নারী নেতৃত্ব, ইসলামী আইন ও সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে আল জাজিরাকে যা বললেন জামায়াত আমির

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
নারী নেতৃত্ব, ইসলামী আইন ও সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে আল জাজিরাকে যা বললেন জামায়াত আমির
আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন জামায়াতের কোনো নারী প্রার্থী নেই, ইসলামী আইন, দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় অবস্থান নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনো নারী কোনোদিন জামায়াতে ইসলামীর প্রধান হতে পারবেন না।

আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের সঙ্গে প্রায় আধাঘণ্টার সাক্ষাৎকারটি শুরু হয় ইসলামী আইন নিয়ে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে ইসলামী আইনে দেশ চালাতে চায়। এই আইন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু আছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘আপনি একটি ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন তুলেছেন। দেশের বিদ্যমান আইনের অধীনেই আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছি। আমরা মানুষের সেন্টিমেন্ট বোঝার চেষ্টা করছি। মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কিছু করব না।’’

এসময় আল জাজিরার সাংবাদিক সম্প্রতি জামায়াত নেতা মুজিবুর রহমানের ‘মানুষের বানানো আইন চলবে না, শুধু ইসলামী আইন’ বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন। এই প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘দলের প্রধান যা বলবে, তাই অনুসরণ করবেন। আমি কোনো কিছু অস্বীকার বা গ্রহণ করছি না। একটি দলের কৌশল বুঝতে হলে দলের প্রধানের বক্তব্য অনুসরণ করতে হবে। ইসলামে যা আছে, আমরা তাই প্রমোট করছি। যেমন- দুর্নীতি দমন, সবক্ষেত্রে জবাবদিহি, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার।’’

ক্ষমতায় এলে আপনি কি ইসলামী আইন চালু করবেন— এমন প্রশ্নের উত্তরে শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘যদি দেশের জন্য এটি প্রয়োজন হয়, তাহলে পার্লামেন্ট সেটি চালু করেবে। আমি কিছু করবো না।’’

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো বিষয়ে তার বক্তব্য নিয়ে করা এক প্রশ্নে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘নারীদের প্রতি সম্মান দিতেই এই প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে বাচ্চা যখন দুধপান করে সে সময়ে ছেলেদের মতো সমপরিমাণ কাজ করাকে আমাদের ইনজাস্টিস মনে হয়েছে। আর এটি বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক।’’

সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমানকে প্রশ্ন করা হয় কোনো নারী জামায়াতের প্রধান হতে পারেন কিনা। এর জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘এটা সম্ভব নয়। এটা সম্ভব নয় কারণ আল্লাহ প্রত্যেককে নিজস্ব সত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কারণ আপনারা (পুরুষরা) কখনই সন্তান ধারণ করতে পারবেন না।’’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘আমরা কখনও শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারব না। এটি আল্লাহ প্রদত্ত। আর নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’’

একজন মা কেন জামায়াতের প্রধান হতে পারবেন না— এই প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।’’

জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত কতজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে— শ্রীনিবাসন জৈনের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘সংসদ নির্বাচনে একজনও না। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, যেখানে আমাদের বোনেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং সফল হয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে আমরা সংসদের জন্যও সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’’

‘‘অন্যান্য দলগুলোতেও আপনারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী দেখতে পাবেন না, কারণ এটি বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক বিষয়। (তবে) আমরা এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি’’— যোগ করেন জামায়াতের আমির।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সাংবাদিক জামায়াতের এই অবস্থানের বিরোধিতা করে বলেন, ‘‘চমৎকার। আপনি বলছেন, তারা একটি সংগঠনের প্রধান হতে পারবেন না, অথচ তারা ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সুতরাং পরিষ্কারভাবেই নারীরা নেতৃত্বের অবস্থানে থাকার যোগ্যতা রাখেন।’’

এর জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ দেশও এটাকে সম্ভব বলে মনে করেনি। এটাই বিশ্বের বাস্তবতা।’’ বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই নারী নেতৃত্ব ছিল— সাংবাদিকের এমন যুক্তিতে শফিকুর রহমান উত্তর দেন, ‘‘খুব অল্প কিছু দেশে।’’

দেশের দুই নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ তুললে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘আমরা তাদেরকে অসম্মান করছি না। আপনি যদি আধুনিক বিশ্বের দিকে তাকান, তাহলে কতজন নারী নেতৃত্ব দেখছেন?’’

এরপর আলোচনাটি বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অতীতের রাজনৈতিক জোটের দিকে মোড় নেয়, যে সময় খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো কাজ করেছেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘এটা আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। এটা তাদের দলের সিদ্ধান্ত।’’

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনার পর বাংলা দৈনিক প্রথম আলো, ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের উস্কানির কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না— শ্রীনিবাসন জৈনের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়েতের আমির বলেন, “এই সিদ্ধান্ত ছাত্রশিবির নেবে। এটা আমাদের সাইড অর্গানাইজেশন নয়। ইট ইজ নট এ লিগ্যাল পার্ট অব জামায়াত আমব্রেলা লাইক ছাত্রদল, ছাত্রলীগ। তাদের আলাদা গঠনতন্ত্র আছে।”

ছাত্রশিবিরের নেতাদের সাজা দেওয়ার অধিকার কী তাহলে জামায়াতের নেই- এমন প্রশ্নে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা কেবল মতামত ও পরামর্শ দিতে পারি। একটা মানুষ কিছু ভুল করতেই পারে, তাকে শোধরাতে হবে। দি ইজ নট দ্য ওয়ে টু শেড হিম। তবে সে যদি একই ভুল বারবার করে তাহলে তাকে শাস্তি দিতে হবে।”

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে জামায়াত জড়িত না বলেও দাবি করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলছি, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় জামায়াতের কেউ জড়িত ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত হিন্দুদের ওপর কোনো হামলায় জামায়াত জড়িত ছিল না। বিগত সরকারের আমলে হিন্দুদের ওপর যত হামলা হয়েছে, দায় চাপানো হয়েছে জামায়াতের ওপর। কিন্তু আদালতে কোনো মামলায় জামায়াতের কেউ দোষী প্রমাণিত হয়নি। হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু জামায়াত জড়িত ছিল না।’’

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের অবস্থান নিয়ে করা এক প্রশ্নের উত্তরে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘আমরা যুদ্ধের সময় কোনো অপরাধ করিনি। ওই সময় কিছু ফোর্স ছিল। সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী ছিল, পাকিস্তানের সেনারা তাদের পরিচালনা করত, কোনো সংগঠন নয়। কেউ যদি সে সময় সহিংসতায় জড়িত থাকত, তাদের বিরুদ্ধে একটা সিংগেল কেসও কেন নেই? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশেরও কোনো পুলিশ স্টেশনে ওই সময়ে একটা সাধারণ জিডিও কেন করা হয়নি?’’

সম্পর্কিত