স্বল্পপরিচিত এক পিএইচডি গবেষক ভারতের একটি প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হয়ে উঠেছেন। কয়েক বছরের মধ্যে এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তৈরি করেছে।
২৯ বছর বয়সী নেহা বোরা সপ্তাহান্তে আটক হওয়া কয়েকজন পরিচিত আন্দোলনকর্মীর একজন। ‘ককরোচ’ নামের তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষ অভিযান চালানোর সময় তাকে আটক করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, মোদির দলকে সুবিধা দিতে ব্যাপকভাবে ভোট জালিয়াতি করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
তবে বামপন্থী অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি বোরা বলেন, তিনি শুরুতে আন্দোলনকর্মী হওয়ার কথা ভাবেননি। থিয়েটারের মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ২০১৯ ও ২০২০ সালে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হন।
আটক থেকেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান
গত শনিবার পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেয়। এরপর বোরা তাদের ১০ কিলোমিটার দূরের হস্তশিল্পের বাজার দিল্লি হাটে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।
সেখানে যাওয়ার পথে স্লোগান দিতে দিতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “আজ দিল্লি হাটই হয়ে উঠবে যন্তর মন্তর।” অন্য বিক্ষোভকারীরাও তার সঙ্গে যোগ দেয়।
পুলিশ তাকে কয়েকজন আন্দোলনকর্মীর সঙ্গে আটক করে। তবে আটক অবস্থাতেও তিনি বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভ চলাকালে আটক হওয়ার পর পুলিশের গাড়ি থেকে স্লোগান দিচ্ছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা। ১০ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, “আমি আটক আছি। আন্দোলন থেমে নেই।” পুলিশ যাদের আটকে দিয়েছে, তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকেই প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শনিবারই পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকারীরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে। তাদের অভিযোগ, ভোটারদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এ সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
নির্বাচন কমিশন কোনো গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিরোধীদের বিরুদ্ধে বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভিত্তিহীন প্রশ্ন তুলে দেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করার অভিযোগ এনেছে।
এ ছাড়া, স্কুলের পরীক্ষায় অনিয়ম, বেকারত্ব ও পুলিশের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছেন বোরা।
কথাবার্তায় শান্ত স্বভাবের হলেও মাইক্রোফোন হাতে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বক্তব্য দেন। হিন্দি ও ইংরেজিতে দেওয়া তার বক্তৃতায় প্রায়ই সাংবিধানিক অধিকারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের সমস্যার সঙ্গে বৈষম্য ও সরকারের জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নগুলোও যুক্ত করেন তিনি। এভাবেই তার সমর্থকগোষ্ঠী বেড়েছে।
‘আশাও সংক্রামক’
ভারতের হিমালয়ঘেঁষা উত্তরাখণ্ড রাজ্যে বড় হয়েছেন বোরা। তার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় শৈশবে তাকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলা ও নন্দনতত্ত্ব বিভাগে পিএইচডি শুরু করেন।
চলতি মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোরা বলেন, স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় তিনি একটি থিয়েটার দলে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে নিজের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে শেখেন তিনি।
বোরা বলেন, “বাস্তব জীবনে এমন কোনো চরিত্রের সঙ্গে দেখা হতে পারে, যার সঙ্গে আপনি দ্বিমত পোষণ করবেন, যাকে আপনার ভালো লাগবে না। কিন্তু থিয়েটার করার অর্থ হলো, সেই মানুষটি কোথা থেকে এসেছেন, তা বোঝার চেষ্টা করা।”
নাগরিকত্ব আইন ছিল তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সমালোচকদের অভিযোগ, এ আইনের মাধ্যমে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য করা হয়।
বোরা বলেন, তিনি দেখেছেন, তার প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজপথে নিয়ে আসছেন। বই, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রে পাওয়া ধারণাগুলোকে তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দিচ্ছেন।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গত জুলাইয়ে বিক্ষোভের সময় আরও কয়েকজন আন্দোলনকর্মীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অংশ নিয়ে বোরা ব্যাপক পরিচিতি পান। যন্তর মন্তরে দেওয়া তার বক্তৃতায় সরকার ও বিক্ষোভকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণের সমালোচনা করা হয়। এসব বক্তব্য অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন বিক্ষোভে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে তাকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময় তাকে বারবার আটক করা হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর প্রতিবারই তিনি আবার রাজপথে ফিরে গেছেন।
বোরা বলেন, বর্তমান আন্দোলনের পেছনে শুধু আদর্শগত অবস্থান কাজ করছে না; তার মতে, আশাই আরও শক্তিশালী প্রেরণা।
তিনি বলেন, “ভয় অবশ্যই সংক্রামক। কিন্তু আশাও সংক্রামক।” তার ভাষায়, “মানুষ এখন সাহস পাচ্ছে, কারণ তারা মনে করছে, সাহসী হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব।”
বোরার মতে, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এসব বিক্ষোভে।
তিনি বলেন, “মানুষ মনে রাখে। তারা সেই অসন্তোষ বয়ে বেড়ায়, বিশ্বাসভঙ্গের অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়ায়, হতাশাও বয়ে বেড়ায়।”