মরক্কো ও উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ছোট স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতার মধ্যকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কার্যত ভেঙে পড়ে। এর ফলে বিশৃঙ্খল ও প্রাণঘাতী পরিস্থিতির মধ্যে আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে স্পেনের অংশে প্রবেশ করে। এ ঘটনায় কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এ নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি চরচার পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
সেউতার স্থায়ী জনসংখ্যার তুলনায় এই আগমনের সংখ্যা ছিল দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। শুক্রবার সেখানে মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে মরক্কোর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, প্রতি ঘণ্টায় শত শত মানুষ স্বেচ্ছায় ফিরে যাচ্ছিলেন।
সেউতা এবং উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত আরেকটি স্প্যানিশ অঞ্চল মেলিয়া—এই দুটি অঞ্চলই আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত।
১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেউতায় খ্রিস্টান ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দা এবং সীমান্ত পারাপারকারী দৈনিক শ্রমিকেরা সাধারণত শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করেন। তবে মরক্কো আনুষ্ঠানিকভাবে সেউতা ও মেলিয়াকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; বরং এগুলোকে প্রায়ই ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ বলে উল্লেখ করে।
কেন সেউতা অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ?
উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগ কিংবা নিজ দেশে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে যেতে চাওয়া মানুষের অন্যতম গন্তব্য স্পেন। মরক্কো এবং আফ্রিকার অন্য অঞ্চল থেকে স্পেনে পৌঁছানোর অন্যতম প্রবেশদ্বার হওয়ায় সেউতা ও মেলিয়ায় কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
সেউতা বা মেলিয়ায় পৌঁছানো অনেক অভিবাসীকেই সঙ্গে সঙ্গে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়। তবে কেউ কেউ স্পেনে আশ্রয়ের আবেদন করার পর অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে।
সেউতায় পৌঁছাতে অনেকেই মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার (৩ মাইল) সাঁতরে আসে। কেউ কেউ আরও কাছের বেলিউনেশ শহর থেকেও সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে।
২০২২ সালে প্রায় দুই হাজার মানুষ, যাদের বেশির ভাগই সাব-সাহারা আফ্রিকার বাসিন্দা, মেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করলে ২৩ জন নিহত হয়। এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ২০০ জন সীমান্তের বেড়া টপকে বা ব্রেকওয়াল ঘুরে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করলে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
তবে সেউতা ও মেলিয়ায় পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা সাধারণত ক্যানারি ও বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে পৌঁছানো মানুষের তুলনায় অনেক কম।
গত কয়েক দশকে স্পেনে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ৫ কোটির জনসংখ্যার দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি মানুষ বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে। তাদের অনেকেই কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসেছে এবং কৃষি, পর্যটন ও সেবাখাতসহ স্পেনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে কাজ করছে।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ উত্তর আফ্রিকা ও তুরস্ক থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয়ের খোঁজে আসছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের অন্তত ৩৫ হাজার ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বা তারা নিখোঁজ হয়েছেন। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই মৃত বা নিখোঁজের সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৩।
কীভাবে এত মানুষ সীমান্ত পার হতে পারল?
এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। মরক্কো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে তারা কতটা চেষ্টা করেছে, তাও স্পষ্ট নয়।তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর সঙ্গে মরক্কো ও আলজেরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাম্প্রতিক আলজিরিয়া সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে সর্বশেষ বড় ধরনের সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা ঘটেছিল। তখন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টের নেতাকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য স্পেনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধের সময় মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল।
মরক্কো ও পলিসারিও ফ্রন্ট—উভয়েই পশ্চিম সাহারা তাদের বলে দাবি করে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি স্পেনের উপনিবেশ ছিল। পরে স্পেন এটি মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার কাছে হস্তান্তর করে।
২০২২ সালে স্পেন দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান পরিবর্তন করে পশ্চিম সাহারা বিষয়ে মরক্কোর পরিকল্পনাকে সমর্থন দিলে ওই কূটনৈতিক সংকটের অবসান হয়। তবে এতে পলিসারিওকে সমর্থনকারী আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।
চার বছর পর গত ২০ জুলাই সানচেজ আলজিরিয়া সফর করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
শুক্রবার সেউতায় গিয়ে সানচেজ বলেন, মানবপাচারকারীরা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠানো যাবে না। তার দাবি, এই গুজবই হঠাৎ এত মানুষের সীমান্ত অতিক্রমের অন্যতম কারণ।
ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের অভিবাসন গবেষক মাত্তেও ভিলা মনে করেন, এর পেছনে রাজনৈতিক কারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘‘২০২১ সালে যা ঘটেছিল, গতকালের ঘটনা তারই আরও বড় সংস্করণ। সাধারণত যেখানে মাসে কয়েক শ মানুষ আসে, সেখানে এক রাতে ৫০ হাজার মানুষ আসতে পারে না। সানচেজের আলজেরিয়া সফর মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।’’
তার মতে, ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে জেনেই মরক্কো হয়তো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছে, যাতে বোঝানো যায় যে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন দেখতে মরক্কো বেশ উপভোগ করে।’’
সরকার ও কর্তৃপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ ঘটনাটিকে ‘স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সীমান্তের বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও স্পেন সরকারের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও মতভেদ সৃষ্টি করেছে। ডানপন্থী রাজনীতিকেরা এ ঘটনার জন্য চলতি বছর শত শত হাজার অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার স্পেনের নীতিকে দায়ী করেছেন।
ইতালির কট্টর ডানপন্থী সরকার স্পেনকে শেনজেনের অবাধ যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করারও আহ্বান জানায়—যদিও সেউতা ও মেলিয়া প্রচলিত অর্থে শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। একই সময়ে ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে।