মানতেই হবে সুবিধাভোগী শ্রেণি ব্যতীত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু উৎসবে শামিল হতে পারে না অর্থনৈতিক কারণেই। যে উৎসব সবাইকে স্পর্শ করতে পারে না, তাকে জাতীয় উৎসব হিসেবে কি গণ্য করা যায়?
মযহারুল ইসলাম বাবলা

বঙ্গাব্দের নববর্ষ উদ্যাপনে ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে ধর্মযোগ কাঙ্ক্ষিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব এই পার্বণটিকে ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরিয়ে আনা অতি আবশ্যক। তাহলেই বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব রূপে বাংলা নববর্ষ তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটিকে অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হবে। আমরা অতি আবেগে আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দিনটিকে প্রচার করি, বিবেচনাও করি।
আমাদের প্রান্তিকের সমষ্টিগত মানুষ সকালে পান্তাভাত, লবণ ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে আহার করে। ঐতিহ্যের অজুহাতে নববর্ষে পান্তা-ইলিশ ভোজের আধিক্যে মেতে ওঠে উৎসবে অংশ নেওয়া সমাজের সুবিধাভোগীরা। অথচ প্রান্তিকের মানুষেরা তাদের অর্থনৈতিক কারণে নুন-পান্তা খেতে বাধ্য হয়, বাঙালি সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে নয়, নিরুপায়ে। ইলিশ বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল বটে। তবে এখন মধ্যবিত্তদেরও ইলিশ কিনতে ভাবতে হয়, উচ্চমূল্যের কারণে। ঐতিহ্যের নামে কি পান্থা-ইলিশ ভক্ষণ উপহাস বা তামাশা নয়?
বাস্তবতা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ প্রকৃতই ভূমি রাজস্ব-বিভাগের নববর্ষ। বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর, খাজনা আদায়ের অনুকূল সময় বিবেচনায়। মোগল আমলে ভূমির পূর্ণ অধিকার ছিল কৃষক-প্রজার, জমিদারদের নয়। জমিদার ছিল কেবলই খাজনা সংগ্রাহক। ভূমির মালিকানা জমিদারদের ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনে কৃষক-প্রজা ভূমির অধিকার হারায়। ভূমির অধিকার পায় ইংরেজ কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-প্রাপ্ত জমিদার শ্রেণি, যারা ভূমির মালিকানার সত্বও পেয়ে যায়। সামন্তবাদী নিপীড়নমূলক শোষণ ব্যবস্থার বাড়তি মাত্রা পায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে।
পলাশীর যুদ্ধ জয়ে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সর্বময় ক্ষমতা কোম্পানির করতলগত হয়। অনুগত নবাবদের সামনে রেখে কোম্পানি মোগলদের আনুগত্য স্বীকার করেই এগোচ্ছিল। লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে ১২ আগস্ট বার্ষিক ২৬ লাখ টাকা রাজকর পরিশোধের চুক্তিতে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি পান। তিনিই ১৭৬৬ সালে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে পয়লা বৈশাখে সূচনা করেন ‘শুভ পুণ্যাহ’। পাশাপাশি চৈত্র সংক্রান্তির মধ্যে কৃষক-প্রজাদের খাজনা পরিশোধে বাধ্যবাধকতা আরোপ হয়। খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ কৃষক-প্রজাদের হালের গরু, লাঙল, তৈজসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। আর যারা খাজনা পরিশোধে নিরুপায়, তাদের ভাগ্যে জুটত নির্মম শোষণ-নির্যাতন। কৃষক-প্রজা নিগ্রহে আদায়কৃত খাজনার বদৌলতে জমিদারেরা পয়লা বৈশাখে পালন করত লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত পুণ্যাহ উৎসব।

এই পুণ্যাহ উৎসবই আজকের ঐতিহ্যের স্মারক বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন, যা ছিল জমিদারদেরই উৎসব। সমষ্টিগত কৃষক-প্রজার জন্য দিনটি ছিল খাজনা পরিশোধে নিঃস্ব হওয়ার দুর্দিন। আমরা যে বর্ণিল উৎসবে মেতে উঠি, সেটা অতীতের পুণ্যাহ এবং জমিদার শ্রেণির উৎসবেরই অনিবার্য ধারাবাহিকতা। সমষ্টিগত মানুষের উৎসব অতীতেও ছিল না, আজও নয়। সমাজের অধিপতি শ্রেণি আরোপিত উৎসব অনুসরণ সাধারণ মানুষের পক্ষে অতীতেও সম্ভব ছিল না, আজও নয়। কবি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের জমিদার রূপে জমিদারের কাছারি ঘরে পুণ্যাহ উৎসব করেছিলেন। কিন্তু আমন্ত্রিতদের শ্রেণি, বর্ণ ও সম্প্রদায়গত আসন বৈষম্যে হতবাক কবি আসন সমতার নির্দেশ দিয়েছিলেন নায়েবকে, কঠোর কণ্ঠে। শ্রেণি এবং হিন্দু-মুসলমানদের আসন বৈষম্যের অবসানের পরই রবীন্দ্রনাথ পুণ্যাহ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে তিনি বাংলা নববর্ষ কখনো পালন করেননি। আজও শান্তিনিকেতনে পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালিত হয় না। বরং প্রবর্তন করেছিলেন পৌষমেলার। এখনো শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা উদ্যাপিত হয়।
পাকিস্তানি আমলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দিবসটি পালিত হলেও স্বাধীনতার পর ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে এখন মহা-উৎসবে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো ‘বৈশাখী ধামাকা’, ‘বর্ণিল বৈশাখ’–বিভিন্ন চটকদার শব্দের সম্ভারে পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে। বিজ্ঞাপনের হিড়িকে গণমাধ্যমে যেন জোয়ার বয়ে যায়। ক্রেতা আকর্ষণে উৎপাদকেরা ঢালাও বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে। ক্রেতারাও নিরাশ করে না। শহরের বিপণী বিতানে প্রচণ্ড ভিড় ও বেচা-বিক্রি সেটাই প্রমাণ করে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী তৎপরতা দৃশ্যমান। মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধদের বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টানদের বড়দিন–সম্প্রদায়গত প্রধান ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু বাংলা নববর্ষ সকল ধর্মমতের বাঙালির একমাত্র উৎসব বলেই পণ্য, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদি ভোগ-বিলাস সমাগ্রীর ব্যাপক বেচা-বিক্রির অপূর্ব সুযোগ নিয়ে আসে। মুনাফার লিপ্সায় নববর্ষ উদ্যাপনকে পুঁজিবাদ বেছে নিতে বিলম্ব করেনি–উসকে দিয়েছে সকল শ্রেণির মানুষকে ভোগবাদে।
মানতেই হবে সুবিধাভোগী শ্রেণি ব্যতীত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু উৎসবে শামিল হতে পারে না অর্থনৈতিক কারণেই। যে উৎসব সবাইকে স্পর্শ করতে পারে না, তাকে জাতীয় উৎসব হিসেবে কি গণ্য করা যায়? যে উৎসব ধর্মমুক্ত নয়, সে উৎসবকে কি অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব বলার যৌক্তিকতা থাকে? জাতিগত উৎসবের আড়ালে জাতির মধ্যকার শ্রেণি-বৈষম্যকে উপেক্ষা করা যায় কী!

জাতির মধ্যকার ঐক্য-সংহতি ক্রমাগত বৈষম্য ও বিভাজনের চূড়ান্ত সীমায়। জাতির মধ্যকার সম্প্রীতি যদি না-ই থাকে, তাহলে জাতির উৎসব পালন সর্বজনীন হবে কোন উপায়ে! জাতির মধ্যকার বৈষম্য-বিভাজন এবং ধর্মীয় আচার নির্মূল সম্ভব হলেই বাংলা নববর্ষ যেমন সর্বজনীন হবে, তেমনি হবে বাঙালি জাতির একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।
পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে আমাদের নগরকেন্দ্রিক জীবনে উপচানো আবেগ উচ্ছ্বাসের মাত্রাটা ভয়াবহ পর্যায়ে এখন। এই আবেগ উচ্ছ্বাস জাতিগত পারস্পরিক সৌহার্দ্যের নয়, সমষ্টিগতও নয়, একান্তই আত্মকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। স্বীকার করতেই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ বাঙালির জীবনে এই দিনটির প্রভাব মোটেও নেই। কারণটিও অস্পষ্ট নয়। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাই প্রধান কারণ। সংস্কৃতির বিকাশে অর্থনৈতির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। নববর্ষ পালনে মতাদর্শিক লক্ষ্য-অভিপ্রায় বলে বাস্তবে কিছু নেই। জাতিগত চেতনার বিপরীতে শ্রেণি ও আত্মকেন্দ্রিকতার বলয় গড়ে উঠেছে। বলয়টি অনিবার্যভাবে বৈষম্যকেই স্পষ্ট করেছে। বাঙালি জাতিসত্তার আবেগ-উচ্ছ্বাসে নববর্ষের ভোগ-উপভোগে উৎসবে আপ্লুল সুবিধাভোগীরা গা-ভাসিয়ে দেয়। অথচ দিনটি গত হওয়ার পর আর কেউ সেই চেতনাটিকে ধারণ করে না। কার্যত উপেক্ষাই করে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

বঙ্গাব্দের নববর্ষ উদ্যাপনে ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে ধর্মযোগ কাঙ্ক্ষিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব এই পার্বণটিকে ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরিয়ে আনা অতি আবশ্যক। তাহলেই বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব রূপে বাংলা নববর্ষ তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটিকে অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হবে। আমরা অতি আবেগে আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দিনটিকে প্রচার করি, বিবেচনাও করি।
আমাদের প্রান্তিকের সমষ্টিগত মানুষ সকালে পান্তাভাত, লবণ ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে আহার করে। ঐতিহ্যের অজুহাতে নববর্ষে পান্তা-ইলিশ ভোজের আধিক্যে মেতে ওঠে উৎসবে অংশ নেওয়া সমাজের সুবিধাভোগীরা। অথচ প্রান্তিকের মানুষেরা তাদের অর্থনৈতিক কারণে নুন-পান্তা খেতে বাধ্য হয়, বাঙালি সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে নয়, নিরুপায়ে। ইলিশ বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল বটে। তবে এখন মধ্যবিত্তদেরও ইলিশ কিনতে ভাবতে হয়, উচ্চমূল্যের কারণে। ঐতিহ্যের নামে কি পান্থা-ইলিশ ভক্ষণ উপহাস বা তামাশা নয়?
বাস্তবতা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ প্রকৃতই ভূমি রাজস্ব-বিভাগের নববর্ষ। বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর, খাজনা আদায়ের অনুকূল সময় বিবেচনায়। মোগল আমলে ভূমির পূর্ণ অধিকার ছিল কৃষক-প্রজার, জমিদারদের নয়। জমিদার ছিল কেবলই খাজনা সংগ্রাহক। ভূমির মালিকানা জমিদারদের ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনে কৃষক-প্রজা ভূমির অধিকার হারায়। ভূমির অধিকার পায় ইংরেজ কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-প্রাপ্ত জমিদার শ্রেণি, যারা ভূমির মালিকানার সত্বও পেয়ে যায়। সামন্তবাদী নিপীড়নমূলক শোষণ ব্যবস্থার বাড়তি মাত্রা পায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে।
পলাশীর যুদ্ধ জয়ে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সর্বময় ক্ষমতা কোম্পানির করতলগত হয়। অনুগত নবাবদের সামনে রেখে কোম্পানি মোগলদের আনুগত্য স্বীকার করেই এগোচ্ছিল। লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে ১২ আগস্ট বার্ষিক ২৬ লাখ টাকা রাজকর পরিশোধের চুক্তিতে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি পান। তিনিই ১৭৬৬ সালে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে পয়লা বৈশাখে সূচনা করেন ‘শুভ পুণ্যাহ’। পাশাপাশি চৈত্র সংক্রান্তির মধ্যে কৃষক-প্রজাদের খাজনা পরিশোধে বাধ্যবাধকতা আরোপ হয়। খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ কৃষক-প্রজাদের হালের গরু, লাঙল, তৈজসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। আর যারা খাজনা পরিশোধে নিরুপায়, তাদের ভাগ্যে জুটত নির্মম শোষণ-নির্যাতন। কৃষক-প্রজা নিগ্রহে আদায়কৃত খাজনার বদৌলতে জমিদারেরা পয়লা বৈশাখে পালন করত লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত পুণ্যাহ উৎসব।

এই পুণ্যাহ উৎসবই আজকের ঐতিহ্যের স্মারক বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন, যা ছিল জমিদারদেরই উৎসব। সমষ্টিগত কৃষক-প্রজার জন্য দিনটি ছিল খাজনা পরিশোধে নিঃস্ব হওয়ার দুর্দিন। আমরা যে বর্ণিল উৎসবে মেতে উঠি, সেটা অতীতের পুণ্যাহ এবং জমিদার শ্রেণির উৎসবেরই অনিবার্য ধারাবাহিকতা। সমষ্টিগত মানুষের উৎসব অতীতেও ছিল না, আজও নয়। সমাজের অধিপতি শ্রেণি আরোপিত উৎসব অনুসরণ সাধারণ মানুষের পক্ষে অতীতেও সম্ভব ছিল না, আজও নয়। কবি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের জমিদার রূপে জমিদারের কাছারি ঘরে পুণ্যাহ উৎসব করেছিলেন। কিন্তু আমন্ত্রিতদের শ্রেণি, বর্ণ ও সম্প্রদায়গত আসন বৈষম্যে হতবাক কবি আসন সমতার নির্দেশ দিয়েছিলেন নায়েবকে, কঠোর কণ্ঠে। শ্রেণি এবং হিন্দু-মুসলমানদের আসন বৈষম্যের অবসানের পরই রবীন্দ্রনাথ পুণ্যাহ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে তিনি বাংলা নববর্ষ কখনো পালন করেননি। আজও শান্তিনিকেতনে পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালিত হয় না। বরং প্রবর্তন করেছিলেন পৌষমেলার। এখনো শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা উদ্যাপিত হয়।
পাকিস্তানি আমলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দিবসটি পালিত হলেও স্বাধীনতার পর ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে এখন মহা-উৎসবে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো ‘বৈশাখী ধামাকা’, ‘বর্ণিল বৈশাখ’–বিভিন্ন চটকদার শব্দের সম্ভারে পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে। বিজ্ঞাপনের হিড়িকে গণমাধ্যমে যেন জোয়ার বয়ে যায়। ক্রেতা আকর্ষণে উৎপাদকেরা ঢালাও বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে। ক্রেতারাও নিরাশ করে না। শহরের বিপণী বিতানে প্রচণ্ড ভিড় ও বেচা-বিক্রি সেটাই প্রমাণ করে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী তৎপরতা দৃশ্যমান। মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধদের বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টানদের বড়দিন–সম্প্রদায়গত প্রধান ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু বাংলা নববর্ষ সকল ধর্মমতের বাঙালির একমাত্র উৎসব বলেই পণ্য, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদি ভোগ-বিলাস সমাগ্রীর ব্যাপক বেচা-বিক্রির অপূর্ব সুযোগ নিয়ে আসে। মুনাফার লিপ্সায় নববর্ষ উদ্যাপনকে পুঁজিবাদ বেছে নিতে বিলম্ব করেনি–উসকে দিয়েছে সকল শ্রেণির মানুষকে ভোগবাদে।
মানতেই হবে সুবিধাভোগী শ্রেণি ব্যতীত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু উৎসবে শামিল হতে পারে না অর্থনৈতিক কারণেই। যে উৎসব সবাইকে স্পর্শ করতে পারে না, তাকে জাতীয় উৎসব হিসেবে কি গণ্য করা যায়? যে উৎসব ধর্মমুক্ত নয়, সে উৎসবকে কি অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব বলার যৌক্তিকতা থাকে? জাতিগত উৎসবের আড়ালে জাতির মধ্যকার শ্রেণি-বৈষম্যকে উপেক্ষা করা যায় কী!

জাতির মধ্যকার ঐক্য-সংহতি ক্রমাগত বৈষম্য ও বিভাজনের চূড়ান্ত সীমায়। জাতির মধ্যকার সম্প্রীতি যদি না-ই থাকে, তাহলে জাতির উৎসব পালন সর্বজনীন হবে কোন উপায়ে! জাতির মধ্যকার বৈষম্য-বিভাজন এবং ধর্মীয় আচার নির্মূল সম্ভব হলেই বাংলা নববর্ষ যেমন সর্বজনীন হবে, তেমনি হবে বাঙালি জাতির একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।
পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে আমাদের নগরকেন্দ্রিক জীবনে উপচানো আবেগ উচ্ছ্বাসের মাত্রাটা ভয়াবহ পর্যায়ে এখন। এই আবেগ উচ্ছ্বাস জাতিগত পারস্পরিক সৌহার্দ্যের নয়, সমষ্টিগতও নয়, একান্তই আত্মকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। স্বীকার করতেই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ বাঙালির জীবনে এই দিনটির প্রভাব মোটেও নেই। কারণটিও অস্পষ্ট নয়। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাই প্রধান কারণ। সংস্কৃতির বিকাশে অর্থনৈতির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। নববর্ষ পালনে মতাদর্শিক লক্ষ্য-অভিপ্রায় বলে বাস্তবে কিছু নেই। জাতিগত চেতনার বিপরীতে শ্রেণি ও আত্মকেন্দ্রিকতার বলয় গড়ে উঠেছে। বলয়টি অনিবার্যভাবে বৈষম্যকেই স্পষ্ট করেছে। বাঙালি জাতিসত্তার আবেগ-উচ্ছ্বাসে নববর্ষের ভোগ-উপভোগে উৎসবে আপ্লুল সুবিধাভোগীরা গা-ভাসিয়ে দেয়। অথচ দিনটি গত হওয়ার পর আর কেউ সেই চেতনাটিকে ধারণ করে না। কার্যত উপেক্ষাই করে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত