ফজলুল কবির

ক্ষমতা নানামাত্রিক হয়। ঘর থেকে রাষ্ট্র, সবখানেই ক্ষমতা থাকে নানা চেহারায়। তবে সাধারণভাবে ‘ক্ষমতা’ নামের শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভাসে মূলত দেশের বিষয়, সরকারের অবয়ব। আর এই ক্ষমতাই কখনো কখনো সব খেয়ে ফেলে! আর তখনই ক্ষমতা হয়ে ওঠে একচেটিয়া। এবার ক্ষমতার সেই সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েই বিস্তারিত জানা যাক।
বহু আগেই সমাজবদ্ধ মানুষ বুঝেছিল যে, ক্ষমতা এমন এক জায়গা, যার শিখর থেকে তলা পর্যন্ত যথাযথ ব্যক্তি না বসলে—অঘটনের আর সীমা থাকে না। এ কারণে প্রাচীন কৌম সমাজের নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে আজকের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ পর্যন্ত যাত্রায় মানুষ বরাবরই ক্ষমতার সমীকরণ, এটি নির্ধারণ ও এর পরিসিমা বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস রচয়িতারা ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে ক্ষমতার কাঠামো কেমন ছিল, তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখিত দুই ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষের প্রাচীন কৌম সমাজের ক্ষমতা কাঠামো নির্ধারিত হতো তুলনামূলক বোদ্ধা শ্রেণির (অভিজাত) দেওয়া পরামর্শ ও ভোটের মাধ্যমে। প্রাচীন গ্রিসেও এ ধারার নেতা নির্বাচনই দেখা যায়। দুটির কোনোটিই অবশ্য সুবৃহৎ প্রজা ধারণাকে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে না। বরং অভিজাতের শাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সেই প্রাচীন কৌম বা গ্রিক সমাজের অভিজাতদের ‘গণতন্ত্র’ ভেঙে রাষ্ট্র পত্তনের মধ্য দিয়ে রাজার শাসন আসতে সময় লাগেনি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় অসংখ্য রাজা, সম্রাট, দিগ্বিজয়ী বীরের দেখা মেলে। এটি চলেছে দীর্ঘ সময়। সদা প্রজ্জ্বলিত সূর্যের গৌরববাহী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তো খুব বেশি আগের কথা নয়। কিন্তু এরই ভেতরে ভেতরে মানুষ খুঁজেছে তার জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতা‑কাঠামো। এটি নির্ধারণে কত লড়াই হয়েছে, কত তত্ত্ব, তর্ক‑বিতর্ক হয়েছে।
ক্ষমতা কাঠামোর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি। কৃষি অর্থনীতির ভূখণ্ডের ক্ষমতা‑কাঠামো, আর যাযাবর অধ্যুষিত এলাকার ক্ষমতা‑কাঠামো এক নয়। তারপরও মানুষ থিতু হয়। এই থিতু হওয়ার মধ্য দিয়েই জন্ম হয় রাজ্যের এবং পরে রাষ্ট্রের। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মানুষ আবার নানা তত্ত্ব, পদ্ধতি বা ব্যবস্থা খুঁজেছে। নানা অদল‑বদল শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী একটি ব্যবস্থাকেই আপাত সমাধান হিসেবে হাজির করা হয়েছে, যা ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে এক ও অদ্বিতীয় হয়ে উঠেছে। আর তা হলো–গণতন্ত্র। প্রাচীন কৌম সমাজ বা গ্রিক ধাঁচ বা নিদেনপক্ষে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’ তথা বাংলার প্রধান নাগরিকদের মাধ্যমে নির্বাচিত গোপালের মধ্য দিয়ে যে পাল সাম্রাজ্যের পত্তন–বিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র অবশ্য তেমন নয়। এখানে অভিজাত বা প্রধান নাগরিকবৃন্দ দ্বারা নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের ভোটে নির্বাচন ও এই পন্থায় শাসকবর্গ বা ক্ষমতার মালিকানা নির্ধারণই গণতন্ত্র।

অবশ্য এই গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক সরকারের পন্থা নিয়ে লড়াই চলেছে আরও কয়েক দশক। একদিকে পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। একটা মহাআখ্যানের লড়াই চলেছে দশকের পর দশক। এ ক্ষেত্রে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ও আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের পর্যায়টি স্মরণযোগ্য। তারও একটা আপাত রফা হয়েছে অনেক বছর হলো। গোটা বিশ্ব ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের গণতন্ত্র চর্চা বা সেই ধারার দিকে যাত্রা করেছিল। করেছিল বলা হচ্ছে কারণ, বহু দেশই খোলসে গণতান্ত্রিক হলেও ভেতরের উপাদানটি একচেটিয়া ক্ষমতার। এই ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ কী?
একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতা তখনই একচেটিয়া হয়ে ওঠে, যখন সাধারণত ‘নির্বাচনের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দল, জোট বা গোষ্ঠী, বিরোধী সব দল ও গোষ্ঠীকে দমনের পথে হাঁটে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, যেকোনো ব্যক্তি পর্যায় থেকে আসা সমালোচনাও আর সহজভাবে নিতে পারে না। সমালোচক মাত্রই ‘শত্রু’ জ্ঞান করে তাকে নির্মূলে নানা কৌশল নেয়। এ ধরনের ক্ষমতার অধিকারীরা, রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়কে নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে প্রশাসন, আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি পর্যায়কে নিয়ন্ত্রণের বৃত্তে বন্দী করে তারা। এই বৃত্ত কেউ ভাঙতে চেষ্টা করলে বা এমন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। বিরোধী মত দমনে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ–সব ধরনের শক্তিকে কাজে লাগায়। এ ধরনের ক্ষমতার সাথে সহায়ক হয়ে বরাবরই থাকে সমাজের সুযোগসন্ধানী মারমুখী একটি গোষ্ঠী, যাদের কখনো সহায়ক সংগঠন, সমর্থক গোষ্ঠী, ফ্যান ক্লাব ইত্যাদি তকমায় সামনে হাজির রাখা হয়। একচেটিয়া শাসকদের লাল চোখ সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি এরা করে।
মোটাদাগে গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান–১. নির্বাহী ও আইনপ্রণেতারা অবশ্যই সরাসরি এবং অবাধ, সুষ্ঠু ভোটে নির্বাচিত; ২. প্রাপ্তবয়স্ক সবার ভোটাধিকার থাকা ও তার মুক্ত প্রয়োগ; ৩. নাগরিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংঘ করার স্বাধীনতা, বৈষম্যের শিকার বা এ ধরনের কোনো শঙ্কা ছাড়াই সরকারের সমালোচনা করার অধিকার, সমালোচকের সুরক্ষা এবং ৪. নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের শাসনের অধিকার, বিশেষত তাদের কোনো সেনাবাহিনী বা অভিজাত কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবে থাকতে হবে না। এই চার উপাদানের কোনো একটির ব্যাত্যয় বা কোনো একটি কিছুমাত্র হুমকির মুখে পড়লেই বুঝতে হবে, ব্যবস্থাটি আর গণতান্ত্রিক নেই। বর্তমানে এ ধরনের শাসন রয়েছে আফ্রিকার অধিকাংশ, এশিয়ার অনেক দেশ এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের বহু দেশে।
চারপাশে তাকালে এমন বহু দেশের দেখা মিলবে, যেখানে নির্বাচন হয় ঘটা করে, বহুমত সম্পর্কে সরকারি বিবৃতিতে ইতিবাচক কথা বলা হয়, কিন্তু চর্চাটা বজ্রশাসনের। পান থেকে চুন খসলেই সেখানে বিপদ। আর চুন খসা মানে শুধু সরকারের সমালোচনা বা তার বিরোধিতা। গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করা একটি দেশ বা সমাজ কী করে, এই একচেটিয়াকরণকে মেনে নেয়?
হ্যাঁ, প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে যাওয়াটা একটু গোলমেলে বইকি। তারপরও চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমেই আসে–সম্মতি উৎপাদনের বিষয়টি। মার্কিন দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কির ‘সম্মতি উৎপাদন’ বইটির মূল ভাষ্য এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, মোটাদাগে কোনো ক্ষমতাই স্থায়িত্ব পায় না, যদি না তা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্মতি উৎপাদন করতে পারে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিসরে যেমন, সম্মতির প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এখানে তো জোর করে ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীর কথাই বলা হচ্ছে। তাহলে তারা কার সম্মতি উৎপাদন করল? তারা তো এমনকি ভোটকেও গ্রাহ্য করে না। বরং ‘নির্বাচন প্রকৌশল’ বিদ্যাকে উচ্চমার্গে নিয়ে গেছে তারা। তাহলে? না, বিষয়টি এত সরল নয়। ক্ষমতার সমীকরণে কিছু থাকে ‘প্রিন্সিপল ভার্ব’ আর কিছু থাকে ‘অক্সিলিয়ারি’। কোনো ক্ষমতা একচেটিয়া হয়ে উঠতে গেলে এই দুই ক্রিয়া নিয়েই খেলা চলে হরদম। প্রথম ধাপেই জনতাকে (যাদের বলা হয় রাষ্ট্রের মালিক) বানিয়ে ফেলা হয় ‘অক্সিলিয়ারি’।

মানুষ নির্বাচন বা ভোটের মাধ্যমে আসা এমন শাসকদের তাহলে কেন মেনে নেয়? এই শাসকদের প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পথটি মোটাদাগে একই রকম থাকে। তারা সাধারণত, একটি বেশ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রথম ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এসেই তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে একে একে দুর্বল ও ক্ষয় করতে থাকে। ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় থাকার লক্ষ্যেই তারা এ কাজটি করে। এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু জটিল হিসাব মেলাতে হয়।
একচেটিয়া শাসকেরা শুরুতেই ক্ষমতা ও সম্পদের একটা নয়াবণ্টন চালু করে। এই বণ্টনই আসলে তাদের ক্ষমতার রক্ষাকবচ। এ সম্পর্কিত এক গবেষণায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্টিভেন লেভিতস্কি ও লুকান এ ওয়ে বলছেন, ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের কিছু চেনা গৎ আছে। এ ক্ষেত্রে শাসকেরা শুরুতেই বিরোধীদের সঙ্গে খেলার মাঠটিতে রদবদল করা হয়। খেলার নিয়ম দেওয়া হয় পাল্টে। ক্ষমতায় বদল আনার হাতিয়ার নির্বাচন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়াই স্বাভাবিকভাবে প্রথম শহীদে পরিণত হয়। আর এটি করা হয়, নানাভাবে সুকৌশলে, যাতে ‘নির্বাচন প্রকৌশল’ একেবারে অলক্ষ্যে ঘটে চলতে পারে। যেমন—বিরোধীদের প্রচার কার্যক্রমকে বাধা দেওয়া, বিরোধী প্রার্থীদের পেশিশক্তি দিয়ে বা আইনি গলিঘুপচি দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা ইত্যাদি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়—সংবাদমাধ্যম।
আর এর কোনোটিই একনায়ক শাসনব্যবস্থার মতো করে হয় না। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয় না, কোনো সংবাদমাধ্যমকে বন্ধ করা হয় না সেভাবে। একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থায় এই প্রতিটি কাজই করা হয় দারুণ কৌশলের সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধন, নতুন আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের অপপ্রয়োগসহ নানা ধরনের কৌশলকে কাজে লাগানো হয় বিরোধী মত দমনে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নানা প্রতিষ্ঠানকে হয় বিতর্কিত, না হয় হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করা হয়।
আর এই কাজটি করার ক্ষেত্রে ক্ষমতার সহায়ক হিসেবে কিছু গোষ্ঠীকে শুরুতেই চিহ্নিত করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই গোষ্ঠীগুলো হয় অভিজাত, না হয় কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাধর। শুরুতেই এই গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করে, তাদের সম্পদের ভাগীদার বানানো হয়। এ তালিকায় থাকে—বড় শিল্পগোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠন, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ বাহিনী, বিশেষায়িত বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমকেও নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে। নামে–বেনামে সরকার সমর্থক বা সরকারি দলের আইনপ্রণেতাদের মাধ্যমে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে সংবাদমাধ্যম হয় কিনে নেওয়া, না হয় তার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি ভাষ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বুদ্ধিজীবী মহলকে নানা আর্থিক সুবিধা দিয়ে একরকম গৃহপালিত করে নেওয়া হয়।
সরকারের সাথে যুক্ত বাহিনীগুলো ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দলে টানা হয় অনিঃশেষ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দিয়ে। আর বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য অর্থপাচার, কর ফাঁকি, বড় বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক চাপ সামলাতেও এক ধরনের ভাগ–বাটোয়ারার পথে হাঁটে এ ধরনের শাসকেরা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা গোষ্ঠী তুলনামূলক কাছাকাছি শক্তির গোষ্ঠীগুলোর সাথে আপস–রফা করলেও চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির নীতি মেনে এই ঘুষ, দুর্নীতি বা আর্থিক সুবিধার সুফল পৌঁছে যায় একেবারে তলা পর্যন্ত গুটিকয়ের কাছে, যারা এই একচেটিয়া শাসনকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ভিত্তি দেয়।
এভাবে এক ধরনের দেওয়া–নেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একেচটিয়া শাসনের আপাত দুর্লঙ্ঘ কেল্লাটি, যার কোনো পতন নেই বলে হরদম প্রচার চালানো হয়। জনপরিসরে এর সম্মতি উৎপাদনে অতি অবশ্যই ব্যবহার করা হয় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ইতিহাস, কোনো ঐতিহাসিক ক্ষত বা রাজনৈতিক বিতর্ককে। কোনো দেশে এটি বিতর্কিত সীমানা, কোনো দেশে জনমিতিক বিতর্ক তো কোনো দেশে উন্নয়নকে দাওয়াই হিসেবে সামনে হাজির করা হয়।
ওপরের এসব লক্ষণ দেখা দিলেই বুঝতে হবে যে, একটি দেশ বা অঞ্চল পড়ে গেছে স্বৈরশাসনের ফাঁদে। ক্ষমতা সেখানে সব গিলে খেয়ে ফেলতে চাইবে। সেক্ষেত্রে বাঁচতে হলে একসাথে করতে হয় দুটো কাজ। সর্বগ্রাসী ক্ষমতার গ্রাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যেমন চলতে হয়, তেমনি খুঁজতে হয় ঠেকানোর উপায়ও!

ক্ষমতা নানামাত্রিক হয়। ঘর থেকে রাষ্ট্র, সবখানেই ক্ষমতা থাকে নানা চেহারায়। তবে সাধারণভাবে ‘ক্ষমতা’ নামের শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভাসে মূলত দেশের বিষয়, সরকারের অবয়ব। আর এই ক্ষমতাই কখনো কখনো সব খেয়ে ফেলে! আর তখনই ক্ষমতা হয়ে ওঠে একচেটিয়া। এবার ক্ষমতার সেই সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েই বিস্তারিত জানা যাক।
বহু আগেই সমাজবদ্ধ মানুষ বুঝেছিল যে, ক্ষমতা এমন এক জায়গা, যার শিখর থেকে তলা পর্যন্ত যথাযথ ব্যক্তি না বসলে—অঘটনের আর সীমা থাকে না। এ কারণে প্রাচীন কৌম সমাজের নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে আজকের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ পর্যন্ত যাত্রায় মানুষ বরাবরই ক্ষমতার সমীকরণ, এটি নির্ধারণ ও এর পরিসিমা বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস রচয়িতারা ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে ক্ষমতার কাঠামো কেমন ছিল, তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখিত দুই ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষের প্রাচীন কৌম সমাজের ক্ষমতা কাঠামো নির্ধারিত হতো তুলনামূলক বোদ্ধা শ্রেণির (অভিজাত) দেওয়া পরামর্শ ও ভোটের মাধ্যমে। প্রাচীন গ্রিসেও এ ধারার নেতা নির্বাচনই দেখা যায়। দুটির কোনোটিই অবশ্য সুবৃহৎ প্রজা ধারণাকে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে না। বরং অভিজাতের শাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সেই প্রাচীন কৌম বা গ্রিক সমাজের অভিজাতদের ‘গণতন্ত্র’ ভেঙে রাষ্ট্র পত্তনের মধ্য দিয়ে রাজার শাসন আসতে সময় লাগেনি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় অসংখ্য রাজা, সম্রাট, দিগ্বিজয়ী বীরের দেখা মেলে। এটি চলেছে দীর্ঘ সময়। সদা প্রজ্জ্বলিত সূর্যের গৌরববাহী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তো খুব বেশি আগের কথা নয়। কিন্তু এরই ভেতরে ভেতরে মানুষ খুঁজেছে তার জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতা‑কাঠামো। এটি নির্ধারণে কত লড়াই হয়েছে, কত তত্ত্ব, তর্ক‑বিতর্ক হয়েছে।
ক্ষমতা কাঠামোর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি। কৃষি অর্থনীতির ভূখণ্ডের ক্ষমতা‑কাঠামো, আর যাযাবর অধ্যুষিত এলাকার ক্ষমতা‑কাঠামো এক নয়। তারপরও মানুষ থিতু হয়। এই থিতু হওয়ার মধ্য দিয়েই জন্ম হয় রাজ্যের এবং পরে রাষ্ট্রের। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মানুষ আবার নানা তত্ত্ব, পদ্ধতি বা ব্যবস্থা খুঁজেছে। নানা অদল‑বদল শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী একটি ব্যবস্থাকেই আপাত সমাধান হিসেবে হাজির করা হয়েছে, যা ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে এক ও অদ্বিতীয় হয়ে উঠেছে। আর তা হলো–গণতন্ত্র। প্রাচীন কৌম সমাজ বা গ্রিক ধাঁচ বা নিদেনপক্ষে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’ তথা বাংলার প্রধান নাগরিকদের মাধ্যমে নির্বাচিত গোপালের মধ্য দিয়ে যে পাল সাম্রাজ্যের পত্তন–বিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র অবশ্য তেমন নয়। এখানে অভিজাত বা প্রধান নাগরিকবৃন্দ দ্বারা নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের ভোটে নির্বাচন ও এই পন্থায় শাসকবর্গ বা ক্ষমতার মালিকানা নির্ধারণই গণতন্ত্র।

অবশ্য এই গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক সরকারের পন্থা নিয়ে লড়াই চলেছে আরও কয়েক দশক। একদিকে পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। একটা মহাআখ্যানের লড়াই চলেছে দশকের পর দশক। এ ক্ষেত্রে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ও আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের পর্যায়টি স্মরণযোগ্য। তারও একটা আপাত রফা হয়েছে অনেক বছর হলো। গোটা বিশ্ব ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের গণতন্ত্র চর্চা বা সেই ধারার দিকে যাত্রা করেছিল। করেছিল বলা হচ্ছে কারণ, বহু দেশই খোলসে গণতান্ত্রিক হলেও ভেতরের উপাদানটি একচেটিয়া ক্ষমতার। এই ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ কী?
একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতা তখনই একচেটিয়া হয়ে ওঠে, যখন সাধারণত ‘নির্বাচনের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দল, জোট বা গোষ্ঠী, বিরোধী সব দল ও গোষ্ঠীকে দমনের পথে হাঁটে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, যেকোনো ব্যক্তি পর্যায় থেকে আসা সমালোচনাও আর সহজভাবে নিতে পারে না। সমালোচক মাত্রই ‘শত্রু’ জ্ঞান করে তাকে নির্মূলে নানা কৌশল নেয়। এ ধরনের ক্ষমতার অধিকারীরা, রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়কে নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে প্রশাসন, আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি পর্যায়কে নিয়ন্ত্রণের বৃত্তে বন্দী করে তারা। এই বৃত্ত কেউ ভাঙতে চেষ্টা করলে বা এমন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। বিরোধী মত দমনে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ–সব ধরনের শক্তিকে কাজে লাগায়। এ ধরনের ক্ষমতার সাথে সহায়ক হয়ে বরাবরই থাকে সমাজের সুযোগসন্ধানী মারমুখী একটি গোষ্ঠী, যাদের কখনো সহায়ক সংগঠন, সমর্থক গোষ্ঠী, ফ্যান ক্লাব ইত্যাদি তকমায় সামনে হাজির রাখা হয়। একচেটিয়া শাসকদের লাল চোখ সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি এরা করে।
মোটাদাগে গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান–১. নির্বাহী ও আইনপ্রণেতারা অবশ্যই সরাসরি এবং অবাধ, সুষ্ঠু ভোটে নির্বাচিত; ২. প্রাপ্তবয়স্ক সবার ভোটাধিকার থাকা ও তার মুক্ত প্রয়োগ; ৩. নাগরিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংঘ করার স্বাধীনতা, বৈষম্যের শিকার বা এ ধরনের কোনো শঙ্কা ছাড়াই সরকারের সমালোচনা করার অধিকার, সমালোচকের সুরক্ষা এবং ৪. নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের শাসনের অধিকার, বিশেষত তাদের কোনো সেনাবাহিনী বা অভিজাত কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবে থাকতে হবে না। এই চার উপাদানের কোনো একটির ব্যাত্যয় বা কোনো একটি কিছুমাত্র হুমকির মুখে পড়লেই বুঝতে হবে, ব্যবস্থাটি আর গণতান্ত্রিক নেই। বর্তমানে এ ধরনের শাসন রয়েছে আফ্রিকার অধিকাংশ, এশিয়ার অনেক দেশ এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের বহু দেশে।
চারপাশে তাকালে এমন বহু দেশের দেখা মিলবে, যেখানে নির্বাচন হয় ঘটা করে, বহুমত সম্পর্কে সরকারি বিবৃতিতে ইতিবাচক কথা বলা হয়, কিন্তু চর্চাটা বজ্রশাসনের। পান থেকে চুন খসলেই সেখানে বিপদ। আর চুন খসা মানে শুধু সরকারের সমালোচনা বা তার বিরোধিতা। গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করা একটি দেশ বা সমাজ কী করে, এই একচেটিয়াকরণকে মেনে নেয়?
হ্যাঁ, প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে যাওয়াটা একটু গোলমেলে বইকি। তারপরও চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমেই আসে–সম্মতি উৎপাদনের বিষয়টি। মার্কিন দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কির ‘সম্মতি উৎপাদন’ বইটির মূল ভাষ্য এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, মোটাদাগে কোনো ক্ষমতাই স্থায়িত্ব পায় না, যদি না তা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্মতি উৎপাদন করতে পারে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিসরে যেমন, সম্মতির প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এখানে তো জোর করে ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীর কথাই বলা হচ্ছে। তাহলে তারা কার সম্মতি উৎপাদন করল? তারা তো এমনকি ভোটকেও গ্রাহ্য করে না। বরং ‘নির্বাচন প্রকৌশল’ বিদ্যাকে উচ্চমার্গে নিয়ে গেছে তারা। তাহলে? না, বিষয়টি এত সরল নয়। ক্ষমতার সমীকরণে কিছু থাকে ‘প্রিন্সিপল ভার্ব’ আর কিছু থাকে ‘অক্সিলিয়ারি’। কোনো ক্ষমতা একচেটিয়া হয়ে উঠতে গেলে এই দুই ক্রিয়া নিয়েই খেলা চলে হরদম। প্রথম ধাপেই জনতাকে (যাদের বলা হয় রাষ্ট্রের মালিক) বানিয়ে ফেলা হয় ‘অক্সিলিয়ারি’।

মানুষ নির্বাচন বা ভোটের মাধ্যমে আসা এমন শাসকদের তাহলে কেন মেনে নেয়? এই শাসকদের প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পথটি মোটাদাগে একই রকম থাকে। তারা সাধারণত, একটি বেশ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রথম ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এসেই তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে একে একে দুর্বল ও ক্ষয় করতে থাকে। ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় থাকার লক্ষ্যেই তারা এ কাজটি করে। এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু জটিল হিসাব মেলাতে হয়।
একচেটিয়া শাসকেরা শুরুতেই ক্ষমতা ও সম্পদের একটা নয়াবণ্টন চালু করে। এই বণ্টনই আসলে তাদের ক্ষমতার রক্ষাকবচ। এ সম্পর্কিত এক গবেষণায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্টিভেন লেভিতস্কি ও লুকান এ ওয়ে বলছেন, ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের কিছু চেনা গৎ আছে। এ ক্ষেত্রে শাসকেরা শুরুতেই বিরোধীদের সঙ্গে খেলার মাঠটিতে রদবদল করা হয়। খেলার নিয়ম দেওয়া হয় পাল্টে। ক্ষমতায় বদল আনার হাতিয়ার নির্বাচন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়াই স্বাভাবিকভাবে প্রথম শহীদে পরিণত হয়। আর এটি করা হয়, নানাভাবে সুকৌশলে, যাতে ‘নির্বাচন প্রকৌশল’ একেবারে অলক্ষ্যে ঘটে চলতে পারে। যেমন—বিরোধীদের প্রচার কার্যক্রমকে বাধা দেওয়া, বিরোধী প্রার্থীদের পেশিশক্তি দিয়ে বা আইনি গলিঘুপচি দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা ইত্যাদি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়—সংবাদমাধ্যম।
আর এর কোনোটিই একনায়ক শাসনব্যবস্থার মতো করে হয় না। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয় না, কোনো সংবাদমাধ্যমকে বন্ধ করা হয় না সেভাবে। একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থায় এই প্রতিটি কাজই করা হয় দারুণ কৌশলের সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধন, নতুন আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের অপপ্রয়োগসহ নানা ধরনের কৌশলকে কাজে লাগানো হয় বিরোধী মত দমনে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নানা প্রতিষ্ঠানকে হয় বিতর্কিত, না হয় হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করা হয়।
আর এই কাজটি করার ক্ষেত্রে ক্ষমতার সহায়ক হিসেবে কিছু গোষ্ঠীকে শুরুতেই চিহ্নিত করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই গোষ্ঠীগুলো হয় অভিজাত, না হয় কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাধর। শুরুতেই এই গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করে, তাদের সম্পদের ভাগীদার বানানো হয়। এ তালিকায় থাকে—বড় শিল্পগোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠন, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ বাহিনী, বিশেষায়িত বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমকেও নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে। নামে–বেনামে সরকার সমর্থক বা সরকারি দলের আইনপ্রণেতাদের মাধ্যমে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে সংবাদমাধ্যম হয় কিনে নেওয়া, না হয় তার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি ভাষ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বুদ্ধিজীবী মহলকে নানা আর্থিক সুবিধা দিয়ে একরকম গৃহপালিত করে নেওয়া হয়।
সরকারের সাথে যুক্ত বাহিনীগুলো ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দলে টানা হয় অনিঃশেষ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দিয়ে। আর বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য অর্থপাচার, কর ফাঁকি, বড় বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক চাপ সামলাতেও এক ধরনের ভাগ–বাটোয়ারার পথে হাঁটে এ ধরনের শাসকেরা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা গোষ্ঠী তুলনামূলক কাছাকাছি শক্তির গোষ্ঠীগুলোর সাথে আপস–রফা করলেও চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির নীতি মেনে এই ঘুষ, দুর্নীতি বা আর্থিক সুবিধার সুফল পৌঁছে যায় একেবারে তলা পর্যন্ত গুটিকয়ের কাছে, যারা এই একচেটিয়া শাসনকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ভিত্তি দেয়।
এভাবে এক ধরনের দেওয়া–নেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একেচটিয়া শাসনের আপাত দুর্লঙ্ঘ কেল্লাটি, যার কোনো পতন নেই বলে হরদম প্রচার চালানো হয়। জনপরিসরে এর সম্মতি উৎপাদনে অতি অবশ্যই ব্যবহার করা হয় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ইতিহাস, কোনো ঐতিহাসিক ক্ষত বা রাজনৈতিক বিতর্ককে। কোনো দেশে এটি বিতর্কিত সীমানা, কোনো দেশে জনমিতিক বিতর্ক তো কোনো দেশে উন্নয়নকে দাওয়াই হিসেবে সামনে হাজির করা হয়।
ওপরের এসব লক্ষণ দেখা দিলেই বুঝতে হবে যে, একটি দেশ বা অঞ্চল পড়ে গেছে স্বৈরশাসনের ফাঁদে। ক্ষমতা সেখানে সব গিলে খেয়ে ফেলতে চাইবে। সেক্ষেত্রে বাঁচতে হলে একসাথে করতে হয় দুটো কাজ। সর্বগ্রাসী ক্ষমতার গ্রাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যেমন চলতে হয়, তেমনি খুঁজতে হয় ঠেকানোর উপায়ও!