গ্রিসে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউস। গতকাল মঙ্গলবার তাকে এ কথা জানানো হয়েছে। অর্থ, উপহার ও নানা সুবিধার বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে একের পর এক সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার জানিয়েছিলেন, তিনি গিলফয়েলকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। গিলফয়েলের সঙ্গে একসময় তার ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বাগদান হয়েছিল। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “তিনি ভালো কাজ করছিলেন, কিন্তু আমরা যা পড়ছিলাম, তা আমাদের পছন্দ হয়নি।”
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
গত মাস থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে গিলফয়েলের আচরণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, গ্রিস সরকারের কার্যক্রম ব্যাহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ব্যবহারের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কেটি বলেন, “তিনি আমাদের দলের জন্য অসাধারণ সম্পদ ছিলেন। আমরা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গিলফয়েল তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রতি তার কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা ‘অটুট’ রয়েছে।
তিনি লেখেন, “রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার দায়িত্বের মেয়াদ হয়তো শেষ হতে চলেছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলন এবং আমার প্রিয় দেশের প্রতি আমার অঙ্গীকার কখনো শেষ হবে না। এসব অভিযোগ মিথ্যা। নিজের নাম, সুনাম ও সততা রক্ষায় আমি জোরালোভাবে লড়ব।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে গ্রিসের একটি জ্বালানি কোম্পানির এক লবিস্টের সঙ্গে গিলফয়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তার প্রচার চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্পের আরেক ছেলে এরিকের সম্মানে আয়োজিত ডাভোসের একটি নৈশভোজে আমন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টা করার সময় ধনী গ্রিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে গর্ব করেছিলেন গিলফয়েল।
ব্যবসায়ী এরিক ডিটার্স সংবাদপত্রটিকে বলেন, সান ফ্রান্সিসকোর সাবেক প্রসিকিউটর গিলফয়েল অর্থের বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে গিলফয়েল তার কাছে ক্রেডিট কার্ডের এক লাখ ডলারের বিল পরিশোধের অনুরোধ করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল গত সপ্তাহে জানিয়েছে, এথেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদারকি বিভাগ।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে গিলফয়েলের দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিযোগ নিয়ে গ্রিস সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে করা অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং এথেন্সে নিয়োজিত দেশটির দূতাবাস—কোনোটিই সাড়া দেয়নি।
চুক্তি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো মিত্র গ্রিস। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এ ছাড়া, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সামুদ্রিক মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্রিস।
গত সপ্তাহে এথেন্স সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নতুন করে তথ্য বিনিময় শুরু হচ্ছে।
এথেন্সে দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন গিলফয়েল। তিনি গ্রিস সাময়িকী ‘ভোগ’–এর প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিলেন এবং গ্রিসের তারকাদের সঙ্গে গভীর রাতের বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এগিয়ে নিতে তিনি জোরালো প্রচার চালান। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির চুক্তি এবং এক্সনমোবিলসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত চুক্তি।
তবে তার কিছু বক্তব্য কূটনৈতিক অস্বস্তিও তৈরি করে। গত বছরের নভেম্বরে গ্রিসে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, চীনের উচিত পিরেয়ুস বন্দরে থাকা তাদের ৬৭ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করে দেওয়া। বন্দরটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর জবাবে গ্রিসে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফাং চিউ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সেকেলে ও ক্ষতিকর মানসিকতা’ এবং ‘আধিপত্যবাদী মনোভাব’ পোষণের অভিযোগ আনেন।
গ্রিসের বিরোধী দল পাসোকের (পিএএসওকে) পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র দিমিত্রিস মানৎসোস বলেন, গিলফয়েলকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় গুরুতর কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে, যার উত্তর এখনো মেলেনি।
গ্রিসের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন কি না, সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নাকি তারা শুধু দেখবেন, কীভাবে তাদের দেশ বাইরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ‘নাট্যমঞ্চ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।