ইউটিউবের সার্চ বারে ‘9/11 conspiracy theories’ লিখে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন, সেদিন আসলে ‘কী ঘটেছিল’ সে বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে সারিবদ্ধ মানুষের কোনো কমতি নেই।
জো রোগান এবং টাকার কার্লসনের মতো ধারাভাষ্যকারদের নানা চটকদার মন্তব্যের পাশাপাশি সিআইএ, ডিপ স্টেট বা ইলুমিনাতিকে দায়ী করে তৈরি করা অসংখ্য ভিডিওর এক অন্তহীন সংগ্রহ সেখানে রয়েছে। এ রকমই একটি ভিডিওর থাম্বনেইলে লেখা রয়েছে ‘ইনসাইড জব?’, যা পাঁচ লাখেরও বেশিবার দেখা হয়েছে। এর পরই ভিডিওটিতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে আগুন লাগার ফুটিয়েজ ক্লোজ-আপ করে দেখানো হয়।
নিউইয়র্ক সিটির ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি বিমান হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পঁচিশ বছর পরও ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর রেশ কাটেনি; বরং এগুলো আরও ‘শক্তিশালী’ হয়েছে এবং নতুন রূপ ধারণ করেছে।
একসময় মনে করা হতো একটু অদ্ভুত স্বভাবের কিছু মানুষ, যারা মায়ের কোলে বসে অসম্ভব সব তত্ত্ব আদান-প্রদান করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিজ যখন ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগকে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এসব তত্ত্ব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অস্বস্তিকর অংশে পরিণত হয়েছে।
ভুয়া খবরের এই যুগে প্রথাগত গণমাধ্যম ও সরকারের ওপর আস্থার ঘাটতির কারণে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো মূলধারার রাজনীতির সাথে আরও বেশি মিশে যাচ্ছে। কিউঅ্যানন থেকে শুরু করে ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনে কারচুপির মিথ্যা দাবি পর্যন্ত, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তুষ্ট সমর্থকদের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলা চালাতে উসকে দিয়েছিল।
এমনকি অতি সম্প্রতি, অনলাইনে নাইন-ইলাভেন হামলায় ইসরায়েলের জড়িত থাকার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নতুন কিছু দাবিও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এগুলো পুরনো তত্ত্বগুলোকে নতুন করে সামনে আনার পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার যুদ্ধ এবং মার্কিন রাজনীতিতে দেশটির প্রভাব নিয়ে জনমনে বিদ্যমান ক্ষোভ ও অসন্তোষকে কাজে লাগাচ্ছে।
ফলস্বরূপ, ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো রাজনৈতিক প্রান্তিক অবস্থান থেকে সরে এসে মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে। এগুলো বাস্তব জীবনের বিভিন্ন উদ্বেগ ও ভয়ের পেছনে ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে এবং চরমপন্থী রাজনীতিকদের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ব্যবহারের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আঁতুড়ঘর
মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি সন্দেহের শেকড় বেশ গভীরে প্রোথিত। নাইন-ইলাভেনের কয়েক দশক আগেই ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো এর প্রকৃত হোতা কে–তা নিয়ে নানা ধরনের কল্পকাহিনি ও তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল।
তবে নাইন-ইলাভেনের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। টেলিভিশন স্ক্রিনে সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়া এই হামলা চরম ভয় ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল। আর সারা পৃথিবীর মানুষ সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখেছে। নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক তত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক হুগো দ্রোশোঁ উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনাটি শুরু থেকে ক্যামেরাবন্দি হয়েছিল।
৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে বহু নিউইয়র্কবাসী। ছবি: রয়টার্স
দ্রোশোঁ বলেন, “মানুষ এটি টিভিতে দেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এবং এটি ছিল এক বিরাট ধাক্কা। এ ছাড়া এর মধ্যে উড়োজাহাজ ছিনতাই করে তা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আছড়ে ফেলার মতো এক ধরনের চাক্ষুষ প্রদর্শনী বা নাটুকে ব্যাপারও ছিল। এটি একটি পুরো প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।”
এই হামলার ঠিক পরপরই দুটি যুদ্ধ শুরু হয়, যা মার্কিন সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থাকে আরও তীব্র করে তোলে। নাইন-ইলাভেনের হামলার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। এরপর ২০০৩ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকে আক্রমণ করে। কারণ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল যে, তৎকালীন ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেনের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে–যা পরে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কারণ, পরবর্তীকালে এ ধরনের কোনো অস্ত্রই পাওয়া যায়নি।
সরকারের বলা এসব মিথ্যা–বিশেষ করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার দাবিটিকে সমালোচকরা মিথ্যা হিসেবে দেখেছেন। ঠিক একইভাবে এই মিথ্যাচার ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর পুনরুত্থান ও প্রসারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
দ্রোশোঁ বলেন, “মিথ্যা কথা মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করে, আর অনাস্থার সাথে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিশ্বাসের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।”
তাছাড়া গত পঁচিশ বছরে মানুষের তথ্য গ্রহণের পদ্ধতিতে এক দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। ২৪ ঘণ্টার মুভিং নিউজ বা সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন কভারেজ এবং সদ্য বিকাশমান ইন্টারনেট সংস্কৃতির মাধ্যমে একই সাথে ছড়িয়ে পড়া এত বড় স্কেলের ঘটনা হয়তো নাইন-ইলাভেনের হামলাই প্রথম।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ ও প্রভাষক ডেভিড রবার্টসন আল জাজিরাকে বলেন, “প্রাথমিক ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ক্যাবল নিউজ ও ২৪ ঘণ্টার সংবাদ প্রচারের সমসাময়িক সময়েই আত্মপ্রকাশ করেছিল।”
রবার্টসন আরও বলেন, “নাইন-ইলাভেনের সময় মানুষ সরাসরি সম্প্রচার দেখছিল। ফলে মানুষ ঘটনার প্রমাণের ভেতরকার আপাত ফাঁকফোকরগুলো খুঁজে বের করার এবং সেগুলোর ব্যবচ্ছেদের সুযোগ পেয়েছিল, যা বিশেষ করে ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে আরও বৃদ্ধি পায়।”
হামলার মাত্র চার বছর পর চালু হওয়া ইউটিউব এই তত্ত্বগুলোর বিস্তার ও প্রসারের জন্য নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়। ‘লুজ চেঞ্জ’-এর মতো চলচ্চিত্র–যেগুলোতে দাবি করা হয়েছিল যে, মার্কিন সরকারের ভেতরের কোনো চক্র এই হামলা ঘটিয়েছে বা ঘটতে ‘সুযোগ করে দিয়েছে’। এগুলো অনলাইনে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল। পাশাপাশি, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টাওয়ারগুলো নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে ভেঙে ফেলা হয়েছিল–এমন ভুয়া দাবিগুলোকে কেন্দ্র করে ইন্টারনেটে নিজস্ব বড় বড় কমিউনিটি গড়ে ওঠে।
পোস্ট ট্রুথ ও ফেক নিউজ
ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সবসময়ই ছিল–এমনটাই বলছেন দ্রোশোঁ। তিনি বলেন, “যা বদলে গেছে, তা হলো সেই মুহূর্তটি–যখন রাজনীতিবিদরা ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন।”
সেই মোক্ষম মুহূর্তটি আসে ২০১৬ সালে, যে বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে তার প্রথম মেয়াদের জন্য নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেননি এবং তাই তিনি এই পদের অযোগ্য–এই মিথ্যা জন্মসংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি প্রচারের মাধ্যমেই ট্রাম্প তার জাতীয় রাজনৈতিক পরিচিতির একটি অংশ তৈরি করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প বারবার অন্যান্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও মনগড়া দাবিগুলোকে লুফে নেন বা সেগুলোর প্রচার চালান। তিনি তার বিরুদ্ধে একটি ‘ডিপ স্টেট’ কাজ করছে বলে অভিযোগ তোলেন এবং কিউঅ্যানন-এর সাথে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলোর প্রচার বাড়িয়ে দেন। উল্লেখ্য, কিউঅ্যানন হলো একটি অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বভিত্তিক আন্দোলন, যা ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মপ্রকাশ করে।
দ্রোশোঁর মতে, যারা অন্ধের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিশ্বাস করে, ট্রাম্পের সেই আবেদন ঐতিহ্যগতভাবে কম রাজনৈতিক সচেতনতাসম্পন্ন মানুষের একটি নতুন ভোটার ভিত্তি গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। দ্রোশোঁ বলেন, “ট্রাম্প সে ধরনের ভোটারদের সক্রিয় করে তুলেছিলেন। এমন কিছু মানুষ ভোট দিতে এসেছিল, যারা এর আগে কখনো ভোট দেয়নি। যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রেও আপনি এর অনুরূপ কিছু দেখতে পেয়েছিলেন।”
ব্রেক্সিট হলো ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের সেই গণভোট, যেখানে যুক্তরাজ্যের অর্ধেকের বেশি ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগ করার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
একই সময়ে অপেক্ষাকৃত নতুন সোশ্যাল মিডিয়া ইকোসিস্টেমগুলো এ ধরনের দাবিগুলোর প্রচারের গতি ও পরিধি বদলে দিয়েছিল। দ্রোশোঁ বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করে এবং সেগুলোকে আরও বেশি দৃশ্যমান করে তোলে।”
দ্রোশোঁ আরও বলেন, “এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনীতিবিদদের এসব লুফে নেওয়ার প্রবণতা। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। রাজনীতিবিদরা তত্ত্বগুলো বারবার আওড়ে যাওয়ার কারণে সেগুলোর প্রচার বাড়ে, আর মানুষ তখন সেগুলোকে আরও গুরুত্বের সাথে নিতে শুরু করে। কারণ তাদের কাছে মনে হয় যে, এগুলো ট্রাম্পের মতো রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করছে।”
ভুয়া খবর যখন কোনোভাবে পরম সত্যে পরিণত হলো, তখন ট্রাম্পের অনুগত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা ভোটাররা কোনো প্রমাণ ছাড়াই বারবার দাবি করতে শুরু করলেন–ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির কারণেই ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার পরাজয় ঘটেছে। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি, কংগ্রেস যখন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের জন্য এক হয়, তখন তার সমর্থকদের একটি উন্মত্ত জনতা মার্কিন ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায়। ক্যাপিটলে প্রবেশকারী ওই জনতার ভিড়ের মধ্যে কিউঅ্যাননের বিভিন্ন প্রতীক ও স্লোগান স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা ব্যক্তিদের দ্বারা ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে এবং বাস্তব দুনিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা বা পদক্ষেপকে উসকে দিতে পারে। দ্রোশোঁ উল্লেখ করেন, “মানুষ এগুলোকে হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। যখন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এগুলো গ্রহণ করে, তখন তা এক বিরাট হুমকিতে পরিণত হয়।”
নাইন-ইলাভেনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো যেভাবে আবার ফিরে এল
নাইন-ইলাভেনের পঁচিশ বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছেন এবং হামলার ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতে আসলে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে আবারও তার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
চলতি সপ্তাহে একটি স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, গ্রাউন্ড জিরো থেকে দমকলকর্মীরা তাকে কোলে করে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য তিনি সেখানে কর্মীদের সাথে উপস্থিত হয়েছিলেন। সে সময় পাশের একটি ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় দমকলকর্মীরা তাকে সরিয়ে নেন। রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট দাবি, “দুজন দমকলকর্মী–বড়সড়ো শক্তিশালী মানুষ, আর আমিও তো আর পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মানুষ নই–তারা আমার দুই হাত ধরে বললেন, ‘এখান থেকে বের হতে হবে’। এবং তারা আক্ষরিক অর্থেই আমাকে তুলে নিয়েছিলেন।”
নাইন-ইলাভেনের ঘটনার সাথে ট্রাম্পের নিজের নাম জড়ানোর বা হামলাগুলো সম্পর্কে বিতর্কিত দাবি করার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে তার প্রথম নির্বাচনী প্রচারের আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভেঙে পড়ার সময় তিনি নিউ জার্সির জার্সি সিটিতে ‘হাজার হাজার’ মানুষকে উল্লাস করতে দেখেছেন। এই দাবির স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যাতে মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল যে, ডেমোক্র্যাট দলের মার্কিন প্রতিনিধি ইলহান ওমর নাইন-ইলাভেনের বার্ষিকীতে নাচছিলেন। এর ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, “ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন মুখ!” কিন্তু বাস্তবে ভিডিওটি সম্পূর্ণ অন্য একটি দিনে অনুষ্ঠিত কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের একটি ইভেন্টের ছিল।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিও নাইন-ইলাভেনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করেছেন।
রিপাবলিকান পার্টির সাবেক কংগ্রেসওম্যন মার্জোরি টেলর গ্রিন একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত মার্কিন পেন্টাগনে আদৌ তৃতীয় কোনো বিমান আঘাত হেনেছিল কি না, যেখানে নিউইয়র্কে নিহতদের ছাড়া আরও প্রায় ২০০ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। গ্রিন পরে স্বীকার করেন যে, এই দাবি করা তার ভুল হয়েছিল।
ট্রাম্পের একজন প্রভাবশালী মিত্র ও অতি-ডানপন্থী অ্যাকটিভিস্ট লরা লুমার একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে নাইন-ইলাভেনকে একটি ‘ইনসাইড জব’ বলে অভিহিত করা হয়।
ডানপন্থী ‘ইনফওয়ার্স’ প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা এবং ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক অ্যালেক্স জোনসকে ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। কানেকটিকাটের নিউটাউনে ২০১২ সালে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলের বন্দুক হামলার ঘটনাটিকে তিনি একটি সাজানো নাটক বলে দাবি করেছিলেন। পরে আদালতের রায়ে তাকে ওই হামলার শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ‘নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে’ ভেঙে ফেলা হয়েছিল–এমন দাবিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছেন।
মার্কিন রাজনীতিতে ডানপন্থী শিবিরের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসনও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টাওয়ারগুলোর ধসে পড়ার সরকারি ব্যাখ্যা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন।
অতি সম্প্রতি কার্লসনের মনোযোগ নাইন-ইলাভেনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আরেকটি ধারার দিকে মোড় নিয়েছে–যেখানে ইসরায়েলকে জড়িত বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত মার্চ মাসে কার্লসন বলেন, “আমরা নাইন-ইলাভেনের ফাইলগুলো ডিক্লাসিফাই করব। আর তখন ইন্টারনেটের সবাই বলাবলি করছিল, ইসরায়েলিরা এটা করেছে। ইসরায়েল আগে থেকেই জানত সব। সেখানে এমন কিছু টেক্সট মেসেজ পাঠানো হয়েছিল, যেখানে নাইন-ইলাভেনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল। আর এগুলো সবই সত্যি, বাই দ্য ওয়ে।”
তার যুক্তি হলো–মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ইসরায়েল হয়তো হামলার তথ্য লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। এই দাবিগুলোর পেছনে কোনো ভিত্তি নেই। তা সত্ত্বেও মার্কিন ডান শিবিরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এই দাবিগুলো ফলাও করে প্রচার করা থেকে কেউ আটকাতে পারেনি। আর এটিই ফুটিয়ে তোলে যে, কীভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে নতুন রূপ ধারণ করতে পারে।
গাজায় সংঘটিত গণহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পর কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডানপন্থী ব্যক্তিত্বদের এই সুর বদলের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে কার্লসনের নাম উল্লেখ করেছেন। ফক্স নিউজে কর্মজীবনের বড় অংশজুড়ে ইসরায়েলের পক্ষে সাফাই গেয়ে আসা কার্লসন, ইসরায়েলকে মার্কিন সমর্থনের বিরুদ্ধে জনরোষ বৃদ্ধির সাথে সাথে নাটকীয়ভাবে নিজের অবস্থান বদলে ফেলেছেন।
তাছাড়া মাগা আন্দোলনের বড় একটা অংশের মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো যেহেতু আগে থেকেই গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসে আছে, তাই কার্লসন গাজা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরের প্রকৃত ক্ষোভ ও অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নাইন-ইলাভেনে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততার ভিত্তিহীন দাবিগুলো জোরালোভাবে প্রচার করে চলেছেন–যে দাবিগুলো ট্রাম্পের অনুসারী ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের মনে সহজেই জায়গা করে নেবে।
দ্রোশোঁ বলেন, “ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সবসময়ই এক ধরনের সম্ভাব্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে সেই হুমকি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ যারা এগুলো প্রচার করছেন, তারা আর কেবল রাজনৈতিক প্রান্তিক কোনো ব্যক্তি নন। কিছু ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের কাতারে শামিল।”