বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রিকেট লিগ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। গত মাসে কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশি তারকা মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, তবে জানা গেছে যে ভারতের মূল ক্রিকেট সংস্থা বিসিসিআই এটি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল ঘোষণা করেছে যে তারা আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে কোনো ম্যাচ খেলবে না।
ক্রিকেটপাগল এই অঞ্চলে, যেখানে খেলাধুলা দীর্ঘকাল ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। এই ঘটনাগুলো ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনার গভীরতাকেই প্রকাশ করে। ২০২৪ সালে গণবিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করে। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই সম্পর্ক এখন এক বিশেষ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের লেখা ফরেন পলিসির একটি নিবন্ধে বলা হয়, এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে একে অপরের প্রতি উভয় দেশের কিছু মৌলিক ধারণা। বাংলাদেশিদের বিশ্বাস যে, ভারত দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। অন্যদিকে, ভারতীয়রা মনে করে যে, হাসিনার পতন বাংলাদেশে উগ্রপন্থী এবং ভারতের স্বার্থবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য জায়গা তৈরি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল ঘোষণা করেছে যে তারা আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে কোনো ম্যাচ খেলবে না। ছবি: রয়টার্সফরেন পলিসির নিবন্ধে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই ধারণাগুলোকে আরও জোরালো করেছে। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাকে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি দিয়েছে এবং তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছে। এসব ঘটনা ঢাকার ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি আদালত ২০২৪ সালের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। গত মাসে বাংলাদেশে এক হিন্দু পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতি হুমকির বিষয়টি ভারতে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশিষ্ট অ্যাক্টিভিস্টরাও সম্প্রতি দিল্লির সমালোচনা তীব্র করেছেন। তাদেরই একজন ওসমান হাদি গত মাসে গুলিবিদ্ধ হয়ে কয়েক দিন পর মারা যান; বাংলাদেশ পুলিশ অভিযোগ করেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের দুই সন্দেহভাজন ভারতে পালিয়ে গেছে, যদিও তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি পথ হতে পারে। ভারত যেকোনো নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের সম্ভাব্য বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট ত্যাগ করার পর, বিএনপি এখন দিল্লির কাছে আগের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
গত মাসে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ছেলে তারেক রহমানকে একটি শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। এমনকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন। মনে হচ্ছে, ভারত একটি সম্ভাব্য বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: বাসসতারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তিনি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। এটি হয়তো পরোক্ষভাবে ভারতকে আশ্বস্ত করার একটি উপায় যে, তার সরকার বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
তবে প্রশ্ন হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণগুলো একে অপরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না। বাংলাদেশের শক্তিশালী ইসলামপন্থী দলগুলো ভারতের সাথে সখ্যতা প্রত্যাখ্যান করে। এটি ঢাকার যেকোনো নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক পথ সংকুচিত করে দেয়। মোদির জন্য ঝুঁকি অবশ্য কম, কারণ তিনি নিজের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতারা সাম্প্রতিক মন্তব্যে বেশ কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। দলের মহাসচিব জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভারতের সাথে সুসম্পর্ক কেবল সমমর্যাদার ভিত্তিতেই হতে পারে। গত অক্টোবরে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে (ভারতের সাথে) সম্পর্ক শীতল থাকবে। তাই আমাকে আমার দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’’
কুগেলম্যানের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন শুরুর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যদি উভয় সরকার রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে।