রাশিয়ার সাম্প্রতিক স্টেট ডুমা বা সংসদীয় নির্বাচন বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রুশ গণমাধ্যম আরটি-তে প্রকাশিত দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভ্লাদিমির কর্নিলভের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’ রাশিয়ার নির্বাচনটি নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘পোটেমকিন ইলেকশন’ বা পোটেমকিন নির্বাচন।
কর্নিলভ উল্লেখ করেন, এই উপমার মাধ্যমে দ্য টাইমস সম্পাদক মূলত তার নিজস্ব ঐতিহাসিক অজ্ঞতাই প্রকাশ করেছেন। ঐতিহাসিক সত্য হলো, ফিল্ড মার্শাল পোটেমকিন রুশ সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথরিন এবং তার সাথে থাকা বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কোনো কৃত্রিম বা ভুয়া গ্রাম দেখাননি। তিনি তাদের দেখিয়েছিলেন তারই প্রতিষ্ঠিত নতুন শহরসমূহ—যেমন ইয়েকাতেরিনোস্লাভ (বর্তমান দনেপ্রোপেত্রোভস্ক), খেরসন ও সেভাসতোপোল, এবং হঠাৎ বিকাশ লাভ করা এক শক্তিশালী কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর যা সেসময়ের অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় জোসেফকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। বর্তমানে দ্য টাইমস যদি বিশ্বাস করতে চায় যে এই শহরগুলোর অস্তিত্ব কখনোই ছিল না, তবে তাদের আধুনিক নভোরোশিয়া ও ক্রিমিয়ার মানচিত্রের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই স্টেট ডুমা নির্বাচনের গুরুত্বকে ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের দক্ষিণ রাশিয়া ভ্রমণের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সেই ঐতিহাসিক যাত্রা সমগ্র বিশ্বের সামনে প্রমাণ করেছিল যে ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একসময়ের বন্য প্রান্তর এখন রুশ সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তৎকালীন সময়েও এই বাস্তবতা ঢাকতে ভুয়া খবরের কারিগররা যেমন ‘পোটেমকিন ভিলেজ’-এর গল্প বানিয়েছিল, ঠিক একইভাবে আজ প্রায় ২৫০ বছর পর পোটেমকিনের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ভূখণ্ড এবং শহরগুলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে পশ্চিমা গণমাধ্যম বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে।
ভ্লাদিমির কর্নিলভ তার বিশ্লেষণে পশ্চিমা গণমাধ্যমের চরম দ্বিমুখী নীতি ও ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। নির্বাচনের মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে ব্রিটিশ দ্য সানডে টাইমস একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করে দাবি করেছিল যে, এই নির্বাচন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে নিবন্ধকার আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই ভোটের মাধ্যমে সরকারের প্রতি রাশিয়ানদের ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ পাবে এবং প্রমাণ হবে যে ক্রেমলিনের প্রতি জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ক্রেমলিন তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। নির্বাচনের আগে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এমন আশাবাদী নিবন্ধের কোনো অভাব ছিল না।
তবে নির্বাচনের ফলাফল আসার পরপরই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে যায়। ‘দ্য স্পেক্টেটর’ সাময়িকীতে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে নির্বাচনের হতাশাজনক ফলাফল এবং উচ্চ ভোটারের উপস্থিতি দেখে চরম বিরক্তি প্রকাশ করা হয় এবং এই নির্বাচনকে ‘কারচুপিযুক্ত’ আখ্যা দিয়ে তা উপেক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়। সেই নিবন্ধে বলা হয়, বেশির ভাগ রাশিয়ান যুদ্ধ বন্ধ দেখতে চায় ঠিকই, তবে তাদের প্রতিদিনের দুর্ভোগ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা থেকে শুরু করে গ্যাসের লাইনে দাঁড়ানোর মতো সমস্যার জন্য তারা ক্রেমলিনকে নয়, বরং কিয়েভ সরকারকে দায়ী করছে। কৌতূহলজনক বিষয় হলো, দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক নিবন্ধ লিখেছেন একজনই ব্যক্তি—তিনি হলেন ব্রিটেনের শীর্ষ রুশ-বিষয়ক তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞ’ মার্ক গ্যালিওটি। একই ঘটনার মূল্যায়নে কয়েকদিনের ব্যবধানে এমন বৈপরীত্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাশিয়ার নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পশ্চিমা অভিজাত গোষ্ঠী কতটা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে।
কর্নিলভ যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা রাজনীতিবিদেরা ২৫০ বছর আগেও রাশিয়ানদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং আজও তারা তা বুঝতে সক্ষম হননি। পশ্চিমা বিশ্ব ভেবেছিল ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের ‘প্রভাব বিস্তারকারী অভিযান’, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও গুদামে হামলা এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণের ফলে পুরো রাশিয়া জুড়ে অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠবে। তারা ধরে নিয়েছিল অন্তত ইউক্রেনীয় বিমান হামলার শিকার সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু তারা এটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, বহিঃশত্রুর এমন কর্মকাণ্ড রুশ জনগণের মধ্যে ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং তাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, নতুন যুক্ত হওয়া ভূখণ্ডের বাসিন্দারা নিজেদের মূল রাশিয়া থেকে আলাদা কিছু মনে করেন না।
প্রতিবেদনে শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই ইউরোপীয় নেতারা আজ দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ভোটের আগেই ইইউ প্রতিনিধি কায়া ক্যালাস একটি নোটিশ জারি করে ঘোষণা করেছিলেন যে, এসব অঞ্চলের নির্বাচনকে তারা স্বীকৃতি দেবেন না। কর্নিলভের মতে, পশ্চিমা শাসকেরা শত শত বছর আগের মতোই আজকের রাশিয়ান সমাজ ও তাদের মানসিকতা সম্পর্কে সমানভাবে অজ্ঞ, আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই তারা পুনরায় ‘পোটেমকিন ভিলেজ’-এর মতো পুরোনো রূপকথা ও অবাস্তব আখ্যানের আশ্রয় নিচ্ছেন।