শুধুমাত্র নিরামিষ জাতপাতের রাজনীতি দিয়ে ভোটের ঝুলি ভরছে না। তাই উগ্র সাম্প্রদায়িক তাস খেলার পাশাপাশি মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করাটাও এখন একটা নির্বাচনী কৌশল হয়ে উঠেছে। মানুষকে ভয় পেতে হবে। সেই ভয়ের থেকেই আসবে ভক্তি। সেই ভক্তির ভরসাতেই ভরবে ভোট বাক্স। এজন্যই মানুষকে ভয় দেখানোর নতুন যন্ত্র এসআইআর। পুরো নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করাই হচ্ছে এসআইআরের ঘোষিত লক্ষ্য।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার সংশোধন অবশ্যই করা প্রয়োজন। কোনো সন্দেহ নেই সেই তালিকা সংশোধনের জন্য ব্যাপক প্রচার জরুরি। কিন্তু অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির আপাত দৃষ্টিতে কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিহারে এসআইআর করতে গিয়ে লেজেগোবরে হওয়ার পর এখন নির্বাচন কমিশন বেশ সতর্ক। ভারতের ১২ রাজ্যে দ্বিতীয় দফায় এসআইআর হবে। এটা নতুন কিছু নয়। ২০০২ সালেও পশ্চিমবঙ্গে নিবিড় সংশোধন হয় ভোটার তালিকার। তখন অবশ্য এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়নি। কারণ প্রয়োজন ছিল না। এখন কারও কারও প্রয়োজন। তাই এসআইআর নিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। সেই আতঙ্কেই মঙ্গলবার প্রদীপ কর (৫৭) নামে এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন। এর আগে আমরা আসামেও দেখেছি এনআরসি নিয়ে ব্যাপক আতঙ্ক এবং বহু মানুষের মৃত্যু। কিন্তু আজও সেই এনআরসি বাস্তবায়িত হয়নি। এনআরসি, মানে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি এবং এসআইআর নিয়ে মানুষের মনে ভয় তৈরির চেষ্টা চলছে।
ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ বা সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা অনেক মানুষ বসবাস করেন। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই রয়েছেন এই দলে। এদের বড় অংশ গরিব। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের লাখ লাখ মানুষ রয়েছেন। তাদের ভোট জরুরি। আবার আসামের হিন্দু বাঙালিদের ভোটও জরুরি। ত্রিপুরাতেও একই ছবি। ভারতের মানুষ, বিশেষ করে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। বিজেপি চাইছে তাদের সেই চেতনায় আঘাত হানতে। তাই মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে হিন্দুদের একাট্টা করার কৌশল তাঁদের রয়েছে। নির্বাচন এলেই সেই কৌশল প্রবল হয়।
বিহারের বিধানসভা ভোট শেষ হলেই পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরি বিধানসভার ভোট। তার আগে যথেষ্ট সময় দিয়ে শুরু হয়েছে এই চার রাজ্যসহ ১২ রাজ্যের এসআইআর। আসামে আপাতত এসআইআর হচ্ছে না। তাই সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাক। ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বৈধ নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়া হবে না। কিন্তু অবৈধ নাম বাদ যাবে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। ভোটারদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হলে কিছু তথ্যপ্রমাণ দেখাতে হবে নাগরিকদের। তাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী সেই তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রমাণের কোনো অভাব নেই। তবু আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
আসলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির বলার মতো তেমন কিছু নেই। নেই মমতা ব্যানার্জির বিকল্প কোনো নেতা। ২০২১ সালের পর থেকেই তাদের গ্রাফ নিম্নমুখী। দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও অনেকে শাসক দল তৃণমূলের দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছেন। বিজেপি কর্মীরা বিশ্বাস করেন, দিদি ও মোদি (মমতা ব্যানার্জি ও নরেন্দ্র মোদি)-র মধ্যে গোপন বোঝাপড়া রয়েছে। সেটিংয়ের অভিযোগ নিয়ে বিজেপি কর্মীরাও হতাশ। গোটা দেশেই বিজেপির সেই আগের কারিশমা আর নেই। পশ্চিমবঙ্গেও তার প্রভাব পড়েছে। এই অবস্থায় দলকে চাঙা করতে তাদের প্রয়োজন ছিল ম্যাজিক দণ্ডের। সেই ম্যাজিক দণ্ড হিসেবেই কাজ করাতে চাইছে এসআইআরকে। ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছে। ভাবটা এমন এসআইআর হলেই সব মুসলমানের নাম বাদ চলে যাবে। আর ড্যাং ড্যাং করে ভোট জিতে যাবে বিজেপি।
ঠিক এই ভরসাতেই আসামে কোটি কোটি রুপি খরচ করে করা হয়েছিল এনআরসি। কিন্তু সাড়ে তিন কোটি আবেদন যাচাই করার পর বার হয়েছে মাত্র ১৯ লাখ সন্দেহজনক মানুষ পাওয়া যায়। এই ১৯ লাখের মধ্যে বেশির ভাগই হিন্দু ও বাঙালি। মুসলমানদের শনাক্ত করা না যাওয়ায় ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত আসামের এনআরসি চূড়ান্ত তালিকা আজও গৃহীত হয়নি। এবার সেখানে এসআইআরও হচ্ছে না। কারণ দেখা গিয়েছে, নাগরিকত্ব পরীক্ষায় হিন্দুদেরই হয়রানি বেশি হচ্ছে। সেই হয়রানির হাত থেকে বাঁচাতে সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন করা হয়েছে। সেই আইনে প্রথমে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে শরণার্থী হয়ে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ ও পার্সিদের শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এরপর গত সেপ্টেম্বরে ভিত্তি বছর ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। কিন্তু তাতেও আসামের বাঙালিদের মধ্যে তেমন একটা উৎসাহ দেখা যায়নি। গত ৬ বছরে মাত্র ১২ জন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন। নাগরিকত্ব পেয়েছেন মাত্র ৩ জন।
তবু কিন্তু ভয় দেখানোর বিরাম নেই। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দলে টানার চেষ্টা চলছে আসামে। সীমান্ত পুলিশ আসামের নাগরিকদের নামের পাশে ডাউটফুল বা সন্দেহজনকের ডি লিখে দিচ্ছেন। ফরেনারস ট্রাইব্যুনালে তাদের হয়রানিও হচ্ছে। ভরা হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে। চলছে নাগরিক হয়রানি। আবার এই নাগরিকদেরই অভয় দিতে এগিয়ে আসছেন বিজেপি নেতারা। তারাই সাপ হয়ে দংশন করছেন, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ছেন। ভয় থেকে ভক্তি আদায়ের কৌশলকে কাজে লাগিয়ে ভোট বৈতরণি পার হতে চায় বিজেপি। শুধু মুসলমান ভীতি নয়, নাগরিকত্ব ভীতিকেও তারা দোসর করতে চান। আসামে অনেকটাই সফল। এবার বাংলাতেও একই কৌশলের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
এসআইআর করবেন রাজ্য সরকারের কর্মীরা। তাদের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর ৫.৬ শতাংশের বেশি মানুষ মারা যান। এমনিতে ভোটার তালিকা সংশোধন না হলেও বুথে বুথে রাজনৈতিক কর্মীরাই নিজেদের পরিচিত মৃতদের নাম বাদ দিয়ে থাকেন। কেউ স্থায়ীভাবে ঠিকানা বদল করলে সেটাও তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক কর্মীদের জানা থাকে। কারণ গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি মানুষই একে অন্যকে চেনেন। হিন্দু এলাকার হিন্দু নেতারা যেমন তাদের প্রতিবেশীদের চেনে এবং জানে, তেমনি মুসলমান অধ্যুসিত এলাকাতেও ছবিটা একই। মিশ্র জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও অচেনা লোকেরা সহজে জায়গা করে নিতে পারে না।
এবার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রচুর ভোটারের নাম বাদ যাবে। বুথ থেকে বিধানসভা কেন্দ্র, সেখান থেকে জেলা ও রাজ্য, যোগফল লাখ লাখ হবে। বিজেপির কৌশল সেই সংখ্যাটিকে নিয়েই কর্মীদের চাঙা করা। দেখানো যে, ভুয়া নাম বাদ যাওয়ায় এবার তাদের জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এছাড়া তাদের কর্মীদের চাঙা করার কোনো অস্ত্র নেই।
পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন বামেদের শাসনে থাকায় এখানকার মাটি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী। বামেদের পতন এবং বিজেপির উত্থানে কিছুটা হলেও সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দেওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক চেতনা কমেনি। তাছাড়া ভারতীয় রাজনীতিতে ভোটারদের সরাসরি পাইয়ে দেওয়ার যে রাজনীতি সেটাতেও মমতা ব্যানার্জি অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু, সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন। গ্রামের গরিব মানুষদের জন্য রয়েছে একগুচ্ছ প্রকল্প। সেই প্রকল্পের হাত ধরে শাসক দলের তৃণমূল স্তরের নেতাদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সম্পর্ক খুবই আন্তরিক। এটাও চিন্তায় রেখেছে বিজেপিকে। তাই তাঁদের ভরসা এসআইআর।
এসআইআরও ঠিক নয়, এসআইআর-ভীতিই বিজেপির হাতিয়ার। ভাবটা এমন, এসআইআর দিয়ে কার্যত সব বাংলাদেশিকে তারা কাঁটাতারের ওপারে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। মানুষ সচেতন। তবু কেউ কেউ ভয় পাচ্ছেন। বা, তাদের ভয় পেতে বাধ্য করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হল, এসআইআর স্থানীয় মানুষেরাও সক্রিয় ভূমিকায় থাকবেন। তাই চাইলেই কারও ভোটাধিকার হরণ মোটেই সহজলভ্য নয়। বিজেপির প্রচার যন্ত্রও সেটা জানে। তবু তাঁদের সামনে আর কোনও পথ নেই। তাই এসআইআর জপ চলছে সর্বত্র।
বিজেপির এই সর্বগ্রাসী প্রচারে বিপরীতে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল নেতারাও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তাদের বিভ্রান্ত করাটাই তো বিজেপির কৌশল। বামেরা অবশ্য সীমিত শক্তি নিয়েও এসআইআর মোকাবিলায় বেশ সক্রিয়। বুথে বুথে চলছে ভোটারদের নিজেদের নাম বহাল রাখার প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াতেও উৎসাহ দেখাচ্ছেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। বিভ্রান্তির কোনও জায়গা নেই। ধীরে ধীরে এসআইআর ভীতিও কমছে। এটাই ভয়ের বিজেপি থিংক ট্যাংকের। তাই তাঁরা কর্মীদের চাঙ্গা করতে স্বাভাবিক নিয়মেই সম্ভাব্য বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ নামকে পুঁজি করতে চাইছে। সেই সঙ্গে দুর্বলদের নাগরিকত্বের ভয় দেখিয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মন জেতার চেষ্টা করছে। তবে এসআইআর ভীতিতেও বাংলায় পদ্ম (বিজেপির প্রতীক) ফোটার কোনও সুযোগ নেই। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ঘাসফুল (তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক)-এই তাঁদের ভরসা দেখাতে শুরু করেছেন। সঙ্গে বামেদের প্রতিও কিছুটা হলেও মানুষের সমর্থন ফিরতে শুরু করেছে। এটাই চিন্তায় রেখেছে বিজেপিকে।
তরুণ চক্রবর্তী: কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।