সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইসিটি মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান
চলতি বছরের আগস্টে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক একটি সংগঠন সরকারের প্রতি সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নতুন করে আনা মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে, পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে না দেখার আহ্বানও জানায়।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২৪ আগস্ট সাংবাদিকদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তারা ২০২৪ সাল থেকে পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন দমনে সাংবাদিকরা উসকানি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে ওই ছাত্র আন্দোলনে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ১৪ জুলাই ২০২৪-এর এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা শেখ হাসিনাকে উসকানিমূলক প্রশ্ন করেছিলেন, যার জবাবে তিনি আন্দোলনকারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন এবং পরে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন শুরু হয়।
২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর চালানো নিরাপত্তা অভিযানের ঘটনায় আইসিটিতে করা পৃথক একটি মামলায় বেসরকারি একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং চ্যানেলটির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে ২০২৬ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ জুলাই শেখ হাসিনা ও আরও ৩৯ জনের সঙ্গে তাদের নামও আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ভোরের কাগজের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে আটক রয়েছেন। তার সাংবাদিকতার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে এসব সাংবাদিকের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, গ্রেপ্তার ও হয়রানি
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সময় সাংবাদিকরা পৃথকভাবে গ্রেপ্তার, হয়রানি, হুমকি ও হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে ১৮ জুন রাতে গাজীপুর সদর উপজেলার বোর্ডবাজার এলাকা থেকে বগুড়া গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের কথিত দুর্নীতি নিয়ে পত্রিকাটিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে করা অভিযোগের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ইইউ এসইই-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সাতক্ষীরায় যমুনা টিভির প্রতিবেদক আকরামুল ইসলাম অভিযোগ করেন, একটি জমিসংক্রান্ত মামলায় পলাতক এক হত্যা মামলার আসামির বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে একজন জেলা প্রশাসক তার চাকরি নিয়ে হুমকি দেন।
২৩ আগস্ট একটি ফেসবুক পোস্টের পর শরীয়তপুরে সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিলের ওপর হামলা করা হয় এবং এতে তার কব্জি ভেঙে যায়। গত ২৫ আগস্ট একটি বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় তিন সাংবাদিককেও মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে বিএনপির এক জেলা নেতা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আরও সহিংসতার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বছরের ২৬ আগস্ট কুষ্টিয়ায় সাংবাদিক হাসান ইমাম ইবনে হাবিব একটি বেনামি চিঠি পান। চিঠিতে তাকে লেখালেখি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয় এবং তার গতিবিধি নজরদারিতে রাখার দাবি করা হয়। ২৮ আগস্ট মেহেরপুরের দুই সাংবাদিক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের ভিডিও ধারণের সময় তাদের মারধর করে আটকে রাখা হয় এবং তাদের সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারীতে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এক সহকারী কমিশনার সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সাজুর বাড়িতে তল্লাশি চালান বলে অভিযোগ করা হয়। জমিসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই সহকারী কমিশনারকে প্রশ্ন করার পর এই তল্লাশি চালানো হয় বলে জানা গেছে।
অনলাইনে সমালোচনামূলক মতপ্রকাশের কারণে আটক
৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সিফাত আবদুল্লাহকে আটক করে পুলিশ। বিদ্যুৎ বিলের সমালোচনা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা তার একটি ফেসবুক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে আটক করা হয়।
তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আগে থেকেই চালু থাকা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এরক মামলা চলতি বছরের ১৭ জুন মশাল মিছিল এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্যদের কথিত হামলার ঘটনায়ও করা হয়েছিল। ৭ সেপ্টেম্বর সিফাত আবদুল্লার জামিন নামঞ্জুর হয়। এরপর পুলিশ নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে। তবে তার আইনজীবী বলেন, ভাইরাল হওয়া ওই মন্তব্যের কোনো উল্লেখ এজাহারে ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বাসস
১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীতে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তির পরিচয় মেহেদি আহমেদ, বয়স ২১। তিনি নগরের নোয়াগাঁও-সাদিপুর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, মেহেদি ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমানকে নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করছিলেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা ও বাধা
এ বছরের ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সরকারি অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রকাশ্য প্রদর্শনীর পরিকল্পনা স্থানীয় ধর্মীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর আপত্তির পর বন্ধ হয়ে যায়। আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠানের ভেন্যুর অনুমতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর এবং এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। কসবা উপজেলায় দ্বিতীয়বার প্রদর্শনীর উদ্যোগও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সের ভেতরে আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাশের একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ঢুকে চেয়ার ভাঙচুর করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ৩০ জন আহত হন বলে জানা গেছে, যাদের মধ্যে সাতজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। পরে অনুষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যায়।
এদিকে ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি কনসার্ট বাতিল করে। এতে অ্যাশেজসহ কয়েকটি ব্যান্ডের পরিবেশনা করার কথা ছিল। এর দুই দিন আগে স্থানীয় ইমাম ও ইসলামি আলেমদের একটি পরিষদ স্মারকলিপি জমা দেয়, যেখানে ওই অনুষ্ঠানকে ইসলামী ধর্মীয় নীতিমালা সম্পর্কে তাদের ব্যাখ্যার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।
মৌলভীবাজারে নারী মানবাধিকারকর্মী গ্রেপ্তার
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মৌলভীবাজারে নারী মানবাধিকারকর্মী গীতা রানী কানুকে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের করা একটি ফৌজদারি মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর তাকে মৌলভীবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি এখনো আটক রয়েছেন।
ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের তথ্য অনুযায়ী, গীতা রানী কানুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে প্রবেশ, সাধারণ সম্পাদককে মারধর, নগদ টাকা চুরি এবং আসবাবপত্র ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সাজানো বলে দাবি করা হয়েছে। কথিত ঘটনার সময় গীতা রানী কানু ও অন্য বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ৩১ আগস্ট শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দাবিতে বিক্ষোভ করার সময় হামলায় আহত হওয়ার পর তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
গীতা রানী কানু বাংলাদেশের সিলেটের চা-বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে কর্মরত একজন নারী মানবাধিকারকর্মী। তিনি চা শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার, দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি এবং ইউনিয়নে গণতন্ত্র নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি সংগঠিত করে আসছেন। তিনি বাংলাদেশ চা শ্রমিক নারী ফোরামের আহ্বায়ক, চা শ্রমিক মহাসংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং চা শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সদস্যসচিব।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ সত্ত্বেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস
নাগরিক সমাজের উদ্বেগের মধ্যেই ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল ২০২৬ পাস করে জাতীয় সংসদ।
সিভিকাস মনিটর বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ থাকা সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার তুলনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটি আদতে উল্টো রাস্তায় হাঁটার একটি উদাহরণ। এটিকে উদ্বেগজনক বলছে সিভিকাস মনিটর। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনের স্বাধীনতা, তদন্তের ক্ষমতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, বহুত্ববাদ এবং কার্যপরিধিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছিল। তবে সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিলে অধ্যাদেশটি বাতিল করে।
নির্বাচন কমিটির কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকায় কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে স্বার্থের গুরুতর সংঘাত তৈরি হতে পারে। কারণ, সরকারের আচরণ তদন্তের দায়িত্বে থাকা কমিশনারদের নিয়োগে সরকারি প্রতিনিধিরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে নির্বাহী হস্তক্ষেপ থেকে কমিশনকে সুরক্ষা দেওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা থাকলেও নতুন আইনটিতে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীদের নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট বিধানের অনুপস্থিতি, নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের কাছে হস্তান্তর এবং কমিশনারদের পারিশ্রমিকসংক্রান্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রত্যাহারের ফলে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের অধীনে পড়তে পারে।
আইনের একটি বিশেষ উদ্বেগজনক দিক হলো–আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনটির বিধান। এতে এমন একটি প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে, যার ফলে কার্যত এসব প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করবে। এ ধরনের ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা, কোনো স্থাপনা পরিদর্শন, নথিপত্র জব্দ বা স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করার কার্যকর ক্ষমতা কমিশনের থাকবে না।
একই সময়ে, আইনে কমিশনারদের মধ্যে নারী এবং জাতিগত সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অধিকাংশ আটককেন্দ্র পরিদর্শনের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে উদ্বেগ
৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সংসদ জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ পাস করে।
ফোর্টিফাই রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, এই আইনে জোরপূর্বক গুমকে পৃথক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য কিছু অধিকার ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে আইনটিতে গুরুতর কিছু ত্রুটি রয়েছে। এতে স্বাধীনভাবে তদন্ত নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে–এমন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। আইনের ১৪ ধারায় ভুক্তভোগীদের কোনো স্বাধীন সংস্থার কাছে নয়, স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া, জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্ভাব্য শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও আইনে রাখা হয়েছে। এটি মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দিকে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর আগে বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ওই সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে একটি স্বাধীন কমিশনকে কোনো আটককেন্দ্রে আগাম ঘোষণা ছাড়াই প্রবেশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
স্বাধীন তদারকি ছাড়াই বিতর্কিত পুলিশ ইউনিটের নতুন নাম
২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন করা হয়। এসআরবি আইনে বলা হয়েছে, র্যাবের ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, জনবল, সম্পদ ও দায় নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন আইন প্রণয়নের আগে যথাযথভাবে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পরামর্শ নেওয়া হয়নি।
আগের সরকারের সময়ে সব ধরনের ভিন্নমত দমনে র্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে বাহিনীটির বিরুদ্ধে এবং এসবের জন্য দায়মুক্তিরও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) র্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। অন্যদিকে, পুলিশ সংস্কার কমিশন র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনা করে বাহিনীটির প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছিল।
নতুন বিএনপি সরকারের অধীনে সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এর পরিবর্তে সরকার বাহিনীটির নাম ও কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কেনেডি হিউম্যান রাইটস সেন্টার বলেছে, “স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইনটি যেভাবে গৃহীত হয়েছে, তাতে প্রকৃত সংস্কার হবে না। এতে আগের একই কাঠামো রাখা হয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে শুধু এক ইউনিফর্ম বদলে আরেক ইউনিফর্ম পরতে না পারেন–তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় মানবাধিকার যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। স্বাধীন তদারকিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসআরবির এমন বিশ্বাসযোগ্য বাহ্যিক তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে অভিযোগ গ্রহণ, স্বাধীন তদন্ত এবং অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সামরিকীকরণ বাড়ানোর’ অভিযোগ, সমালোচনায় অধিকারকর্মীরা
১৫ সেপ্টেম্বর ৫২ জন বিশিষ্ট নাগরিক সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সংঘাতপ্রবণ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সামরিকীকরণ বাড়ানোর কথিত উদ্যোগ নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।
বাংলাদেশের বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা বলে জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
এক বিবৃতিতে ওই ৫২ জন এই উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার মানুষের ওপর আরও সামরিকীকরণ ও দমন-পীড়নের পথ তৈরি করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়গুলো দেখভালের জন্য স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় ২৯ বছর পরও অঞ্চলটির বড় একটি অংশ সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং চুক্তিতে থাকা অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘদিনের সামরিকীকরণের ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবিকা, পরিবেশ, জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রভাবিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদিবাসী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন।
নিষিদ্ধ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও দীর্ঘদিন ধরে আটক রাখা
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের দীর্ঘদিনের বিচারপূর্ব আটক বন্ধে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা, কর্মী ও সমর্থককে আটক করেছে পুলিশ।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, তাদের কেউ কেউ শেখ হাসিনা সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে অনেককে কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও আইনজীবীদের অভিযোগ, তাদের অনেকেই বয়স্ক এবং কারও কারও গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। তাদের জামিন ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যেসব মামলায় কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, সেসব মামলাতেও রাষ্ট্রপক্ষ বারবার জামিনের বিরোধিতা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিম্ন আদালত ও জেলা আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে জামিন নাকচ করেছে এবং উচ্চ আদালত থেকে জামিনের আদেশ পাওয়ার পরও সরকারি কর্তৃপক্ষ নতুন মামলা দিয়ে সেই আদেশ পাশ কাটিয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাস থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় দলটির সভা, প্রকাশনা এবং অনলাইনে দলটির পক্ষে বক্তব্য দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন মিছিল করার সময় দলটির ২৬ জন নেতা-কর্মী ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনায় বিভিন্ন মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ১৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
১২ সেপ্টেম্বর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৫৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
১৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের (জেসিডি) নেতাকর্মীরা সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য মো. আজিজুল হক আরজুকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
শান্তিপূর্ণ সমাবেশ: বিক্ষোভে বিধিনিষেধ ও বাধা
সিভিকাস মনিটর বলছে, সরকার বিক্ষোভে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে একদল বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দিকে যাওয়ার সময় শিক্ষা ভবনের সামনে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মিছিল করে শিক্ষার্থীরা ওই এলাকায় পৌঁছায়। তবে সেখানে আগে থেকেই স্থাপন করা পুলিশের ব্যারিকেডের কারণে তারা সামনে এগোতে পারেনি। পরে শিক্ষা ভবনের সামনে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন। এটি তাদের আগে ঘোষণা করা ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লং মার্চ’ কর্মসূচির অংশ ছিল।
গত ২২ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পূর্বঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি পুলিশ অনুমতি না দেওয়ার কারণে। অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করেছিল।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা অনুষ্ঠানস্থল ব্যবহারের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে ১০ দিন আগে পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ২০ আগস্ট পুলিশ আয়োজকদের জানায়, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে লিখিত জবাবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। পরে পুলিশ জানায়, তিন আয়োজক সংগঠনের একটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি ফৌজদারি মামলা চলমান থাকায় সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।