নিয়োগকর্তা না প্রার্থী–চাকরির বাজারে এআই ব্যবহারে এগিয়ে কারা?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
নিয়োগকর্তা না প্রার্থী–চাকরির বাজারে এআই ব্যবহারে এগিয়ে কারা?
ছবি: ফ্রিপিক

চ্যাটজিপিটি আসার পরে অনেক নিয়োগকর্তা স্বস্তি অনুভব করেছিলেন এই ভেবে যে, এবার হয়তো চাকরির বিজ্ঞাপন লেখা, সাক্ষাৎকারের সময়সূচি ঠিক করা বা প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করার তথ্য জানানোর মতো কাজে ঝামেলা কমে যাবে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের বাস্তবতা তারা দেখতে পাননি। এআই দিয়ে তৈরি আবেদনের এক বিশাল ঢেউ তাদের ওপর আছড়ে পড়েছে।

চাকরির আবেদন করার জন্য সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিনহাউসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পর থেকে একজন প্রার্থীর গড়ে চাকরির আবেদনের হার বেড়েছে প্রায় ২৩৯ শতাংশ। LazyApply ও aiApply-এর মতো পেইড সেবাগুলো নিখুঁতভাবে সিভি ও কভার লেটার বানিয়ে দিতে পারে। এআই-এর অবাধ ব্যবহার অনেক কোম্পানিতে গুপ্তচর ও প্রতারকদের অনুপ্রবেশ সহজ করে দিয়েছে। গত মাসে অ্যামাজন উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের পাঠানো ১ হাজার ৮০০টি আবেদন আটকে দেয়, যারা রিমোট আইটি চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি চারজন আবেদনকারীর মধ্যে একজনই হতে পারে ভুয়া।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, চাকরির আবেদনপত্রের এই প্রবাহ ঠেকানোর জন্য নিয়োগকর্তারা নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কেউ কেউ বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থীদের অনুরোধ করছেন, সিভি তৈরির সময় তারা যেন চ্যাটবট ব্যবহার না করেন। এআই ল্যাব অ্যানথ্রপিক তাদের প্রার্থীদের সম্পূর্ণভাবে এআই দিয়ে তৈরি কভার লেটার জমা দিতে নিষেধ করেছে। পেমেন্টস প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ডও একই পদক্ষেপ নিয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান আবার একজন প্রার্থী কতগুলো আবেদন করতে পারবে, তার সীমা বেঁধে দিচ্ছে। এআই কোম্পানি ওপেনএআই ঠিক করেছে একজন প্রার্থী ছয়মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচটি আবেদন করতে পারবে।

ক্রমবর্ধমান সিভি ও কভার লেটারের স্তূপ থেকে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুতগতিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। পেশাজীবীদের সামাজিক নেটওয়ার্ক সাইট লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়োগকর্তা প্রাথমিকভাবে প্রার্থী যাচাইয়ের জন্য এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদনগুলো কোনো পদের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ–তা চিহ্নিত করতে এআই ব্যবহার করছে। কেপিএমজির মতো বৃহৎ পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসলে মানুষই নেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিসিজির পরিচালক অ্যালিসিয়া পিটম্যান বলেছেন, এআই মডেল এক পদের জন্য আবেদন করা প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে তাদেরকে অন্য পদের প্রার্থী হিসেবেও সুপারিশ করতে পারে। তবে নিয়োগ-সংক্রান্ত সফটওয়্যার কোম্পানি অ্যাশবির মতে, ২০২১ সালের পর থেকে শূন্যপদ পূরণে কোম্পানিগুলোর যে সময় লাগত, তা খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

এআইয়ের সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের তুলনায় নিয়োগকর্তারা কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে আছেন বলে মনে করেন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্কটিক শোরসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট নিউরি। চাকরিপ্রার্থীদের এআই টুলগুলোর নিরাপত্তা বা তথ্য-সুরক্ষা আইন নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হয় না। কিন্তু নিয়োগকর্তাদের এখানে সীমাবদ্ধতা আছে। এ ব্যাপারে নিউরি বলেন, “আমি আমার ক্লায়েন্টদের বলি, আপনাদের আর প্রার্থীদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে আপনাদের হারার সম্ভাবনা বেশি।”

এআইয়ের উত্থান দীর্ঘমেয়াদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। নিউরির মতে, কোম্পানিগুলো এমন কাজের ওপর বেশি জোর দেবে যেগুলো এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে করা যায় না, যেমন: ভিজ্যুয়াল ধাঁধা। আবার প্রার্থীরা আবেদন করার আগেই হয়তো তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খুঁজে বের করার উপায় বের করবে কোম্পানিগুলো। স্টার্টআপ কোম্পানি জুসবক্স ‘পিপলজিপিটি’ নামে একটি সেবা চালু করেছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থী খোঁজার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। এছাড়া লিংকডইন নিয়োগকর্তাদের সুবিধার্থে ‘হায়ারিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ চালু করেছে, যা উপযুক্ত প্রার্থীর খোঁজে পুরো সাইট ঘেঁটে দেখে।

একদিন হয়তো কোম্পানিগুলো চাকরির আবেদন প্রক্রিয়াই বাদ দিয়ে দেবে–যা নিয়োগকর্তা ও প্রার্থী–উভয়ের জন্যই স্বস্তির খবর। গ্রিনহাউসের প্রধান ড্যানিয়েল চেইট মনে করেন, শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই হয়তো এআই এজেন্ট ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে এবং তারা পরস্পরের জন্য উপযুক্ত কি না তা নির্ধারণ করবে।

সম্পর্কিত