জলবায়ু অর্থায়নের নামে ‘ঋণের ফাঁদে’ বাংলাদেশ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জলবায়ু অর্থায়নের নামে ‘ঋণের ফাঁদে’ বাংলাদেশ
জলবায়ু বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। ছবি: রয়টার্স

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে দুই দশকের বেশি সময় ধরে। তবে এখনো সুরাহা হয়নি, কারা আসলে কত টাকা পাবে। এ জন্য জলবায়ু তহবিল হওয়ার কথা। আর সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাওয়ার কথা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর।

কিন্তু আদতে কি সেটা হচ্ছে? নাকি যাদের কারণে জলবায়ু বিপর্যয় ঘটছে, তারাই পাচ্ছে সিংহভাগ।

এই টাকা কোথায় যায়? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর তাতে সংবাদমাধ্যমটির দাবি, জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নের নামে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক স্বল্পোন্নত দেশ।

এর বিপরীতে জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী চীন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাচ্ছে বড় অংকের অর্থ।

গার্ডিয়ান ও কার্বন ব্রিফের যৌথ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা ধরেছে। জাতিসংঘে জমা দেওয়া অপ্রকাশিত এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য প্রতিশ্রুত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিলের একটি বড় অংশ চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো তেল সমৃদ্ধ দেশের কাছে যাচ্ছে।

২০২১ এবং ২০২২ সালের ২০ হাজারের বেশি বৈশ্বিক প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দূষণকারী ধনী দেশগুলো থেকে দুর্বল দেশগুলোতে মূলধন স্থানান্তরের একটি ব্যবস্থা দেখা গেছে। তবে তহবিল বিতরণে কোনো কেন্দ্রীয় তদারকি না থাকায় তা রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দুই বছরে জলবায়ু অর্থায়নের একক বৃহত্তম প্রাপক ছিল ভারত, যারা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন পেয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত জাপান থেকে জলবায়ু অর্থায়ন হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পেয়েছে। শীর্ষ ১০ কার্বন নিঃসরণকারীর মধ্যে অন্যতম সৌদি আরব জাপান থেকে ঋণ পেয়েছে প্রায় ৩২৮ মিলিয়ন ডলার ।

বিশ্বের ৪৪টি দরিদ্রতম দেশ, যাদের স্বল্পোন্নত দেশ বলা হয়, তারা ২০২১ এবং ২০২২ সালে মোট তহবিলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (৩৩ বিলিয়ন ডলার) পেয়েছে। তবে, এই অর্থের বেশিরভাগই অনুদান নয়, বরং ঋণ আকারে।

অনেক স্বল্পোন্নত দেশ তাদের জলবায়ু অর্থের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পেয়েছে ঋণের আকারে, যা পরিশোধের শর্ত তাদের আরও ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ এবং অ্যাঙ্গোলার ক্ষেত্রে এই ধরনের ঋণের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি।

একই সময়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের জলবায়ু অর্থায়নের বাজেটের তিন গুণ বাহ্যিক ঋণ পরিশোধ করেছে, যা ঋণের বোঝা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। এর পরিমাণ প্রায় ৯১.৩ বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ বাড়লেও সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্বলদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছচ্ছে না।

ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলের জলবায়ু অর্থায়ন বিষয়ক আইনজীবী জো থওয়েটস বলেন, “এটি কোনো দাতব্য কাজ নয়। এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা অনেক সংকটের মূল কারণগুলোকে মোকাবিলা করে।”

এ ছাড়া ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের সারাহ কোলব্র্যান্ডার জাতিসংঘের উন্নয়ন বিভাগগুলোর পুরনো শ্রেণীবিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিতু ভারদ্বাজ গার্ডিয়ানকে বলছেন, “জলবায়ু অর্থায়নের গোপন গল্পটি প্রতিশ্রুতির পরিমাণে নয়, বরং তাদের ধরণে নিহিত। জলবায়ু অর্থায়ন দরিদ্র দেশগুলোর ওপর আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে তুলছে।”

এ ব্যাপারে জাপান, সৌদি আরব, চীন ও আরব আমিরাতের সরকারের কাছে জানতে চাইলে তাদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পায়নি গার্ডিয়ান।

সম্পর্কিত