Advertisement Banner

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি ভারতের জন্য বিপদের

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কি ভারতের জন্য বিপদের
ভারত সমৃদ্ধ ও উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তা এই অরাজকতায় ব্যাহত হতে পারে। ছবি: দ্য ইকোনমিস্টের সৌজন্যে

দুনিয়া এ মুহূর্তে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অন্যের ওপর আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই ভীত হয়ে পড়ছে। কোনো আইন বা আন্তর্জাতিক চুক্তিই যেন শক্তির এই প্রয়োগকে থামাতে পারছে না।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ভারতীয় অনেক কূটনীতিবিদেরা অনেক আগেই এমন এক অগোছালো বিশ্বব্যবস্থার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বরং তারাই কখনো কখনো যেন এমন বিশ্বকেই স্বাগত জানিয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতীয় কর্মকর্তারা তার ‘লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি’ ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমালোচনা করা পশ্চিমা মিত্রদের ঠাট্টা করতেন। এমনকি ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফেরার পরও সেটি অব্যাহত ছিল। তাদের মতে, ট্রাম্প আসলে মুখোশ ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারাটাই সবার সামনে তুলে ধরেছেন।

একইভাবে ২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, তখন ভারত তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়াকে নিন্দা জানানোর আহ্বানেও সাড়া দেয়নি। ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, বড়শক্তিগুলো সবসময়ই নির্মম, তথাকথিত উদার আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাও আসলে এক ধরনের ভণ্ডামি। পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো হয়তো সেই পুরোনো বিশ্বের জন্য শোক করতে পারে, যেটি একসময় তারা নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ভারতের সামনে ছিল নানা চুক্তি করার সুযোগ।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখনো সেই বার্তাই দিচ্ছেন। চলতি বছরের ৫ থেকে ৭ মার্চ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সরকারসমর্থিত সম্মেলন রাইসিনা ডায়ালগে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধের বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্র ছিল। এই অনুষ্ঠান ভারতের ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্মেলন হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

তবে সেখানে বিশ্বব্যবস্থার ‘শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলার দিকে’ যাওয়া নিয়ে বেশ শান্তভাবেই কথা বলেন জয়শঙ্কর। তার যুক্তি, ১৯৪৫-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল ‘পশ্চিমের দ্বারা, পশ্চিমের জন্য, পশ্চিম থেকে পরিচালিত’। সেটি নিয়মেই দাড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও নিয়ম মাত্র ৭০ বছর টিকে ছিল। যেটি ভারতের ইতিহাসের মাত্র এক শতাংশ। তাই ওই ব্যবস্থার পরিবর্তনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পরিবর্তনে ভারত ও গ্লোবাল সাউথের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার ভাষ্য, কোনো কিছু আসলে আটকে থাকে না।

কিন্তু দিল্লির পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা মহলের অনেকেই জয়শঙ্করের এই নিশ্চিন্ত ভাবের সঙ্গে একমত নন।

দেশটির অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কূটনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’। তাদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর আসলে সাহস জোগানোর চেষ্টা করছেন। একজন বলেন, এটি আসলে অপমানের সময়। ইরান–সংঘাতের কারণে জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো যদি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে না পারে, একই সঙ্গে কাতারের মতো বৃহৎ সরবরাহকারী যদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করতে না পারে, হলে ভারত বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়বে।

রাইসিনা ডায়ালগ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারতকে রাশিয়া থেকে থেকে তেল কেনার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এতে কৃতজ্ঞতার বদলে দিল্লির বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাদের মনে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের প্রভু। দয়া করে তারা ভারতকে দিনের একটি ‘ছাড়পত্র’ দিয়ে দিয়েছে।

পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, “চীনের ক্ষেত্রে ২০ বছর আগে আমরা যে ভুল করেছি, ভারতের ক্ষেত্রে আমরা সেই ভুল করব না। চীনের ক্ষেত্রে বাজার খুলে দিয়ে পরে দেখেছি তারা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে দিচ্ছে।”

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে মার্কিন সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাও অনেকের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। টর্পেডো হামলার এই ঘটনা নিয়ে ট্রাম্প পরে মজাও করেছেন। তিনি এটিকে জাহাজটিকে আটক করার চেয়ে ‘মজার’ ব্যাপার বলেছেন। অনেক ভারতীয়র কাছে এটি অপমানজনক মনে হয়েছে, কারণ ঠিক তার আগেই ভারতের একটি নৌ–মহড়ায় ওই ইরানি জাহাজটি অংশ নিয়েছিল। ভারত সরকার এই ঘটনার কোনো নিন্দা জানায়নি। তাতে মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ইরান–যুদ্ধ নিয়েও একেবারেই নীরব ভারত।

এর ব্যাখ্যা হিসেবে অনেকেই ট্রাম্পকে ভয় পাওয়ার কথা বলছেন। গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। গত বছর ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন এবং ভারত-পাকিস্তানের স্বল্পমেয়াদি সংঘর্ষে তিনি পাকিস্তানের দিকেই ঝুঁকেছেন বলে মনে হয়।

একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে তার আগ্রহ ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখার আশা দুর্বল করে দেয়। তবুও দিল্লির অভিজাত মহলে একটি ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে— বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রয়োজন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন যে তারা একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে দক্ষ—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া,ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গেও। উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ভারত ইরানের সঙ্গেও মোটামুটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাবের মিল এবং আফগানিস্তানে পৌঁছাতে স্থলপথের প্রয়োজনীয়তা।

তবে দিল্লির অনেক শীর্ষ ব্যক্তি প্রশ্ন তুলছেন—এই ভারসাম্যনীতি কি সত্যিই ভারতকে স্বাধীনতা দিচ্ছে, নাকি দেশটি একসঙ্গে অনেক জায়গার ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

উত্থানশীল শক্তি, বাড়তে থাকা ঝুঁকি

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইরানে দীর্ঘ যুদ্ধ হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যই নয়, সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৯৫ লাখ ভারতীয় শ্রমিকের জীবন-জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়বে। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ জ্বালানি অবরোধ হলে চীন আরও বেশি রুশ তেল কিনতে পারে। এতে রাশিয়া যদি চীনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা ভারতের জন্য সমস্যা। কারণ ভারত একদিকে রাশিয়ার ওপর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য নির্ভরশীল, আবার চীনের সঙ্গে তার সীমান্ত উত্তেজনাও রয়েছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ ইরান যুদ্ধ চীনের হাতে ভারতের ওপর আরও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে পারে। যদি জ্বালানি স্বাধীনতা বাড়াতে ভারত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সস্তা ও বৃহৎ পরিসরে সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন ও ব্যাটারি সরবরাহ করতে পারে একমাত্র চীনই-যদিও এতে নির্ভরতার ঝুঁকি থাকবে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খল বিশ্ব ভারতের জন্য অনুকূল নয়। দেশটি সমৃদ্ধ ও উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তা এই অরাজকতায় ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু গর্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের কারণে ভারতীয় নেতারা প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে পারেন না।

সম্পর্কিত