৩২ বছর বয়সী ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হাদি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং ভারতের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকা ত্যাগের পর থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতেই অবস্থান করছেন।
হাদির মৃত্যুর পর তার সমর্থকরা ভারতপন্থী বা ভারতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এমন সবকিছুর ওপর চড়াও হয়। ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ পায়নি। বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ও ‘প্রথম আলো’র কার্যালয়েও ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তাদের অভিযোগ, এই পত্রিকা দুটি হাদির হত্যাকাণ্ডের গ্রাউন্ড প্রস্তুত করেছিল। বিক্ষোভকারীরা পত্রিকাগুলোকে দিল্লির পোষ্য এবং শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে আখ্যা দেয়। এছাড়া দেশের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে হামলা চালানো হয় এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।
ভারত-বিরোধী এই বিক্ষোভের মুখে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বরের পর দ্বিতীয়বারের মতো নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করেছে। অন্যদিকে, নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের জেরে ঢাকাতেও ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে বাংলাদেশ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের শত শত সমর্থক বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তার দাবিতে সেই বিক্ষোভে অংশ নেয়। এ ছাড়া দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে কলকাতা, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, আগরতলা ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন অংশেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
এমন একটি বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে একইসঙ্গে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও বিকল্প।
প্রথমত, ভারতকে বাংলাদেশের এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাক মেনে নিতে হবে এবং দেশটির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোও দিল্লির সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেছিলেন, “ভারত আমাদের বন্ধু এবং আমরা তাদের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবিএকইভাবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং আমরা একটি সুদৃঢ়, স্থিতিশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই।” বাংলাদেশের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি রোধে অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উল্লেখ্য, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ভারত যে নমনীয়তা ও কৌশলগত অবস্থান দেখিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, অনেক দেশ এবং বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত আইনি প্রক্রিয়ার ধরন এবং ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এমতাবস্থায় ভারত যদি তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর (এক্সট্রাডিশন) করে, তবে তা বিশ্বের কাছে একটি ভুল রাজনৈতিক বার্তা পাঠাতে পারে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের পর ভারতের নীতি-নির্ধারণী মহল এই প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তরের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা করতে পারে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনাকে একজন স্বৈরাচারী শাসক মনে করে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিতৃতীয়ত, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনাকে একজন স্বৈরাচারী শাসক মনে করে বলে ধারণা করা হয়। হাসিনার শাসনামলে অগণিত মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ। দিল্লি থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে লক্ষ্য করে দেওয়া তার বিভিন্ন সমালোচনামূলক বক্তব্য বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের উত্থান এবং হিন্দুদের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার অভিযোগ সংক্রান্ত মন্তব্যগুলো বাংলাদেশে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার কারণে অনেক বাংলাদেশি ভারতের ওপর অসন্তুষ্ট। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই চুপ থাকতে হবে এবং নয়াদিল্লিকে বিষয়টি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার বাকস্বাধীনতা থাকলেও, কৌশলগত কারণে ভারতের জন্য এটিই যুক্তিযুক্ত হবে যে, তারা যেন তার রাজনৈতিক উসকানিমূলক সব বক্তব্যকে সমর্থন না দেয়, কারণ দিল্লিকে এখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ভারত-বিরোধী মনোভাবের জন্য ইসলামপন্থী বা তৃতীয় কোনো পক্ষকে দায়ী করা বেশ সহজ। যদিও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কের পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করেন, তারা সাধারণত ভারতীয়দের কাছ থেকে ভালো আচরণ পান না।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশি অভিবাসীরা উইপোকার মতো। এছাড়া অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে ভারত থেকে বাংলাদেশে লোকজনকে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও দেশটি ইতিবাচকভাবে নেয়নি। ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক সমাজ বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছে। ভারত কর্তৃক সীমান্তে তথাকথিত অননুমোদিত কাঁটাতার নির্মাণের বিষয়েও বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অগ্রসর হতে হবে। বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পটভূমিতে ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কোনো ব্যক্তিত্ব, সংবাদমাধ্যম, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিবর্গকে এমন কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে যা নয়াদিল্লির জন্য নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
লেখাটি ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত
লেখক: সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের একজন রিসার্চ ফেলো