নেপাল ও বাংলাদেশে জেন-জি আন্দোলনের মিল-অমিল

আক্কু চৌধুরী
আক্কু চৌধুরী
নেপাল ও বাংলাদেশে জেন-জি আন্দোলনের মিল-অমিল
নেপাল ও বাংলাদেশে অভ্যুত্থান। ছবি: চরচা ও রয়টার্স

গত কয়েক মাস আগে নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বদলে দেওয়া জেন-জি (জেনারেশন জেড) আন্দোলনটি বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে তরুণদের আন্দোলন বড় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু নেপালের আন্দোলনটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। প্রায় ৪ হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে সমৃদ্ধ নেপাল হলো এমন এক দেশ, যেখানে নানা জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও শিকড় অটুট রেখে বসবাস করে। এই বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধাই নেপালের প্রকৃত শক্তি।

নেপালে আন্দোলন

জেন-জি আন্দোলনটি সেই রাজনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, যা বহু বছর ধরে রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিহীন করে তুলেছিল। এর তাৎক্ষণিক ফল ছিল উল্লেখযোগ্য–ক্ষমতাসীন দলগুলো পদত্যাগ করে এবং সমাজে সম্মানিত অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও পরিবর্তনের মনোভাব দেখা যাচ্ছে। তরুণ নেতৃত্ব উঠে আসছে সামনের সারিতে।

এই আন্দোলন নেপালকে গড়ার, জনগণের সেবা করার। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নে নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে। রাজনীতি, এনজিও, ব্যবসা ও অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন–সব ক্ষেত্রেই জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। যদি অবশ্য সুশীল সমাজের নেতৃত্বস্থানীয়সহ এসব খাতের নেতারা তরুণদের কথা সত্যিকার অর্থে শোনেন। দুই দিনের সেই আন্দোলনের সাথে যারা সংহতি প্রকাশ করেছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাকেও যদি তারা গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেন।

বিশ্বের যেকোনো স্থানে পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। অতীতের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত এই ক্রমবর্ধমান সচেতনতা উদ্‌যাপন করা। তবে এখুনি ফলাফল আশা করাটা হবে অবাস্তব। পরিবেশের এই পরিবর্তন বহু বছর ধরে অধিকার ও ন্যায় থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মাঝে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমি গভীরভাবে একাত্ম বোধ করি। কিন্তু একই সঙ্গে এ বিষয়ে সতর্ক যে, প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আসতে সময় নেবে।

জেন-জি ইতিমধ্যেই পরিবর্তনের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন অবিচল অঙ্গীকার ও যৌথ প্রচেষ্টা, যাতে আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলতে পারি ন্যায়, মানবিকতা ও সবার জন্য একটি উত্তম বিশ্ব।

বাংলাদেশ ও নেপালের তুলনা

২০২৪ সালের বাংলাদেশের জেন-জি নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান, যা একটি দৃশ্যত শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী সরকারকে পতন ঘটায়। আমি নেপালের আন্দোলনও পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি দেখেছি, নেতৃত্ব একই প্রজন্মের হলেও এই দুই আন্দোলনের গতি ও রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পার্থক্যটি মূলত দুই দেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক চরিত্রে। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে তীব্রতর হয়ে ওঠা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছিল দিনের পর দিন। অন্যদিকে হিমালয়ের পাদদেশের নেপালি জনগণ দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত সহিংসতা ছাড়াই তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের আন্দোলনের সময় আমি জেনারেশন ওয়াই (যাদের জন্ম ১৯৮১-৯৬ সালের মধ্যে) প্রজন্মের অনেক সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা করেছি। প্রায় সব আলোচনাই এক কঠিন বাস্তবতায় গিয়ে ঠেকেছে। তাদের কথায়, এই জেন আলফা ও জেন-জি প্রজন্ম আসলে সমাজের একাংশ মাত্র, যাদের মধ্যে অনেকে নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত। গণমাধ্যম এই অভ্যুত্থানকে চমৎকারভাবে প্যাকেজ ও বাজারজাত করেছে–যেখানে তরুণরাই একদিকে নায়ক, অন্যদিকে মূল ভোক্তা।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত অভিজাত শ্রেণি প্রায়ই নিজেদের স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করে এসেছে। এই ধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বারবার ঘটেছে। প্রতিবার তরুণরা একই ফাঁদে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়েও জেন-জি প্রজন্মকে সেই পুরোনো শক্তির খেলায় ব্যবহার করা হয়েছে। এটি সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত অভিজাত মানসিকতার প্রতিফলন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং এখন ২০২৪–সবসময়ই তরুণরাই সবচেয়ে বড় ত্যাগ করেছে। বাস্তবতা হলো, তরুণদের এই ত্যাগ ও আবেগকে ধনী ও ক্ষমতাশালী প্রবীণরা নিজেদের লোভ ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করে। এই প্রবণতা পদ্ধতিগত। কারণ শ্রেণি-সংঘাত ছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার মুনাফা ও ক্ষমতার লক্ষ্য ছাড়তে চায় না।

যদিও ২০২৪ সালের আন্দোলন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তবুও এটি ‘জেন-জি আন্দোলন’ হিসেবেই পরিচিত করা হয়– কী অদ্ভুত এক প্রবণতা। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন ও ত্যাগের প্রধান উপকারভোগী হবে মধ্যবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

২০২৪-২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন আমাকে ফিরিয়ে নিয়েছিল ১৯৬৮ সালে আমার কৈশোরে–যখন তরুণদের নেতৃত্বে সারা বিশ্বজুড়ে বিদ্রোহের ঢেউ উঠেছিল। আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। প্রতিবাদ জানিয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের। আমেরিকা, জাপান, পোল্যান্ড, ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স, উত্তর আয়ারল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, মেক্সিকো, স্পেন, জার্মানি, ইকুয়েডর, চিলি, যুগোস্লাভিয়া, ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান–এমন বহু দেশে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। এই আন্দোলন অনেকগুলোই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারকে বদলে দেয় এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনে। এর মাধ্যমে বড় কিছু ফলাফলও এসেছিল: যেমন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি, চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রাগ স্প্রিং আন্দোলনের মাধ্যমে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, ১৯৬৯ সালে ফ্রান্সে দ্য গলের পদত্যাগ, আমেরিকায় নাগরিক অধিকার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অগ্রগতি এবং অবশেষে পর্তুগাল, গ্রিস ও স্পেনে স্বৈরাচারী শাসনের পতন।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে

আমরা এখন এটা দেখতে শুধু অপেক্ষা করতে পারি– জেন-জি আন্দোলন কীভাবে পৃথিবীকে গড়ে তোলে। মানবজাতির জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবিলা।

আক্কু চৌধুরী: মুক্তিযোদ্ধা ও পর্যটন উদ্যোক্তা

সম্পর্কিত