পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের বিষয় নিয়ে বারবার যে আলোচনা হয়, তা প্রায়ই জাতিগত, ভাষাগত ও রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয়ে সীমিত হয়ে পড়ে। তবে মিডিল ইস্ট মনিটরে সাইমা আফজালের লেখা এক নিবন্ধে মূল সমস্যাটি ভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আসল চ্যালেঞ্জটি কতগুলো প্রদেশ তৈরি করা উচিত তা নিয়ে নয়; বরং পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো দেশটির জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পেরেছে কি না সেটাই মূল প্রশ্ন।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির অতিরিক্ত প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের আহ্বান এই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথাগতভাবে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাংবিধানিক বাধা এবং জাতিগত বিভাজনের আশঙ্কা। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে প্রায় সাড় ৬ কোটি জনসংখ্যার জন্য তৈরি করা প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটি জনসংখ্যার দেশকে পরিচালনা করা সম্ভব কি না।
প্রশাসনিক সংস্কারকে কেবল রাজনৈতিক ছাড় কিংবা মানচিত্র নতুন করে আঁকার অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির এক ধরনের বিনিয়োগ। দেশের প্রথম সারির প্রশাসনিক কাঠামো যখন তৈরি হয়েছিল, তখন দেশটি অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে অনেক ছোট ছিল। বর্তমানে প্রাদেশিক সরকারগুলোকে অনেক সার্বভৌম রাষ্ট্রের চেয়েও বড় জনসংখ্যার শাসনভার সামলাতে হচ্ছে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত কাঠামোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। বিশালাকার প্রশাসনিক ইউনিটের কারণে নাগরিক ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো প্রাদেশিক রাজধানীগুলোর তুলনায় কম প্রশাসনিক মনোযোগ পাচ্ছে।
১৮তম সাংবিধানিক সংশোধনীর পর কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রাদেশিক সরকারগুলোতে ক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ হলেও, প্রদেশ থেকে স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তেমন ঘটেনি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখনো প্রাদশিক রাজধানীতেই পুঞ্জীভূত, যা গণতন্ত্রের নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রশাসনিক সংস্কার এক জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক সীমানা জাতিগত বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে না হয়ে বরং জনসংখ্যা, প্রশাসনিক কাজের চাপ, ভৌগোলিক যোগাযোগ, অবকাঠামোগত সহজলভ্যতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে।
প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা কাছাকাছি আনলে কৃষি, উৎপাদন, পর্যটন ও লজিস্টিকসের মতো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া যখন আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইন ও ডিজিটাল বাণিজ্যে সংযুক্ত হচ্ছে, তখন প্রশাসনিক দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। এছাড়া একটি ছোট প্রশাসনিক ইউনিট নাগরিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সুযোগ উন্মোচন করে। পাকিস্তানের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হলো, দেশটিতে ইতিমধ্যেই বিভাগ, জেলা ও প্রশাসনিক সদর দপ্তরের মতো বিদ্যমান ব্যবস্থা রয়েছে, যা নতুন কোনো আমলাতন্ত্র তৈরি না করেই ধাপে ধাপে প্রশাসনিক পুনর্গঠন সহজতর করতে পারে। কেবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়ে দুর্বল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা যায় না; কর আদায়, অবকাঠামো নির্মাণ ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রয়োজন। বর্তমানের ডিজিটালাইজেশন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও প্রশাসনকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে আসার বিষয়টিকে সহজ করেছে। রাজনীতি ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতেই এই সংস্কার প্রয়োজন। পাকিস্তানের আসল সংকট জনসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং শাসন কাঠামোর স্থবিরতা। একটি শক্তিশালী ফেডারেশন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে নয়, বরং শাসনব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।