিক স্বল্পপাল্লার লঞ্চার আছে। ‘সেজিল’, ‘খেইবার’, ‘হাজ কাসেম’সহ নানাবিধ ক্ষেপণাস্ত্র কয়েকশ থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রদর্শন করে ইরান প্রমাণ করেছে, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তারা কেবল পিছিয়ে নেই, বরং নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের ভাণ্ডারে রয়েছে ক্রুজ মিসাইলও। ‘কেএইচ–৫৫’ নামের ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এবং পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। সমুদ্রপথে শত্রুর নৌবাহিনী মোকাবেলায় রয়েছে ‘খালিদ ফারয’ নামের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো ইসরায়েল, সৌদি আরব থেকে শুরু করে গোটা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে কার্যত ইরানের পাল্লার মধ্যে রেখেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগোচ্ছে দেশটি। দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করে আসছে ইরান। ‘মোহাজের–১০’ নামের সর্বশেষ ড্রোন একটানা ২৪ ঘণ্টা উড়তে পারে এবং ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। আবার সীমাবদ্ধতা কাটাতে তারা আত্মঘাতী ড্রোনের দিকেও ঝুঁকছে, যা শত্রু ঘাঁটি অচল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ইরানের কাছে এখনো পরমাণু অস্ত্র আছে বলে প্রমাণ মেলেনি। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, তারা এর পথে এগোচ্ছে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনলেও যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়ানোর পর আশঙ্কা বেড়েছে। তাছাড়া রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা উপকরণ পাওয়াও ইরানের জন্য অসম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে ইরানকে সমীহ করা ছাড়া আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে তাই ইরানকে সবসময় বড় ফ্যাক্টর হিসেবেই ধরা হয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, এএফপি, ব্লুমবার্গ, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ও দ্য আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন