মব কমে কেমনে?

মব কমে কেমনে?
ছবি: এআই জেনারেটেড

মবের কথা বললেই একটি দেশের নাম চলে আসে। সেটি হলো পূর্ব আফ্রিকার একটি ভূমিবেষ্টিত দেশ, নাম উগান্ডা। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এই দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্য পার্ল অব আফ্রিকা’ নামে। কুখ্যাত স্বৈরশাসক ইদি আমিনের দেশ হিসেবেও উগান্ডা পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। সেসব অবশ্য বেশ আগের কথা। তবে বলতেই হয় যে, মবের দেশ বা মবের মারে মানুষের মরে যাওয়ার দেশ হিসেবেও উগান্ডার কুখ্যাতি আছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল উগান্ডা। আফ্রিকার অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের মতো ১৯৬০-এর দশকে দেশটি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। নিখুঁত তারিখটি হলো ১৯৬২ সালের ৯ অক্টোবর। নতুন প্রেসিডেন্ট হন মিল্টন ওবোতে। তবে উগান্ডার মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্বস্তি আর মেলেনি। বরং নানা সমস্যা ও সংঘাতে অশান্তির মধ্যেই কাটতে থাকে। এরপর ক্ষমতা নেন ইদি আমিন। অশান্তি রূপ নেয় অত্যাচারে। পরে ইদি আমিনের বিতাড়নে কিছুটা হলেও স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে শুরু করে। এরপরে অন্তত ইদি আমিনের মতো স্বৈরশাসককে সহ্য করতে বাধ্য হতে হয়নি উগান্ডাবাসীদের। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে আগের দৈন্যদশাও কিছুটা কেটেছে কোটি পাঁচেক জনসংখ্যার দেশটির। তবে মুক্তি মেলেনি মবের মার থেকে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেটিকে বলে ‘মব জাস্টিস’। যদিও মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি আদৌ যায় কিনা, এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি বসাতে রাজি নন। তারা বলেন, এর চেয়ে মব ভায়োলেন্স বলা যুক্তিযুক্ত। কারণ এটিও অপরাধ।

সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গে ২০১০ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘MOB JUSTICE: A qualitative research regarding vigilante justice in modern Uganda’। এর লেখক ছিলেন রবিন গ্লাড, আসা স্টর্মবার্গ ও অ্যান্টন ওয়েস্টারলান্ড। সেই গবেষণপত্রে বলা হয়েছে যে, ২০০৭ সালে উগান্ডায় মব জাস্টিসে নিহত হয় ১৮৪ জন। কিন্তু ২০০৮ সালে, মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৮ জনে। অর্থাৎ মব জাস্টিসে নিহতের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল প্রায় ১০০ শতাংশ। ২০০৮ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ জন মানুষ মরে মব জাস্টিসের কারণে। উগান্ডার পুলিশের দেওয়া সরকারি হিসাব এটি। এর বাইরে আরও কতজন নিহত হয়েছে, তা অজানাই রয়ে গেছে।

কিন্তু কেন উগান্ডায় মব ভায়োলেন্স এত বেড়ে গিয়েছিল? আবার সেই সঙ্গে এমন প্রশ্নও উঠতে পারে যে, মব আসলে কেন সৃষ্টি হয়? মব কমেই বা কীভাবে?

মব সৃষ্টির কারণ কী?

গবেষকেরা এক্ষেত্রে কিছু কারণ বের করেছেন। তারা বলছেন, মব জাস্টিস জন্মের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অকার্যকর বিচার বিভাগ। এই বিভাগের ওপর যখন সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে, কোনোভাবেই যখন প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস ফেরাতে পারে না, তখনই মব নিজেরাই জাস্টিস প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। এছাড়া যখন সরকার আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তখনও মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স দেখা যায়।
এই আইন প্রয়োগহীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা বলছেন, যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখনই তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্ররোচনা পায়। এই নিরাপত্তাহীনতা তখনই প্রবল হয়ে ওঠে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আনুষ্ঠানিক বাহিনী এক অর্থে অকার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ, এসব বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলার কারণেই নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয়।

mob lyncing 2

মব কমে কেমনে?

প্যান আফ্রিকান রিসার্চ নেটওয়ার্ক অ্যাফ্রোব্যারোমিটার মূলত আফ্রিকা অঞ্চল নিয়ে কাজ করা একটি নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এতে প্রকাশিত ‘Willing to kill: Factors contributing to mob justice in Uganda’ নামক গবেষণাপত্রে মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সুপারিশগুলো এতটাই যৌক্তিক যে মব জাস্টিসের বাড়বাড়ন্ত দেখা দেওয়া সব দেশেই এর প্রয়োগ করা যায়। এগুলো হলো:

এক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফেরাতে দুর্নীতির পরিমাণ কমিয়ে আনা। একইসঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটার পর সেগুলো সামাল দিতে হবে স্বচ্ছ উপায়ে।

দুই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে জনসাধারণের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এই আস্থা ফেরাতে না পারলে কোনোভাবেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

তিন, বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতেই হবে। নইলে সাধারণ মানুষ বিচার ব্যবস্থায় আস্থা ফিরে পাবে না।

চার, অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে যেমন আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিতও করে তুলতে হবে। এ বিষয়ে অনেক মানুষই অজ্ঞ থাকে। এবং তা থেকে মব ভায়োলেন্স সৃষ্টি হতেই পারে। তাই এ নিয়ে মানুষকে জানাতে হবে। নাগরিক বানাতে হলে জনসাধারণকে নাগরিক হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।

ওপরের এসব সুপারিশ সবক্ষেত্রে কার্যকর থাকে না বলেই উগান্ডার মতো দেশগুলোতে মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স প্রকট হয়ে ওঠে। এতে একসময় ওইসব দেশের পুরো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই ভেঙে পড়ে।

সম্পর্কিত