Advertisement Banner

ইরান সংকটে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী, না পক্ষভুক্ত শক্তি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান সংকটে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী, না পক্ষভুক্ত শক্তি?
পাকিস্তানের এই দ্বৈত অবস্থানের পেছনে রয়েছে তার ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ছবি: রয়টার্স

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, তখন পাকিস্তান এক জটিল ও সূক্ষ্ম কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দেশটি নিজেকে একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে তার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা তাকে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রেখেছে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির অনলাইনে সালমান মাসুদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দ্বৈত অবস্থান পাকিস্তানের জন্য সুযোগের পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যখন জেদ্দায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন, তখন একটি প্রতীকী ছবি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই ছবিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সামরিক পোশাকে উপস্থিত ছিলেন। এই দৃশ্য যেন পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে–একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে কূটনৈতিক সক্রিয়তা। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে আলোচনা– এই দ্বৈত ভূমিকাই এখন ইসলামাবাদের বাস্তবতা।

৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেখানে চীনও সহায়ক ছিল। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান এমন একটি ভূমিকা নিয়েছে, যা অতীতে কোনো আঞ্চলিক সংকটে সে পালন করেনি। কিন্তু এই ভূমিকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার কৌশলগত সংকট। কারণ, একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য থাকতে হলে তাকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, অথচ তার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সেই নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে।

বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই চুক্তি শুধু সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ কৌশল নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা সমন্বয়ের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা সবসময় সৌদি আরবের পাশে থাকবে। এই প্রতিশ্রুতি ইরানের কাছে পাকিস্তানের নিরপেক্ষতার ওপর প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।

তবে পাকিস্তানের এই দ্বৈত অবস্থানের পেছনে রয়েছে তার ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব পাকিস্তানের একটি প্রধান অর্থনৈতিক সহায়ক। তেল সরবরাহ, ঋণ, বিনিয়োগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স– এসবই পাকিস্তানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। ফলে ইসলামাবাদের জন্য রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা কেবল কৌশলগত নয়, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাও।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও একেবারে উপেক্ষণীয় নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক দিক থেকে পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। অতীতে পাকিস্তান চেষ্টা করেছে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই নীতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষণে সালমান মাসুদ উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা চুক্তি একে অপরের বিপরীতমুখী মনে হলেও, বাস্তবে এই দুই বিষয় একে অপরকে শক্তিশালীও করতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে পাকিস্তান ইরানের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করতে পারে– কারণ সে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম।

তবে এই ভারসাম্য খুবই নাজুক। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা দাবি করে, তাহলে ইসলামাবাদকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই মুহূর্তে তার মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ভেঙে পড়তে পারে এবং তাকে সরাসরি এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।

এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০-এর দশক থেকে পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবে নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে কাজ করে আসছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সৌদি আরব পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। আর পাকিস্তান আফগান প্রতিরোধে উপসাগরীয় অর্থের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে একটি গভীর পারস্পরিক প্রত্যাশা তৈরি করেছে, যা এখন আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়েছে।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ড-এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও কিছু আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া, এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি– এসবই আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা অংশীদারদের আরও দৃঢ় করতে চায়, আর পাকিস্তান সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সব মিলিয়ে, পাকিস্তান বর্তমানে একটি ‘টাইটরোপ’ বা সুক্ষ দড়ির ওপর হাঁটার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে। একদিকে সে কূটনৈতিকভাবে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যদিকে তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নির্ভরতা তাকে নির্দিষ্ট জোটের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়।

যদি পাকিস্তান সফলভাবে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে একটি স্থায়ী সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যদি পরিস্থিতি উল্টো দিকে যায়, তাহলে তাকে এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।

অতএব, বর্তমান সংকট শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। ইসলামাবাদ এই পরীক্ষায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে তার কূটনৈতিক দক্ষতা, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

সম্পর্কিত