ads

আমেরিকার কি পতন হতে চলেছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমেরিকার কি পতন হতে চলেছে?
ছবি: এআই

শুরু থেকেই, অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ২৫০ বছর আগে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন তাদের এই সাধারণতন্ত্র একদিন গোটা মানবজাতির জন্য আলোর দিশারী হয়ে উঠবে। তবে এটি ছিল এক নতুন পরীক্ষা, যার পেছনে কাজ করত এক অজানা আশঙ্কাও। প্রতিষ্ঠাতাদের ভয় ছিল, এই ব্যবস্থা হয়তো খুব দ্রুতই বিশৃঙ্খলা আর স্বৈরাচারী শাসনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।

আমেরিকার আড়াইশ বছরের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় ভালো আর মন্দের এমন এক দোলাচল বারবার দেখা গেছে। দাসপ্রথা, বর্ণবাদ, দুর্নীতি, প্রভাবশালী ধনাঢ্য শ্রেণির দাপট, এমনকি গৃহযুদ্ধ আর বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়ংকর সব আঘাত এসেছে। কিন্তু সব ধাক্কা সামলে নিয়ে আমেরিকা মুক্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভরসার প্রতীক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

আজ আমেরিকানরা তাদের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছেন। এই উদযাপনের জাঁকজমকই যেন প্রতিষ্ঠাতাদের আদিম সংশয়কে ভুল প্রমাণ করে দেয়। স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করা তো দূর, উল্টো আমেরিকা তিন-তিনবার এই পৃথিবীকে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

তাদের ভেতরের চমৎকার এই ছন্নছাড়া বিশৃঙ্খলাই এমন এক প্রাণশক্তির জন্ম দিয়েছে, যা আমেরিকাকে দীর্ঘদিন ধরে পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। ক্ষমতার চরম আধিপত্য সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে নিজেদের সাধারণতন্ত্রের মহান আদর্শগুলোকেই পরম যত্নে ধরে রেখেছে।

তবুও, ইতিহাসের এক ভীষণ উদ্বেগজনক মুহূর্তে এবারের স্বাধীনতা দিবসটি এসেছে। দেশের মহান আদর্শগুলো আজ হুমকির মুখে, চারদিকে যেন এক পতনের সুর। নাগরিকেরা যখন একসাথে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠছেন, ঠিক তখনই তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন গভীর বিভক্তির ক্ষতচিহ্নে জর্জরিত।

১৯৪৫ সালে অক্ষশক্তির পতনের পর আমেরিকা নিজেই যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, আজ যেন তারা নিজেরাই তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। সদা চঞ্চল এই দেশ এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। তবে অনেকে যেভাবে আশঙ্কা করছেন, এটি কি আসলে তাদের পিছু হটার লক্ষণ, নাকি এক নতুন জাগরণের পূর্বাভাস?

বর্তমান পরিস্থিতিকে বুঝতে এবং স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ফরাসি অভিজাত পর্যটক ও চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য তোকভিলের পদচিহ্ন অনুসরণ করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনোমিস্ট। তোকভিল ১৮৩০-এর দশকের শুরুতে আমেরিকায় এসে দেশটির শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি বিখ্যাত বই লিখেছিলেন, যেখানে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের সেই আদিম ভয়ের প্রতিফলন ছিল।

আজ আমেরিকানদের বড় ভয় হলো, সরকারের তিন বিভাগের ক্ষমতার যে ভারসাম্য, তা নষ্ট হয়ে হোয়াইট হাউস একাই সব ক্ষমতার মালিক হয়ে উঠছে। অথচ আইনসভার হওয়ার কথা ছিল সরকারের সবচেয়ে প্রধান অংশ। কিন্তু এটি এখন অন্ধ ও হিংস্র দলীয় কোন্দলে আটকে গেছে, যেখানে কেবল ‘আমরাই সঠিক আর ওরা খারাপ’ এই নীতি চলছে।

যেকোনো আইন পাস করার জন্য পারস্পরিক সমঝোতার প্রয়োজন হয়, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এখন আপস করাকে দুর্বলতা মনে করে। একই সাথে নির্বাচনী সীমানার অনৈতিক সুবিধা (জেরিম্যান্ডারিং) উগ্রপন্থী চিন্তাভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালতও যেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি আদালত জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে প্রেসিডেন্টের একটি পরিকল্পনা বাতিল করলেও, সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে।

অভিবাসীদের দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই নতুন মানুষদের এক নতুন প্রাণশক্তি এবং ‘মার্কিন স্বপ্নের’ আসল রূপ হিসেবে দেখে এসেছে। চীনেরও একটি নিজস্ব স্বপ্ন আছে বটে, তবে বিদেশিরা সেখানে চাইলেও সহজে মিশে যেতে পারে না; কারণ তারা চীনা হয়ে জন্মায়নি। ঠিক এর উল্টো চিত্র আমেরিকায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যেকোনো জাত বা ধর্মের মানুষ এখানে এসে আমেরিকান হয়ে উঠতে পারে। আর তাদের গ্রহণ করার পেছনে লুকিয়ে থাকে সেই চিরন্তন প্রতিশ্রুতি—তারা এবং তাদের সন্তানেরা জীবনে কতদূর পৌঁছাতে পারবে, তা কেবল তাদের মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করবে।

কিন্তু আজ সেই রঙিন মার্কিন স্বপ্ন যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল অবৈধ অনুপ্রবেশই নয়, বরং আইন মেনে আসা নতুন মানুষদের পথও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অভিবাসনের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যেখানে নিজেদের শ্বেতাঙ্গ দাবি করা আমেরিকানদের সংখ্যা অনুপাতিক হারে কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে, সেখানে কট্টরপন্থীদের কেউ কেউ এখন সেইসব আমেরিকানদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি তুলছেন যাদের পূর্বপুরুষেরা বহু প্রজন্ম ধরে এই দেশে আছেন। এটি আসলে সেই পুরোনো ও কুৎসিত বর্ণবাদেরই পুনরুত্থান, যা আমেরিকানরা একসময় বর্জন করেছিল। অথচ এই বৈচিত্র্যের জয়গানই ছিল আমেরিকার সাফল্যের আসল পরিচয়।

দেশের বাইরেও আমেরিকা এখন তার মূল আদর্শগুলো থেকে পিছু হটছে। মূলত এমন এক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে, যার লক্ষ্য হলো সেইসব বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এবং বন্ধু দেশগুলোর জোটকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীকে স্বৈরশাসকদের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে গড়ে তোলা হয়েছিল।

আমেরিকার ডান ও বাম—উভয় পক্ষেরই অনেক মানুষ এখন এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ক্ষুব্ধ। তারা মনে করেন, এই ব্যবস্থার কারণেই চীনের অন্যায্য উন্নতি হয়েছে, আমেরিকার শ্রমিকেরা কাজ হারিয়েছেন আর দূর দেশে গিয়ে মার্কিন তরুণ সৈনিকদের রক্ত ঝরাতে হয়েছে।

আর এই কারণে, সম্পদ আর ক্ষমতার পেছনে ছোটা অন্য যেকোনো সাধারণ দেশের মতোই আমেরিকা এখন নিজের গায়ের জোর দেখাতে শুরু করেছে। অন্য দেশের মানুষের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলা এখন তাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে গায়েব।

ব্যবসা-বাণিজ্য, যা একসময় দুই পক্ষেরই লাভের মাধ্যম ছিল, তা এখন কেবল অন্য দেশকে চাপ দিয়ে নিজের সুবিধা আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যে যৌথ মূল্যবোধ একসময় আমেরিকা ও তার বন্ধু দেশগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখত, আজ সেই বন্ধুদেরই দেখা হচ্ছে স্রেফ ফায়দা লোটার মতো একেকটি পক্ষ হিসেবে।

অনেকেই ধরে নিয়েছেন যে আমেরিকার বুঝি পতন হচ্ছে, কিন্তু এটি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভুলভাবে দেখার শামিল। আমেরিকার ক্ষমতা আসলে এখনো সীমাহীন—আর তা এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে যা কল্পনা করাও কঠিন। দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা যতই অচল মনে হোক না কেন, এর বাইরে তাকালেই দেখা যায় তাদের আসল প্রাণশক্তি।

আমেরিকার এআই কোম্পানিগুলো দুনিয়ায় নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে রাতারাতি শত শত বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে ফেলেছে। এই প্রযুক্তি যদি সত্যিই সবকিছু বদলে দেয়, তবে আমেরিকা এবং তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি পুরো বিশ্বের ওপর একচেতিয়া আধিপত্য বিস্তার করবে।

আর এর বড় একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ওপর। মার্কিন মিত্র দেশগুলো যতই ক্ষুব্ধ হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাদের সামনে দুটি মাত্র কঠিন পথ খোলা থাকবে—হয় আমেরিকার আধিপত্য মেনে নেওয়া, না হয় একনায়কতান্ত্রিক চীনের পক্ষে যোগ দেওয়া।

যখন এভাবে অবিশ্বাস্য ক্ষমতার পাহাড় গড়ছে, ঠিক তখনই তাদের এই মহান গণতান্ত্রিক যাত্রা এক ভয়ংকর ভুলের দিকে মোড় নিতে পারে। মার্কিন সমাজ ও রাজনীতিতে এমন এক নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম হয়েছে, যা সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে। এর সাথে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে শক্তিশালী হওয়া সরকারি সংস্থাগুলো যুক্ত হলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হয়ে উঠতে পারে অপরিসীম।

দেশের সম্পদ আর ক্ষমতা গুটি কয়েক মানুষের হাতে চলে গেলে জন্ম নিতে পারে এক লোভী ও শোষক শ্রেণির। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, নির্বাচনী সীমানার অনৈতিক হেরফের আর উগ্রপন্থীদের দখলে থাকা দলীয় রাজনীতির কারণে এই ভেদাভেদ আরও গভীর হতে পারে। আর এমনটা হলে, সামনে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ওলটপালট আসতে চলেছে, তা সামাল দিতে রাজনীতিবিদরা হয়তো পুরোপুরি ব্যর্থ হবেন।

হোয়াইট হাউজ। ছবি: রয়টার্স
হোয়াইট হাউজ। ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনীতি যতই নোংরা আর হিংস্র হয়ে উঠছে, বাইরের দুনিয়াতেও দেশটি ঠিক ততটাই স্বার্থপর রূপ ধারণ করতে পারে।

আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা যেভাবে বিশ্বাস করতেন, সেই সুর মিলিয়ে বলাই যায়—এই অন্ধকার ভবিষ্যৎ কিন্তু একেবারেই নিশ্চিত নয়। আমেরিকার আসল রূপ হলো, যেকোনো বড় ধাক্কা সামলে নিয়ে তারা একদম নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

অতীতের বড় বড় সব ঐতিহাসিক সংকট ও কেলেঙ্কারি যেভাবে এই দেশকে একসময় পেছনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেগুলোই উল্টো তাদের আরও দ্বিগুণ শক্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জেদ জুগিয়েছিল। প্রতিবারই ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠে আমেরিকানরা নিশ্চিত করেছে যাতে পরের বার তারা আরও ভালো কিছু করে দেখাতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভালো হোক কিংবা মন্দ, আমেরিকায় এক বড় পরিবর্তন কিন্তু আসতে চলেছে। কারণ আজকের অনেক কিছুই এখন আর এভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধারদেনা করে চলা তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আর টিকবে না। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক প্রজন্মও বয়সের নিয়মে ফুরিয়ে আসছে।

তাদের জায়গায় সামনে আসবে এক নতুন এবং তরুণ আমেরিকান নেতৃত্ব। এখন আশা এটাই যে, ভোটাররা হয়তো শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারবেন দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের এই অন্ধ পারস্পরিক ঘৃণা আসলে দেশেরই ক্ষতি করছে, যা আর চলতে দেওয়া যায় না।

আমেরিকার আকাশে যখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির বর্ণিল আতশবাজি আলো ছড়াচ্ছে, তখন একটি কথা মনে রাখা দরকার—তাদের ভেতরের এই ছটফটে অস্থিরতাই কিন্তু এই দেশকে থমকে যেতে দেয় না। আজ যে তুমুল তর্ক-বিতর্ক আর লড়াই আমরা দেখছি, তা আসলে পুরোনোকে ভেঙে নতুন কিছু গড়ার আগের ঝড়।

আজকেও আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা বেঁচে থাকলে ঠিক একইভাবে চিন্তিত হতেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের সবচেয়ে বড় দূরদর্শিতা ছিল এটাই যে, তারা তাদের এই বিশাল পরীক্ষাটিকে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর ইতিহাস সাক্ষী, বারবার মানুষের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা আমেরিকা খুব সুন্দরভাবেই ফিরিয়ে দিয়েছে।

সম্পর্কিত