Advertisement Banner

জেনারেল মঞ্জুর কি আসলেই জিয়ার হত্যাকারী?

জেনারেল মঞ্জুর কি আসলেই জিয়ার হত্যাকারী?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানকে। সেই রাতে সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতিকে হত্যার অভিযান চালিয়েছিলেন। লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবির সেনা কর্মকর্তারা ছাড়া সেই হত্যা মিশনে কোনো সৈনিক, জেসিও বা এনসিওকে নিয়োজিত করা হয়নি। কিন্তু কেন সেদিন তারা রাষ্ট্রপতিকে হত্যার মতো একটা হঠকারী কাজ করেছিলেন? তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? তাদের নেপথ্যের শক্তিই বা কারা ছিল?

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ৪৬ বছর কেটে গেছে। এমন নৃশংস একটি ঘটনার উদ্দেশ্য আজও অমীমাংসিত। ক্ষমতা দখল করাই যদি উদ্দেশ্য থাকে, চট্টগ্রামে বসে যে সেটা অলীক ভাবনা, সেটা কারোরই অজানা থাকার কথা নয়। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সেই হঠকারী বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল, তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই–জিয়া হত্যার দুই দিনের মাথায়।

সে সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামে অবস্থিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, বীরউত্তম। ওই সময় ২৪ পদাতিক ডিভিশন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসারজেন্সি দমনে সক্রিয় ছিল। জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন যেসব সেনা কর্মকর্তা, তারা সবাই ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কোনো না কোনো ব্রিগেড, ব্যাটালিয়ন বা ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু জিয়া হত্যার দায় কেন জেনারেল মঞ্জুরের ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল? তিনি কি হত্যা পরিকল্পনার নেপথ্য খলনায়ক ছিলেন? পুরো ব্যাপারটিই রহস্যে ঘেরা। কারণ, জেনারেল মঞ্জুরকে ১৯৮১ সালের ২ জুন তারিখে পুলিশ হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

জেনারেল মঞ্জুরের কাঁধে রাষ্ট্রপতি হত্যার দায় কেন চাপানো হয়েছিল? পুরো ব্যাপারটিই ছিল এক তরফা। মঞ্জুর মৃত্যুর আগে সামরিক ও বেসামরিক, কোনো আদালতেই বিচারের সম্মুখীন হননি। অভিযোগের বিপরীতে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেননি। রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার তিন দিনের মাথায় বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের কৃতকর্মের দায় চট্টগ্রামের জিওসির ওপর চাপিয়ে তাকে দ্রুততার সঙ্গে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি রহস্যাবৃত। একইসঙ্গে ৩০ মে রাতে সার্কিট হাউজে কিছু সেনা কর্মকর্তা কার নির্দেশে কিলিং মিশন পরিচালনা করেছিলেন; মোটকথা জিয়া হত্যার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী কে বা কারা, সেই সত্য কখনোই উদ্‌ঘাটিত হয়নি।

মঞ্জুরের ওপর কেন জিয়া হত্যার দায় চাপানো হয়েছিল? এ ব্যাপারে জানতে হলে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।

মঞ্জুর ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন মঞ্জুর। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। অসাধারণ বীরত্বের সঙ্গে তিনি দেশমাতৃকার স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুরের বীরত্বের নানা কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় মঞ্জুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। জিয়া যখন একাধারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মঞ্জুর তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ বা সিজিএস পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তাকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আস্থাভাজন হিসেবেই সেই দায়িত্ব পেয়েছিলেন মঞ্জুর। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহ দমনে জিয়া মঞ্জুরের মতো একজন অসাধারণ মেধাবী সেনা কর্মকর্তার ওপরই নির্ভর করেছিলেন।

মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, বীরউত্তম। ছবি: সংগৃহীত
মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, বীরউত্তম। ছবি: সংগৃহীত

নানা ইস্যুতে জিয়ার সঙ্গে মঞ্জুরের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল পরবর্তী সময়ে। এটা সত্য। অনেকেই বলেন, জিয়া যখন সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি ও রাজনীতিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সেনাবাহিনী প্রধান হতে চেয়েছিলেন মঞ্জুর। জিয়া সেটা না করে জেনারেল এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান করেন। এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন মঞ্জুর। কিন্তু সেই ক্ষুব্ধতা কী এতটাই প্রবল ছিল যে, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভ থেকেই জিয়া হত্যার পরিকল্পনা করবেন মঞ্জুর? তাও সেটা চট্টগ্রামে বসে? ১৯৮১ সালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। ওই সময় মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর সেতু ছিল না। অর্থাৎ, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে সড়কপথে যেতে হলে দুবার ফেরি পারাপার করতে হতো। কৌশলগত দিক দিয়েও চট্টগ্রামে বসে সেনা বিদ্রোহ সফল হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।

৩০ মে জিয়াকে যখন কিছু সেনা কর্মকর্তা হত্যা করেন, মঞ্জুর তখন কোথায় ছিলেন? সে সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। তিনি জিয়া হত্যার ঘটনা প্রবাহের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি এক সাক্ষাৎকারে চরচাকে বলেছেন, ৩০ মের আগে জিওসি বা চট্টগ্রামের সেনা গ্যারিসনের কোনো পর্যায় থেকেই সেনা বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রপতিকে হত্যার মতো এমন নৃশংস ঘটনার কোনো ইঙ্গিত তিনি টের পাননি। সবকিছুই ছিল শান্ত ও স্বাভাবিক।

আগেই বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়ার কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তারা সবাই চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আক্রমণ করে রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর জেনারেল মঞ্জুরকে নিজেদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন ওই সেনা কর্মকর্তারা। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’ বইতে এ তথ্য জানিয়েছেন। জিয়াউদ্দিন চৌধুরীর লেখায় উঠে এসেছে, হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া সেনারা জেনারেলকে এক প্রকার জিম্মি করেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাথমিকভাবে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেও মঞ্জুর জিওসি হিসেবেই তার অধীনস্থ সেনা কর্মকর্তাদের কৃতকর্মের দায় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

জিয়া হত্যার পর থেকেই ঢাকার সেনা সদরদপ্তর থেকে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হচ্ছিল। মঞ্জুর ওই সময় চট্টগ্রামে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তিনি নিজেকে ‘বিপ্লবী সরকারের’ মুখপাত্র হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার বইয়ে লিখেছেন, বিদ্রোহী সেনা কর্মবর্তারা মঞ্জুরকে ‘মুখপাত্র’ হিসেবে পরিচয় দিতে একপ্রকার বাধ্যই করেছিলেন। এমনকি তিনি তার অধীনস্থ সেনা কর্মকর্তাদের হয়ে ঢাকার সেনা সদরের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছিলেন।

পরিবারের সঙ্গে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর। ছবি: সংগৃহীত
পরিবারের সঙ্গে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর। ছবি: সংগৃহীত

জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন একজন অসাধারণ মেধাবী সেনানায়ক। তিনি এই হঠকারিতার সঙ্গে কেন নিজেকে জড়িয়েছিলেন, সেটা এক বিরাট রহস্য। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর চট্টগ্রাম থেকে কোনো বিদ্রোহ সফল হওয়ার নয়। এমনকি যে বিপ্লবী সরকারের মুখপাত্র তিনি হয়েছিলেন, সেটারও অস্তিত্ব সেভাবে কেউ দেখেনি, তাই প্রশ্ন জাগতেই পারে, মঞ্জুরের মতো একজন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা কেন এসব করেছিলেন?

৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যেসব সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতিতে হত্যা করতে গিয়েছিলেন, তারা এরপর থেকে মঞ্জুরকে ঘিরে ছিলেন! সরাসরি না হলেও পরোক্ষে চাপ প্রয়োগ করছিলেন, যেন মঞ্জুর অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন। এমনকি মঞ্জুরের ‘বিপ্লবী সরকারের’ পক্ষে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যেসব বৈঠক করেছিলেন, সেগুলোও তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বিদ্রোহ দমনের পর পরিবার-পরিজনসহ এবং কিছু বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে মঞ্জুরের পালানোর চেষ্টাও প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাকে ২ জুন ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ফটিকছড়ি থানায় আটক অবস্থাতেই সেনাবাহিনীর একটি দল এসে তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী চরচাকে বলেছেন, তিনি তার প্রকাশিত বইয়েও লিখেছেন, মঞ্জুর বারবারই চাচ্ছিলেন তাকে যেন পুলিশ আদালতে হাজির করে, তিনি নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা আদালতে দিতে চেয়েছিলেন। পুলিশকে বারবারই অনুরোধ জানাচ্ছিলেন, সেনাবাহিনী যেন কোনোভাবেই তাকে ছিনিয়ে নিতে না পারে।

চট্টগ্রামে বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মঞ্জুর যে বৈঠক করেছিলেন, তাতে তিনি কখনোই নিজেকে অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে দাবি করেননি। মঞ্জুর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শুধু বলেছিলেন, চট্টগ্রাম সেনানিবাসের একদল সেনা কর্মকর্তা এই অভ্যুত্থান করেছে। তারা কে বা কারা, তাদের নেতা-ই বা কে, সে সম্পর্কে মঞ্জুর কখনোই কিছু বলেননি। যেহেতু মঞ্জুর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাই জিয়া হত্যার ঘটনায় আসলে কে দায়ী, সেটা জানার সুযোগ আসলে কখনোই হয়নি।

জিয়া হত্যার সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন মেজর জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী, বীরবিক্রম। তিনি ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে জিয়া হত্যার সময় ঢাকার সেনা সদরের কিছু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

মঈনুল হোসেন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর পান বাসায় বসে। তাকে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর দিয়েছিলেন সেনা সদরে তৎকালীন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত মেজর জেনারেল নূরউদ্দিন খান। তার ফোন পেয়েই মঈনুল সেনা সদরে গিয়েছিলেন। সেখানে দেখেন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আগে থেকেই হাজির। মঈনুল সেদিন সেনা সদরে বসেই চট্টগ্রাম থেকে জেনারেল মঞ্জুরের ফোন পান। মঞ্জুর মঈনকে ফোনে জানান, জেনারেল জিয়ার নিহত হওয়ার ব্যাপারে তিনি পরে বিস্তারিত জানাবেন। নিজের বইতে মঞ্জুরের কথা মঈন সরাসরিই লিখেছেন, “জেনারেল জিয়ার নিহত হওয়ার ব্যাপারে আমি পরে বিস্তারিত জানাব। এ মুহূর্তে সবাই যেন শান্ত থাকে। ঢাকায় কেউ যেন রক্তক্ষয়, সংঘর্ষে জড়িয়ে না পড়ে। আমি আর বলতে পারছি না। অসুবিধা আছে।”

সেই অসুবিধাটা আসলে কী ছিল, জানার কোনো উপায় নেই। মঈনুল হোসেন চৌধুরীর বয়ানে এটা স্পষ্ট, জিয়া হত্যার বিষয়ে বিস্তারিত অনেক কিছুই জানতেন মঞ্জুর। সেটা তিনি কোনো একটা সুযোগে সবাইকে জানাতে চেয়েছিলেন। সেই সুযোগটাই তিনি দুর্ভাগ্যবশত পাননি।

মঈনুল হোসেন চৌধুরীর বইয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানের নাম উল্লেখ আছে। ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের কিলিং মিশনে অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই মতিউর রহমান ছিলেন বলেও জানিয়েছেন মঈন। এমনকি যে অফিসারের গুলিতে জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন, তিনিই মতিউর রহমান।

জেনারেল মঈনের ভাষ্যমতে, এই মতিউর রহমান ১৯৮১ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য মনোনীত হয়েও যেতে পারেননি। তার পরিবর্তে একই পদবির অন্য এক কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়। মতিউর রহমান এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি সরাসরি নিজের ক্ষোভের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তাদের জানিয়েছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি দেখা করতেও চেয়েছিলেন। তিনি সে জন্য রাষ্ট্রপতির সে সময়ের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদিকুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। মঈন বইয়ে লিখেছেন, সাদিকুর রহমান চৌধুরীই তাকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতিকে খুব সম্ভবত মতিউর রহমানই হত্যা করেছে।

মঈনুল হোসেন চৌধুরীকে জিয়া হত্যার পরপরই প্রেষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে বিদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে দায়িত্বরত ছিলেন। ১৯৯৩ সালে থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত দুই পলাতক সেনা কর্মকর্তা–মেজর মুজাফ্ফর ও মেজর খালেদের। তাদের কাছ থেকে তিনি যে তথ্য পান, তাতে মতিউর রহমানের নাম উঠে আসে। ঘটনার সঙ্গে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের যে কোনো সম্পর্কই ছিল না, সেটাও উঠে আসে। তবে মেজর মুজাফ্ফর ও মেজর খালেদ ঘটনার যে পরিকল্পনার কথা মঈনুল হোসেন চৌধুরীকে বর্ণনা করেছেন, সেখানেও রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার মোটিভ খুব স্পষ্ট নয়। সেনা কর্মকর্তারা নাকি বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ে জিয়াউর রহমানকে জীবিত অবস্থায় সার্কিট হাউজ থেকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন। অভিযানে যাওয়া বেশির ভাগ সেনা কর্মকর্তা নাকি এমনটাই জানতেন। সেখানেই অতর্কিতে নিহত হন জিয়া।

মঞ্জুর যে জিয়া হত্যায় জড়িত ছিলেন না, সেটা স্পষ্ট করেই নিজের বইয়ে উল্লেখ করেছেন মঈন। এমনকি এটাও বলেছেন, পরিকল্পনা করেই জিয়া হত্যায় মঞ্জুরকে ফাঁসানো হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিদেশে রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় দেশে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে সেটাই বলেছিলেন মঈন।

জিয়া হত্যার ওই সময় সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল। এই দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য। জিয়া হত্যার সুযোগে সেই দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মঈন। জিয়া হত্যার পর সামরিক আদালতে যে বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে ১৩ জন অফিসারকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। তারা সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মঞ্জুরকে যেমন বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছিল, একইভাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানও রহস্যজনকভাবে গুলিতে নিহত হন।

‘স্বৈরশাসনের নয় বছর’ নামে মেজর রফিকুল ইসলামের একটি বই আছে। সেখানে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নয় বছরের সামরিক ও বেসামরিক শাসনের বর্ণনা আছে। সেই বইয়ে রফিকুল ইসলাম একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন–জিয়া হত্যার মাসখানেক আগে ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসের দিকে চট্টগ্রাম সফরে গিয়েছিলেন সেনাপ্রধান এরশাদ। সেখানকার হিলটপ অফিসার্স মেসে এরশাদ মতিউর রহমানের সঙ্গে একান্তে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরেছিলেন বলে রফিকুল ইসলাম তার বইয়ে দাবি করেছেন। তিনি এই প্রশ্নও তুলেছিলেন, একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সঙ্গে সেনাপ্রধানের কী বিশেষ আলাপ থাকতে পারে!

মোটকথা চির রহস্যের বেড়াজালে বন্দী দেশের এক জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকাণ্ড। পুরো ঘটনাটিই হঠাৎ করে শুরু, হঠাৎ করেই শেষ। বিভিন্ন ছাড়া ছাড়া ঘটনাপ্রবাহ, রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। যে ১৩ সামরিক কর্মকর্তাকে জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে নিজেদের পরিবারবর্গের কাছে লেখা চিঠিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন। এই ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে অবশ্য ছিলেন ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থাকা তার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান।

চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী জিয়া হত্যার ভোরে সার্কিট হাউজে গিয়ে মাহফুজুর রহমানকে খুব শান্ত ও ধীরস্থির দেখতে পেয়েছিলেন। চরচাকে জিয়াউদ্দিন বলেছেন, সেদিন ভোরে সেনা অভিযানে বিধ্বস্ত সার্কিট হাউজের লনে দাঁড়িয়ে মাহফুজুর রহমানের আচার আচরণ তার কাছে খুবই সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি তার ব্যক্তিগত সচিব, অথচ, মাহফুজকে দেখে তার নাকি রীতিমতো ভাবলেশহীন মনে হয়েছিল। ফাঁসি হওয়া ১৩ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন, যারা ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৯৪ সালে মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছিল। সেই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও জেসিও। ৩২ বছর হয়ে গেলেও সেই মামলাটি এখনো চলমান। মৃত্যুর কারণে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে অবশ্য এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জিয়া হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, আসল সত্য আসলে উদ্‌ঘাটিত হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করে সেই পথ ৪৬ বছর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিয়োগান্ত অধ্যায় জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। কিন্তু দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হলেও সেই হত্যা রহস্য উদ্‌ঘাটনে গাফিলতি কিংবা সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বার্থ হাসিল জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সত্যিই বড় এক ট্র্যাজেডি।

সম্পর্কিত