থাইল্যান্ডের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম থাকসিন সিনাওয়াত্রা অবশেষে কারামুক্ত হলেন। গত সোমবার ব্যাংককের ক্লং প্রেম সেন্ট্রাল প্রিজন থেকে প্যারোলে মুক্তি পান ৭৬ বছর বয়সী এই নেতা।
দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর প্রায় আট মাস কারাভোগ শেষে তার এই মুক্তি থাই রাজনীতিতে এক নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তির পর তাকে স্বাগত জানান তার মেয়ে ও সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা এবং ফিউ থাই পার্টির শীর্ষ নেতারা। তবে মুক্ত হয়েও থাকসিন থাকছেন কড়া নজরদারিতে, আগামী চার মাস তাকে থাকতে হবে প্রবেশন পিরিয়ডে।
২০০১ সালে এবং পরে আবার ২০০৫ সালে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন থাকসিন। ২০০৬ সালে সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর দুই বছর পর তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। তবে নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেও দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করা কখনো বন্ধ করেননি। থাকসিন সিনাওয়াত্রার জন্ম ১৯৪৯ সালে উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই প্রদেশের প্রভাবশালী একটি চীনা অভিবাসী পরিবারে। তিনি প্রথমে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। পরে একের পর এক ডেটা নেটওয়ার্কিং ও মোবাইল ফোন কোম্পানি গড়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন। এসব প্রতিষ্ঠানকে পরে টেলিকম প্রতিষ্ঠান শিন করপোরেশনে রূপান্তর করা হয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ২০০১ সালে থাকসিন যখন ক্ষমতায় আসেন, তিনি বদলে দিয়েছিলেন থাইল্যান্ডের রাজনীতির চিরাচরিত ভাষা। তার পপুলিস্ট বা জনকল্যাণমুখী নীতি যেমন নামমাত্র মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি ঋণ তাকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ত্রাতায় পরিণত করে।
কিন্তু এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দেশটির শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক ও সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে তার সংঘাত শুরু হয়। ২০০৬ সালে তিনি যখন জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ছিলেন, তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, তা হলো রাজাকে অবমাননা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। বিশেষ করে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান শিন করপোরেশন বিক্রির কর ফাঁকির বিতর্ক তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সাল থেকে থাকসিন ছিলেন নির্বাসনে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অনুপস্থিত অবস্থায় দণ্ডিত হওয়ার পরও থাকসিন সিনাওয়াত্রা বারবার দেশে ফেরার কথা বলছিলেন। অবশেষে ২০২৩ সালের আগস্টে নিজ দল ফিউ থাই পার্টির ক্ষমতায় ফেরার দিনে তিনি দেশে ফেরেন। ব্যাংককে পৌঁছানোর পর তার সমর্থকেরা তাকে বীরের মতো স্বাগতও জানান।
দেশে ফেরার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই থাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন তার সাজা এক বছরে নামিয়ে আনেন। পরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে থাকসিন ব্যাংককে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। এতে ধারণা করা হয় যে তিনি আসলে কারাপ্রকোষ্ঠের ভেতরে থাকেননি।
গত সেপ্টেম্বর মাসে থাইল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, থাকসিন যথাযথভাবে সাজা ভোগ করেননি। এরপর আদালত তাকে আবার এক বছরের জন্য কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তি পেলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকসিনকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত মেনে চলতে হবে। তাকে সার্বক্ষণিক ইলেকট্রনিক অ্যাঙ্কেল ট্র্যাকার পরে থাকতে হবে। নিজ বাসভবন বা নির্দিষ্ট ভিলার বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে প্রবেশন অফিসারের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।
থাকসিনের মুক্তি থাইল্যান্ডের রাজনীতির জন্য একটি দুধারী তলোয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, তার মুক্তি ফিউ থাই পার্টিকে চাঙ্গা করতে পারে, কিন্তু আগের সেই একক আধিপত্য ফিরে পাওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, থাকসিন বরাবরই পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়তে পছন্দ করেন। তার পরামর্শ বর্তমান সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে , তবে সামরিক বাহিনী তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
থাকসিনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তার বিরুদ্ধে থাকা রাজকীয় অবমাননা সংক্রান্ত মামলাগুলো। তাই নিজেকে খুব বেশি সক্রিয় প্রমান করতে চাইলে তিনি আবারও আইনি বিপাকে পড়তে পারেন।
থাকসিন সিনাওয়াত্রার মুক্তি থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একটি জটিল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও, নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কি এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে একটি কৌশলগত আপস, নাকি এটি থাকসিনের নেপথ্য থেকে আবারও কলকাঠি নাড়ার নতুন রাজনৈতিক খেলার শুরু?
শর্তযুক্ত প্যারোল, ইলেকট্রনিক মনিটরিং এবং কড়া নজরদারি স্পষ্ট করে দেয় যে, এস্টাবলিশমেন্ট থাকসিনকে পুরোপুরি মুক্ত হাতে ছাড়েনি। একই সঙ্গে তার মুক্তি ফিউ থাই পার্টিকে কিছুটা অক্সিজেন দিতে পারে এবং তার দীর্ঘদিনের সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। তবে বয়স, আইনি বাধা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তার আগের মতো একক আধিপত্য ফিরে পাওয়া কঠিন।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এছাড়া দীর্ঘদিনের ‘রেড শার্ট’ (থাকসিন সমর্থক) বনাম ‘ইয়েলো শার্ট’ (রাজতন্ত্রপন্থী) বিভাজন আবার চাঙ্গা হতে পারে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি প্রগতিশীল এবং তারা শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে সংস্কার চায়।