কয়েক সপ্তাহ আগে মিশরের রিসোর্ট শহর নামে খ্যাত শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার জন্য একপ্রকার কূটনৈতিক সাফল্য বলেই মনে হচ্ছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে ৩০টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওই সম্মেলনে গৃহীত যৌথ ঘোষণা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় প্রায় একই সময়ে আরব দেশগুলোকে নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরী করেছে। আর মস্কোর সম্মেলনকে শার্ম আল-শেখের তুলনায় ব্যর্থই বলা যায়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ব্যর্থতা ও ট্রাম্প প্রশাসনের সাফল্যের এই দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও জটিল বাস্তবতা। গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্য এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যা তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা ও বিভাজনের নতুন রেখা। আর এই সুযোগকেই নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে মস্কো।
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার আসাদ পরিবারের পতন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের এক যুগান্তকারী ঘটনা। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় দেশটি শাসন করা এই বংশের পতনের পর দামেস্কের নতুন সরকার এখন তুরস্কপন্থী। ফলে আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো ইরানের নাটকীয় পতন। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা, লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক শাখার পরাজয়, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে গত জুনে ইরানে ইসরায়েলের বিমান হামলা। এসব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে তেহরানের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল।
২০২৩ সালের অক্টোবের ৭ তারিখ সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে ইসরায়েল আরও আগ্রাসী পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এর প্রভাবেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকার এখন চারদিকে শত্রুদের নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর। এতে করে অঞ্চলটির বেশিরভাগ দেশেই গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় গত সেপ্টেম্বর কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের বিমান হামলার পর। এঘটনায় উপসাগরীয় দেশগুলো সর্বসম্মতভাবে ইসরায়েলের নিন্দা জানায়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তনগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় রকমের প্রভাব ফেলেছে। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার জোয়ারে একের পর এক প্রভাবশালী ইউরোপীয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এমনকি ইসরায়েলি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর ফলে ইসরায়েলি নেতৃত্ব এখন ধরে নিচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জন্য দেশটির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কে মন্দা চলবে। আবার, গাজা শান্তি চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও, লেবানন ও সিরিয়া এমনকি ইরানের সঙ্গেও ইসরায়েলের সংঘাত অব্যাহত থাকবে।
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবিএই নতুন ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশের জন্য নতুন বিভেদ আর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এখন আর নিশ্চিত নয় যে তারা আমেরিকার সুরক্ষার ওপর নির্ভর করতে পারবে। ইসরায়েলের নেতারাও পশ্চিমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আসলে কতটা দৃঢ় সেটা নিয়ে অনিশ্চিত। অন্যদিকে ইরান আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তায় হতাশ হয়ে পড়েছে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো পারমাণবিক অস্ত্র।
এই অনিশ্চয়তা থেকে দেশগুলো মনে করছে যে তাদের সাহায্য করবে কেউ নয়, তাই নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হবে। এভাবে পশ্চিমাদের থেকে বিচ্ছিন্নতার পর এখন মধ্যপ্রাচ্য মস্কোর জন্য একটি প্রধান বৈদেশিক নীতি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
প্রথমেই, এই ধরনের বাস্তববাদের মাধ্যমে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে সক্ষম হচ্ছে। যদি নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান নীতি বারবার পরিবর্তিত হয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তাগুলো নির্ভরযোগ্য না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পশ্চিমা বিধিনিষেধ মানার তেমন কারণ নেই। তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সেভাবে মানছে না। পশ্চিমাদের ওপর এই অঞ্চলের আস্থা যত কমবে তত বেশি রাশিয়ার বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নিরাপত্তার অভাবও রাশিয়ার পক্ষে কাজ করছে। সিরিয়ার নতুন সরকারের রাশিয়ার প্রতি হঠাৎ মনোভাব পরিবর্তনের মাধ্যমে এটা আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রথম ছয় মাসে সিরিয়ার ইসলামপন্থীরা যারা প্রায় দশ বছর ধরে রাশিয়ার বোমার মুখে ছিল তারা তুরস্ক, উপসাগরীয় রাজতন্ত্র এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়। এরপর পশ্চিমারা দামাস্কাসের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এতে রাশিয়া সিরিয়ার অর্থনীতিতে আর তেমন প্রভাব রাখতে পারেনি। সেইসঙ্গে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সিরিয়া বিভিন্ন সময়ে হামলাও করে।
তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক ইসরায়েলি হামলার কারণে সিরিয়ার বর্তমান সরকার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার জন্য মস্কোর প্রয়োজন অনুভব করছে। রাশিয়ার সাথে সিরিয়ার সমঝোতা হয়ত অস্থায়ী হবে। কিন্তু আপাতত সিরিয়ার ইসলামবাদীরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আবারও ঘটতে পারে যদি আমেরিকা ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড থামাতে ব্যর্থ হয়। কয়েক বছর আগে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তুরস্ক রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনে। এটা তখন একটা বড় খবর হয়ে ওঠে। এখন এমন পরিস্থিতি পুনরায় ঘটার সম্ভাবনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যদি ইউক্রেনে লড়াই থেমে যায়।
রাশিয়া যুদ্ধরত অবস্থায়ও আলজেরিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে, তুরস্কে সামরিক সেবা দিচ্ছে এবং ইরানেও বৃহৎ পরিসরের বিমান সরবরাহের পরিকল্পনা করছে। ভবিষ্যতেও রাশিয়ান সামরিক এবং অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ এবং কর্মসংস্থান বজায় রাখার উপায় খুঁজবে, এবং এই ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার তাদের জন্য খুবই উপযুক্ত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা রাশিয়ার জন্য নতুন সুযোগও সৃষ্টি করছে। এই অঞ্চলের দরিদ্র দেশগুলো থেকে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের ভাড়াটে হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে তারা। এই যোদ্ধাদেরকে মস্কো মাসে ২৫০০–৩০০০ ডলার করে দেবে যা খুবই লাভজনক প্রস্তাব।
তবে এই নতুন বাস্তবতার মধ্যেও রাশিয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করা সম্ভব নয়, কারণ তার যথেষ্ট আর্থিক, মানবিক বা সাংস্কৃতিক সম্পদ নেই। তবে মস্কো এই ঘাটতি পূরণ করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরাসরি নিজেকে পশ্চিমবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করছে যা চীনের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী পদক্ষেপ।
রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য নীতির মূল বিষয় এখন পশ্চিমাদের দ্বিমুখী স্বভাবের সমালোচনা করা। এর মাধ্যমে রাশিয়া এখন এমন একটা জায়গায় আছে যেখানে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ মুসলিম দেশগুলো এবং ইউরোপীয় সমালোচনা ও ফিলিস্তিনের স্বীকৃতিতে হতাশ ইসরায়েল উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবিমস্কোর প্রস্তাবটি সহজ এবং স্পষ্ট। তারা বলছে, ‘হ্যাঁ, আমরা বাস্তববাদী, আমাদের মূল্যবোধ নেই, কিন্তু পশ্চিমাদের সঙ্গে কারোর বিরোধ হলে আমরা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত।’ একটি বড় সুবিধা হলো, রাশিয়া তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে যারা স্বৈরশাসক সেসব নেতাদের এবং তাদের পরিবারের জন্য আশ্রয় প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়, যা আসাদের ঘটনা থেকে বোঝা যায়। আর মধ্যপ্রাচ্য এমন এক অঞ্চল যেখানে প্রায় সব দেশ বিভিন্ন মাত্রায় স্বৈরশাসিত সেখানে রাশিয়ার এই নীতি কার্যকর হবে।
অবশ্য এই সব অনিশ্চয়তা এবং বিরতিহীন যুদ্ধগুলো মস্কোর মধ্যপ্রাচ্যে প্রকল্পগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ইরানে যেখানে রাশিয়া পারস্য উপসাগরের সঙ্গে একটি নতুন লজিস্টিক ব্রিজ এবং গ্যাস হাব গড়ার পরিকল্পনা করেছিল, সেই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণেই এই প্রকল্পগুলোর ভাগ্য অনিশ্চিত। তবু এই সব বাধা সত্ত্বেও, মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে বিতর্কিত হয়ে ওঠেনি। আর সে সম্ভাবনাও নেই। তবে মস্কোর মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের মস্কোয় একত্রিত করার মস্কোর যে উদ্যোগ তা ট্রাম্পের মিসর সম্মেলনের কারণে বিফল হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলর মধ্যে আমেরিকাকে নিয়ে যেই অনাস্থার সুর উঠেছে তা খুব সহজে দূর হওয়ার আপাতত সম্ভাবনা নেই। আর এই কারণে তারা রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
**কার্নেগি পলিটিকার লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।**
নিকিতা স্মাগিন ইরানের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি, ইসলামিজম, এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার নীতির বিশেষজ্ঞ। তিনি ইরান ফর এভ্রিওয়ান: প্যরাডক্স অব লাইফ ইন অ্যান অটোক্রেসি আন্ডার স্যাংকশন বইটির রচয়িতা।