ট্রাম্প ও পুতিন–দুজনই পশ্চিম ইউরোপকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্প ও পুতিন–দুজনই পশ্চিম ইউরোপকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

রাশিয়া আতঙ্ক যেন কাটছে না পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর। পুতিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তারা যত চিন্তিত তার বেশি ভয় পাচ্ছেন নিজেদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারে। কারণ সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসলে কোনো লাভ হয়নি। বরং পুতিনের রাশিয়াকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

এর সাথে ইউরোপের জুটেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো এক অবিশ্বস্ত বন্ধু। যে বন্ধু সরে গেলে ন্যাটো নামক ইউরোপের নিরাপত্তার চাদর বলে কিছু থাকবে না। ট্রাম্প এই আছেন, এই নেই–এই দোলাচলে বিরাট বিপদে পড়েছেন ইউরোপের দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের। তারা ট্রাম্পকে না পারছেন গিলতে, না পারছেন ফেলতে। ফলে পুতিন ও ট্রাম্প দুজনের তাদের জন্য বড় পরীক্ষা। এ নিয়ে এক বিরাট সম্পাদকীয় লিখেছে লন্ডনের বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।

ইকোনমিস্ট শুরুটা করেছে এভাবে– ‘পোল্যান্ডের ওপর দিয়ে ড্রোন; এস্তোনিয়ার আকাশসীমা অতিক্রমকারী মিগ যুদ্ধবিমান; বাল্টিক সাগরের গভীর নিচে ক্ষতিগ্রস্ত টেলিকম কেবল; সাইবার-আক্রমণ এবং কোয়াডকপ্টার দ্বারা অচল হয়ে যাওয়া বিমানবন্দর; রহস্যময় বিস্ফোরণ ও গুপ্তহত্যা; নির্বাচন বানচাল করার জন্য প্রচারণামূলক বার্তা ছড়ানো বট সোয়ার্ম–এগুলোর কোনোটিই এককভাবে যুদ্ধের কারণ নয়, কিন্তু একসঙ্গে এরা নতুন ও বিপজ্জনক কিছুর জন্ম দিচ্ছে।’

ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর বিরুদ্ধে একটি ‘গ্রে-জোন’ তৈরির অভিযান চালাচ্ছেন। এটি একটি সস্তা, অস্বীকারযোগ্য এবং পরিমিত প্রয়াস, যার লক্ষ্য হলো ইউরোপকে অস্থির করে তোলা। এই চেষ্টা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে সতর্কতার সঙ্গে দূরে রয়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ কয়েক দিন আগে বলেছেন, “আমরা যুদ্ধে নেই। তবে আমরা আর শান্তিতেও নেই।”

ক্ষয়ক্ষতি কখনোই তেমন ব্যাপক হয়নি, তাহলে উদ্দেশ্য কী? পুতিন জানেন, তিনি একটি সরাসরি যুদ্ধে ন্যাটোকে পরাজিত করতে পারবেন না। কিন্তু তার লেখা ও বক্তৃতার বৃহত্তর পরিসর বিচার করলে দেখা যায়, ঝামেলা সৃষ্টি করার চেয়েও বেশি কিছু করাই তার লক্ষ্য। তিনি তিনটি বিষয় অর্জনের চেষ্টা করছেন। তাকে এর সবকটিতেই ব্যর্থ হতে হবে। প্রথমত, পুতিনের লক্ষ্য হলো ন্যাটোর ঐক্য ভাঙা। তার উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয়দের একে অপরের প্রতি সন্দিহান করে তোলা। বিশেষ করে ১৯৪৯ সালে তৈরি হওয়া এই জোটের প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তিনি এই সন্দেহ জাগানোর চেষ্টা করছেন যে, ন্যাটো চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ–যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো একজন সদস্যকে আক্রমণ করলে সেটা সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে–এর প্রতি ভরসা করা যায় না।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পুতিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আমেরিকাকে পুরোপুরি ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তিনি প্রায়ই বলেন, ন্যাটো রাশিয়ার বিচ্ছিন্ন করার তালে আছে। তাই এটিকে অবশ্যই ভেতর থেকে ধ্বংস করতে হবে।

এই শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকা তার সব শত্রু ও মিত্রদের মিলিত শক্তির চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান ছিল। ওসামা বিন লাদেন সেই ক্ষমতার পতনের পথ তৈরি করে দেন। ২০০১ সালে নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে আঘাত আমেরিকাকে আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালাতে ভীষণভাবে প্রলুব্ধ করে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরে বাইরের দেশের প্রতি অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত তৈরি হয়।

চিনের শাসকেরাও পূর্ব এশিয়া থেকে আমেরিকার একই ধরনের পিছু হটার স্বপ্ন দেখেন। সেই কারণেই শি জিন পিং-ও ‘গ্রে-জোন’ ব্যবহার করে তাইওয়ানকে অরক্ষিত বোধ করাতে চাইছেন। তার এশীয় অংশীদারদের প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ জাগাচ্ছেন। ১৯৪৫ সাল থেকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বকে টিকিয়ে রেখেছে, সেটির প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঔদাসীন্য শি জিন পিং-এর কাজকে আরও সহজ করে দিচ্ছে।

ইউরোপের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। পোল্যান্ডে ড্রোন অনুপ্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে এটি ‘একটি ভুল হতে পারে’। যদিও এ সময় পোল্যান্ডের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল। এই কথার সঙ্গে দশ দিন পরে তিনটি মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান এস্তোনিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে। তাই এরমধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

যদি প্রয়োজন হয়, তবে ইউরোপে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অঙ্গীকারের ওপর জোর দেওয়া উচিত। যদি নাশকতা এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনকে নিয়মিত ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা করা হয়, তবে প্রতিরোধ ক্ষমতা বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। আর একবার এই বিতর্ক শুরু হলে, প্রতিরোধ করার ক্ষমতা দুর্বলতায় পর্যবসিত হয়।

প্রেসিডেন্ট পুতিনের দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ইউক্রেনকে নিয়ে। তার গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে। তাই তিনি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য খরচ বাড়াতে চান। এই ‘গ্রে-জোন’ আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেইসব দেশ, যারা ইউক্রেনের সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থক।

পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও ডেনমার্ক ড্রোন অনুপ্রবেশ, জিপিএস জ্যামিং এবং নাশকতার শিকার হয়েছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী সংস্থাগুলো সাইবার-আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। মলদোভা ও রোমানিয়া, যারা সম্মুখসারির দেশ–তাদের নির্বাচনেও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, পুতিনের উদ্দেশ্য সবসময় সফল হয় না। তবে ভোটার ও রাজনীতিকদের কাছে তার বার্তাটি স্পষ্ট: ইউক্রেনে অস্ত্র না পাঠিয়ে, আপনাদের উচিত রাশিয়ার মন জুগিয়ে চলা অথবা নিজেদের রক্ষা করার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

এই অভিযানের তৃতীয় ব্যাখ্যাটি আরও গভীর ও পুরনো। পুতিন ধ্রুপদী উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে ঘৃণা করেন। কারণ তারা তার ব্যর্থতা ও দমন-পীড়নকে স্পষ্ট করে তোলে। অর্থনৈতিকভাবে তারা তার চেয়ে অনেক এগিয়ে। রাশিয়ার জনসংখ্যা ইতালির দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও, তাদের জিডিপি ইতালির চেয়ে কম। তিনি যত বেশি পশ্চিমের অভ্যন্তরে অশান্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারবেন, তাকে তত বেশি শক্তিশালী দেখাবে। তিনি মধ্যপন্থী সরকারগুলোর যত বেশি মর্যাদাহানি করতে পারবেন, ততই সেইসব মনোরঞ্জনবাদী জাতীয়তাবাদী দলগুলো লাভবান হবে। এই দলগুলো তার মতোই ঐক্যবদ্ধ ইউরোপকে সন্দেহের চোখে দেখে।

মিত্রদের কী করা উচিত? এর জবাবে বলতে হয়, প্রথমত, তাদের সবকিছু প্রকাশ করে দিতে হবে। প্রলোভন জাগতে পারে যে ছোটখাটো উসকানিগুলিকে উপেক্ষা করা হোক, অথবা রাশিয়ার দায়বদ্ধতার প্রমাণ না থাকায় অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকা হোক। কিন্তু ‘গ্রে-জোন’-কে উপেক্ষা করার অর্থ হলো এটিকে স্বীকার করে নেওয়া। আর একবার স্বীকার করে নিলে, এটি বাড়তেই থাকে। নাশকতা, সাইবার-আক্রমণ, নির্বাচন-হস্তক্ষেপ–প্রত্যেকটির জন্য দ্রুত প্রমাণসহ দায়িত্ব নির্ধারণ ও প্রচার করা উচিত। এটি রাশিয়াকে অস্বীকার করার পথকে বিশ্বাসযোগ্য পন্থায় বঞ্চিত করবে এবং পশ্চিমের ভোটারদের শিক্ষা দেবে যে, তারাও এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু।

ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রতিকূলতার মধ্যে ঐক্য উন্নত করতে হবে। এজন্য কেবললাইন ও পাইপলাইনের জন্য অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ ও মেরামতকারী দল, দ্রুত সাইবার আক্রমনের জবাব দেওয়ার মতো দল এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। এটি হলো অতিরিক্ত ব্যবস্থা। এর প্রস্তুতি তৈরির একটি নীরস কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

একই সাথে, ইউরোপীয়দের তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত করতে হবে। বাল্টিক সাগরে টহলদারি নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে। ইউরোপের এমন ইন্টারসেপ্টর দরকার যা রাশিয়া হাজার হাজার সংখ্যায় যে ড্রোন তৈরি করছে, সেগুলোকে ভূপাতিত করতে পারে। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি ডলার মূল্যের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে শেষমেষ ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে।

সবশেষে, এই জোটকে আরও স্পষ্ট মূল্য ধার্য করতে হবে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা ড্রোনের প্রতিক্রিয়ায় সরবরাহকারী ও ভুয়ো কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত। সাইবার-আক্রমণের জবাব দিতে হবে পাল্টা সাইবার হামলার মাধ্যমে।

এখন সময় এসেছে রাশিয়ার স্থগিত সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য অর্থ প্রদানের, যা আসলে ইউরোপের প্রতিরক্ষা। এবং হ্যাঁ, সেই প্রতিরক্ষার অর্থ হতে পারে জীবন বা সম্পত্তির জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী কোনো যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামানো।

দুর্বলচিত্তেরা উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে চিন্তিত। কিন্তু কাজ করা থেকে বিরত থাকা অন্য ধরণের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। যদি রাশিয়া মনে করে যে তারা সীমিত আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ করেও পার পেয়ে যেতে পারে, তবে একদিন সত্যিই বিপজ্জনক কিছু ঘটতে পারে। যেমন পুতিন এস্তোনিয়া সীমান্তের নারভা শহরের চারপাশের কিছু অংশ দখল করে নিতে পারেন, যে শহরটি রুশভাষী লোকে পূর্ণ এবং যাদের অধিকার রক্ষার অজুহাত রাশিয়া দেখায়।

আমেরিকার নিশ্চয়তা সুদৃঢ় হলেও, এই সব কিছু করা কঠিন। আর যখন ট্রাম্প জোটের একজন অনিশ্চিত সদস্য, তখন কাজটি আরও বেশি কঠিন। এ বছর ট্রাম্প বলছেন, তিনি ন্যাটোকে সমর্থন করেন। কিন্তু গত বছর তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যেসব সদস্য যথেষ্ট অর্থ প্রদান করে না, তাদের সাথে ‘রাশিয়া যা খুশি তাই করুক’ সে ব্যাপারে তিনি রাশিয়াকে ‘উৎসাহিত’ করবেন।

এই ধরনের কথাকে বিভেদ সৃষ্টি করার মন্ত্র হিসেবে ধরা হয়। আর পুতিন সেটা মন দিয়ে শুনেছেন।

সম্পর্কিত