তরুণ চক্রবর্তী

বিলেত ফেরত তারেক রহমানের ওপর আস্থা বাড়ছে ভারতীয়দের। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির ওপর আস্থা রাখতে চাইছে দিল্লিও। তারা বুঝে গিয়েছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে অদূর-ভবিষ্যতে ঢাকার মসনদে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ঘোষিত অবস্থান থেকেই ভারত বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতেই বেশি উৎসাহী। সেই উৎসাহ থেকেই নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দিল্লির অবস্থান খোলসা করতে কার্পণ্য করেননি। শুধু মোদি নন, দলমত নির্বিশেষে ভারতের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই জামায়াতের পরাজয় এবং বিএনপির ক্ষমতায় ফিরে আসাটাকে খুবই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশের বিশ্লেষণ, বাংলাদেশে ইসলামি শাসন চালুর কথা বলে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি জামায়াত। তাদের মৌলবাদী প্রচারে কান দেয়নি সাধারণ মানুষ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষেই রায় গিয়েছে ব্যালটে। দিল্লির আশঙ্কা ছিল, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ফের সন্ত্রাসীদের দাপট বাড়বে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই নিয়েও দিল্লির শঙ্কা নতুন কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার দহরম মোটেই ভালো চোখে দেখেনি দিল্লি। সেইসঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে এনসিপি নেতাদের হুমকি-ধমকিতে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও ভূরাজনীতির কারণেই জামায়াতকে পরাস্ত করাটা ছিল দিল্লির কৌশলগত অবস্থান। বিএনপির সাফল্যে তাই স্বস্তি পেয়েছে দিল্লি।
ভারতীয় সাংবাদিকেরা অনেকেই মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কর্মজীবী নারীদের সঙ্গে পতিতাদের তুলনা টানাটা ব্যুমেরাং হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে জামায়াত নেতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সঙ্গে বেশ্যাদের তুলনা। এতে নারীরা জামায়াতকে ভোট দেননি। অতীতেও তাদের নারী স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থানের মূল্য দিতে হয়েছে নির্বাচনে।
এসবের পরও জামায়াতের অভূতপূর্ব উত্থান বেশ চিন্তায় রেখেছে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের। তাদের আশঙ্কা, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও নারী স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হতে পারে। দুজন নারী ৩৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করলেও সেই দেশেই নারীদের প্রতি নতুন করে অশ্রদ্ধার পরিবেশ মেনে নিতে পারেননি সাধারণ ভোটাররা– এমনটাই ভাবছেন ভারতের অনেকে।
ছাত্রদের ব্যর্থতা নিয়েও আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যে পরও নির্বাচনে শোচনীয় ফলাফলে বিস্মিত অনেকে। অনেকেই মনে করেন, তথাকথিত অরাজনৈতিক ছাত্রনেতারাও রাজনৈতিক দলের নেতাদের চেনা পথেই হাঁটতে শুরু করেছিলেন। সেইসঙ্গে তাদের নেতিবাচক রাজনীতির প্রতি মানুষ ভরসা রাখতে পারেননি। খুব কম সময়ের মধ্যেই ছাত্রনেতাদের জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে আসে। সামাজিক মাধ্যমের বিপ্লব আর নির্বাচনী যুদ্ধের মধ্যে যে ফারাক আছে, সেটাও তাদের বোধগম্য হয়নি। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্যেও সংগঠন বছর দুয়েক ধরে রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা।
জামায়াত সম্পর্কে চিরকালই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটা ভয়-ভীতি বিরাজ করে। তাদের নিয়ে উদ্বেগ ছিলই। অতীতের বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা সেই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। জামায়াত নেতারা চেষ্টা করেও ভোটের আগে সংখ্যালঘুদের নিয়ে তাদের ঘোষিত অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেননি। তাই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতের ক্ষমতালাভের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় খুশি ভারতের সাধারণ মানুষ। জামায়াতকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে মুহাম্মদ ইউনূসও ভারতে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত খুইয়েছেন।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা নিয়ে দিল্লির ক্ষোভ ছিলই। ২০০১ সালে বিএনপি ও জামায়াত একজোট হয়ে নির্বাচনে জয়লাভের পর বাড়তে থাকে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা। আবার জামায়াতকে ঐতিহাসিক কারণেই সহ্য করতে পারেন না ভারতীয়রা। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগ। পাকিস্তানকে একাত্তরে মদদ দিয়েছিলেন জামায়াতের নেতারা। এখন মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নিয়ে ঢোক গিলতে বাধ্য হলেও তাদের অবস্থান সকলেরই জানা আছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলায় খুশি ভারত। বিএনপি মহাসচিব এবারের নির্বাচনে কড়া ভাষায় জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলতেও কার্পণ্য করেননি। জামায়াত সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান বদল ভারতকে বড় স্বস্তি দিয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই বন্ধুত্বের বার্তা দিচ্ছিল ভারত। তার কারণ ভারতের ঘোষিত নীতিই ছিল–গণতান্ত্রিক উপায়ে যারাই বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে কাজ করবে দিল্লি। আর বিএনপি ক্ষমতায় আসছে বুঝতে পেরেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। শোক জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের জাতীয় সংসদেও গৃহীত হয় শোক প্রস্তাব। আর ভোটের ফল প্রকাশ হতেই অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদের টেক্কা দিয়ে খোদ মোদি সবার আগে ফোন করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। গুজরাটি মোদি সামাজিক মাধ্যমে বাংলায় লেখেন, “আমি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নির্ণায়ক বিজয়ের অভিমুখে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জনাব তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই ফলাফল আপনার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন।” আগামী দিনে তারেকের সঙ্গে কাজ করতে চেয়ে তিনি আরও লেখেন, “ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং আমাদের অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে আপনার সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা রাখছি।”
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক আদর্শের ওপর নির্ভরশীল নয়। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, মোটামুটি একই থাকে পররাষ্ট্রনীতি। তাই বিজেপি নেতা মোদির মতোই ভারতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এখন আস্থাশীল তারেকের ওপর। মোদির কট্টর অবস্থানবিরোধী হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “বাংলাদেশের সকল ভাইবোনকে, জনগণকে, জানাই আমার অভিনন্দন, আমার আগাম রমজান মোবারক। বাংলাদেশের এই বিপুল জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই আমার তারেক ভাইকে, তাঁর দলকে ও অন্যান্য দলকে। সবাই ভালো থাকুন, সুখী থাকুন। আমাদের সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, এটাই আমরা কামনা করি।”
ভারতের অনেকেই মনে করেন, ১৭ বছর বিলেতে থেকে অনেকটাই বদলে গিয়েছেন তারেক রহমান। ‘হাওয়া ভবন’ এখন অতীত। তেমনই অতীত শেখ হাসিনাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। কিছুই চিরস্থায়ী নয়। প্রেমের মতোই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও কেউ চিরশত্রু বা চিরমিত্র হয় না। তাই জামায়াত-মুক্ত বিএনপির ওপরই এখন বাজি ধরতে চায় ভারত। ভারতীয়রা অনেকেই বিশ্বাস করতেও শুরু করেছে, ষাট বছরের তারেকের কাঁধে চেপেই ফের দুই বাংলার যোগাযোগ ও মেলামেশা আত্মীয়তার ছন্দে ফিরবে। বাড়বে বন্ধুত্বও।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

বিলেত ফেরত তারেক রহমানের ওপর আস্থা বাড়ছে ভারতীয়দের। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির ওপর আস্থা রাখতে চাইছে দিল্লিও। তারা বুঝে গিয়েছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে অদূর-ভবিষ্যতে ঢাকার মসনদে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ঘোষিত অবস্থান থেকেই ভারত বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতেই বেশি উৎসাহী। সেই উৎসাহ থেকেই নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দিল্লির অবস্থান খোলসা করতে কার্পণ্য করেননি। শুধু মোদি নন, দলমত নির্বিশেষে ভারতের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই জামায়াতের পরাজয় এবং বিএনপির ক্ষমতায় ফিরে আসাটাকে খুবই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশের বিশ্লেষণ, বাংলাদেশে ইসলামি শাসন চালুর কথা বলে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি জামায়াত। তাদের মৌলবাদী প্রচারে কান দেয়নি সাধারণ মানুষ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষেই রায় গিয়েছে ব্যালটে। দিল্লির আশঙ্কা ছিল, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ফের সন্ত্রাসীদের দাপট বাড়বে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই নিয়েও দিল্লির শঙ্কা নতুন কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার দহরম মোটেই ভালো চোখে দেখেনি দিল্লি। সেইসঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে এনসিপি নেতাদের হুমকি-ধমকিতে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও ভূরাজনীতির কারণেই জামায়াতকে পরাস্ত করাটা ছিল দিল্লির কৌশলগত অবস্থান। বিএনপির সাফল্যে তাই স্বস্তি পেয়েছে দিল্লি।
ভারতীয় সাংবাদিকেরা অনেকেই মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কর্মজীবী নারীদের সঙ্গে পতিতাদের তুলনা টানাটা ব্যুমেরাং হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে জামায়াত নেতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সঙ্গে বেশ্যাদের তুলনা। এতে নারীরা জামায়াতকে ভোট দেননি। অতীতেও তাদের নারী স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থানের মূল্য দিতে হয়েছে নির্বাচনে।
এসবের পরও জামায়াতের অভূতপূর্ব উত্থান বেশ চিন্তায় রেখেছে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের। তাদের আশঙ্কা, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও নারী স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হতে পারে। দুজন নারী ৩৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করলেও সেই দেশেই নারীদের প্রতি নতুন করে অশ্রদ্ধার পরিবেশ মেনে নিতে পারেননি সাধারণ ভোটাররা– এমনটাই ভাবছেন ভারতের অনেকে।
ছাত্রদের ব্যর্থতা নিয়েও আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যে পরও নির্বাচনে শোচনীয় ফলাফলে বিস্মিত অনেকে। অনেকেই মনে করেন, তথাকথিত অরাজনৈতিক ছাত্রনেতারাও রাজনৈতিক দলের নেতাদের চেনা পথেই হাঁটতে শুরু করেছিলেন। সেইসঙ্গে তাদের নেতিবাচক রাজনীতির প্রতি মানুষ ভরসা রাখতে পারেননি। খুব কম সময়ের মধ্যেই ছাত্রনেতাদের জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে আসে। সামাজিক মাধ্যমের বিপ্লব আর নির্বাচনী যুদ্ধের মধ্যে যে ফারাক আছে, সেটাও তাদের বোধগম্য হয়নি। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্যেও সংগঠন বছর দুয়েক ধরে রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা।
জামায়াত সম্পর্কে চিরকালই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটা ভয়-ভীতি বিরাজ করে। তাদের নিয়ে উদ্বেগ ছিলই। অতীতের বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা সেই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। জামায়াত নেতারা চেষ্টা করেও ভোটের আগে সংখ্যালঘুদের নিয়ে তাদের ঘোষিত অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেননি। তাই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতের ক্ষমতালাভের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় খুশি ভারতের সাধারণ মানুষ। জামায়াতকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে মুহাম্মদ ইউনূসও ভারতে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত খুইয়েছেন।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা নিয়ে দিল্লির ক্ষোভ ছিলই। ২০০১ সালে বিএনপি ও জামায়াত একজোট হয়ে নির্বাচনে জয়লাভের পর বাড়তে থাকে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা। আবার জামায়াতকে ঐতিহাসিক কারণেই সহ্য করতে পারেন না ভারতীয়রা। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগ। পাকিস্তানকে একাত্তরে মদদ দিয়েছিলেন জামায়াতের নেতারা। এখন মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নিয়ে ঢোক গিলতে বাধ্য হলেও তাদের অবস্থান সকলেরই জানা আছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলায় খুশি ভারত। বিএনপি মহাসচিব এবারের নির্বাচনে কড়া ভাষায় জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলতেও কার্পণ্য করেননি। জামায়াত সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান বদল ভারতকে বড় স্বস্তি দিয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই বন্ধুত্বের বার্তা দিচ্ছিল ভারত। তার কারণ ভারতের ঘোষিত নীতিই ছিল–গণতান্ত্রিক উপায়ে যারাই বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে কাজ করবে দিল্লি। আর বিএনপি ক্ষমতায় আসছে বুঝতে পেরেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। শোক জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের জাতীয় সংসদেও গৃহীত হয় শোক প্রস্তাব। আর ভোটের ফল প্রকাশ হতেই অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদের টেক্কা দিয়ে খোদ মোদি সবার আগে ফোন করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। গুজরাটি মোদি সামাজিক মাধ্যমে বাংলায় লেখেন, “আমি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নির্ণায়ক বিজয়ের অভিমুখে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জনাব তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই ফলাফল আপনার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন।” আগামী দিনে তারেকের সঙ্গে কাজ করতে চেয়ে তিনি আরও লেখেন, “ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং আমাদের অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে আপনার সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা রাখছি।”
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক আদর্শের ওপর নির্ভরশীল নয়। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, মোটামুটি একই থাকে পররাষ্ট্রনীতি। তাই বিজেপি নেতা মোদির মতোই ভারতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এখন আস্থাশীল তারেকের ওপর। মোদির কট্টর অবস্থানবিরোধী হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “বাংলাদেশের সকল ভাইবোনকে, জনগণকে, জানাই আমার অভিনন্দন, আমার আগাম রমজান মোবারক। বাংলাদেশের এই বিপুল জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই আমার তারেক ভাইকে, তাঁর দলকে ও অন্যান্য দলকে। সবাই ভালো থাকুন, সুখী থাকুন। আমাদের সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, এটাই আমরা কামনা করি।”
ভারতের অনেকেই মনে করেন, ১৭ বছর বিলেতে থেকে অনেকটাই বদলে গিয়েছেন তারেক রহমান। ‘হাওয়া ভবন’ এখন অতীত। তেমনই অতীত শেখ হাসিনাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। কিছুই চিরস্থায়ী নয়। প্রেমের মতোই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও কেউ চিরশত্রু বা চিরমিত্র হয় না। তাই জামায়াত-মুক্ত বিএনপির ওপরই এখন বাজি ধরতে চায় ভারত। ভারতীয়রা অনেকেই বিশ্বাস করতেও শুরু করেছে, ষাট বছরের তারেকের কাঁধে চেপেই ফের দুই বাংলার যোগাযোগ ও মেলামেশা আত্মীয়তার ছন্দে ফিরবে। বাড়বে বন্ধুত্বও।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট