পর্ব–২

ইউরোপ এখনো ভ্রান্ত ধারণায় আটকে আছে

ইউরোপ এখনো ভ্রান্ত ধারণায় আটকে আছে
ছবি: এআই

আমাদের একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে কম জ্ঞানী। তিনি এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তিনি একজন রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার। এই ধরনের কোনো বিষয়ে তার কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তিনি বিশ্বের অনেক জায়গায় গলফ কোর্স তৈরি করতে পারেন। কিন্তু বিশ্বের এই পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য আরও বেশি কিছু প্রয়োজন।

আশ্চর্যজনকভাবে, ব্রিটেনে এখনো এই ধারণা প্রচলিত আছে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মার্কিন সাম্রাজ্যের মাধ্যমে এখনো টিকে আছে এবং এটি রক্ষা করতে হবে। তারা এমআইসিক্স (MI6–ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস) এবং গোপন কার্যক্রম থেকে শুরু করে বৈশ্বিক আধিপত্য পর্যন্ত সব কিছু ব্যবহার করতে পারে।

সাম্রাজ্য হারানোর ৮০ বছর পর বিশ্বকে পরিচালনার চিন্তা করার চেয়ে বরং নিজেদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যত্ন নেওয়া ভালো। কিন্তু সেই মরীচিকা এখনো টিকে আছে। ফ্রান্সেরও এটি আছে।

ইউরোপ এখনো ২১ শতকেও তাদের ১৯ ও ২০ শতকের ভ্রান্ত ধারণা এবং যুদ্ধ নিয়ে লড়াই করছে। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য পশ্চিম ইউরোপ আক্রমণ করা–এটি তাদের একটি উন্মাদনা। এটি ইতিহাসের মৌলিক জ্ঞানের এমন অভাব যে, আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এমন কথা বলতে পারেন। আর দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির কথা তো বাদই দিলাম। তবুও ইউরোপ এমন সব ভিত্তিহীন ভয়ের কারণে নিজেদের এমনভাবে গুটিয়ে নিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অর্থহীন।

এই ভয়গুলো দূর হয় না, কারণ ইউরোপ আর বোঝে না। আমার বলা উচিত, ইউরোপীয় নেতারা আর বোঝেন না। আপনি যদি অন্য পক্ষকে বুঝতে চান, তাহলে ফোন তুলুন, একটি ফ্লাইটে উঠুন, প্রতিপক্ষকে ডেকে এক কাপ কফি খেতে বসুন। তাহলে তারা কিছু শিখতে পারবে।

মোটকথা, বাস্তবতা হলো একটি বহু মেরুর বিশ্ব। আপনি এটি অর্থনীতিতে, প্রযুক্তিতে এবং সামরিক শক্তিতে দেখতে পাবেন। কিন্তু এখনো পশ্চিমা আধিপত্য এবং তার মধ্যে মার্কিন আধিপত্যের ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান। বাস্তবতা এবং এই ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে ব্যবধান অনেক বড় এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই তা দেখিয়ে দেন। আসলে যখন তিনি চীনা, ব্রাজিলিয়, ভারতীয় বা রুশদের আক্ষরিক অর্থে নির্দেশ দেন। তিনি রাশিয়াকে বলেন, ‘অবিলম্বে ৮ আগস্টের মধ্যে শর্তহীন যুদ্ধবিরতি করুন।’ তিনি ব্রাজিলকে বলেন, ‘আপনারা একটি আদালতের মামলা বন্ধ করুন।’ তিনি ভারতকে বলেন, ‘আপনারা রুশ তেল কেনা বন্ধ করুন।’

এগুলো শুধু কূটনৈতিক বা বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে বলা হয় না, বরং সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেসব তথাকথিত অধীনস্থদের কাছে এসব দাবি করেন, যাদের জনসংখ্যা আমেরিকানদের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি তাদের প্রতিদিন কী করতে হবে তা বলে দেন। আর তার আশপাশে থাকা সম্পূর্ণ অজ্ঞ অনুসারীরা কূটনীতির শেষটুকুও নষ্ট করে দেয়।

যেমন এই পিটার নাভারো, যিনি আমার মতে হার্ভার্ডের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়া সবচেয়ে অযোগ্য ব্যক্তি। আমি নিশ্চিত যে, তিনি কখনো আমার ক্লাসে ছিলেন না। কারণ তার মুখ থেকে যা বের হয় তা সম্পূর্ণ অর্থহীন। কিন্তু এই লোকটিকে প্রতিদিন সামনে নিয়ে আসা হয় এবং ভারতসহ দেড় শ কোটি মানুষের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ককে আরও খারাপ করে তোলা হয়।

সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। আমি তাকে মার্কিন সিনেটের সবচেয়ে বোকা সিনেটর বলি, কারণ আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে দেখছি এবং তিনি একজন ইডিয়ট এবং একজন নির্বোধ। শুধু একজন যুদ্ধবাজ নয়, একজন ইডিয়টও। তবুও, এর জন্য শুধু লিন্ডসে গ্রাহামকে দায়ী করা ঠিক নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়ও আছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত, আমি আমাদের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের অনেক কাজের সঙ্গে একমত নই, যিনি অপ্রয়োজনে জাপানে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিলেন। কিন্তু তিনি ঠিকই বলেছিলেন যে, প্রেসিডেন্টের কাছেই সব দায়িত্ব শেষ হয়। আমাদের এমন একজন প্রেসিডেন্ট দরকার যিনি সত্যিকার অর্থে কাজ করতে পারেন। আর এখন আমাদের কাছে তা নেই।

তারা প্রতিদিন শুধু হাওয়ায় দুলছে। কারণ হোয়াইট হাউসের ভেতরে বসে তাদের কাছে এটা বোঝার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই যে, তারা কী করছে। ট্রাম্প মূলত সামরিক-শিল্পের দিকে সাড়া দিচ্ছেন, যা গত ৮০ বছর ধরে মার্কিন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু আসলে প্রেসিডেন্টের কাজ হলো ‘না’ বলা। সেটাই সত্যিকারের প্রেসিডেন্টের কাজ এবং তিনি তা করতে পারেন না।

১৯৬১ সাল–এটি ছিল ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ যাত্রার বছর এবং বার্লিন সংকটেরও সময়। আমার জীবনের প্রথম অর্ধেক কেটেছে স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে। আমার মনে হয়, স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে অনেকেই যা বোঝেন না তা হলো, এটি শেষ পর্যন্ত ইউরোপের জন্য একটি সংগ্রাম ছিল। এটি ছিল দুটি পরাশক্তির, অর্থাৎ আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ইউরোপ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিযোগিতা।

সোভিয়েতের ইউরোপ দখলের কোনো প্রকৃত উচ্চাভিলাষী বা আগ্রাসী পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে ঘোর সন্দেহ আছে। কিন্তু সেই সময়ের পুরো বয়ানটাই ছিল যে, এটি ইউরোপ নিয়ে একটি সংঘাত। যখন আমরা ইউরোপে বিশ্বের বাকি অংশ নিয়ে ভাবতাম, তখন এটিকে সবসময় ইউরোপ নিয়ে খেলার অংশ হিসেবে দেখা হতো। অন্য কথায়, পরাশক্তিগুলো বিশ্বের বাকি অংশে সুবিধা অর্জনের জন্য কৌশল চালাত। যাতে শেষ পর্যন্ত তারা ইউরোপে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এমনকি কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র সংকটকেও অনেকে, সম্ভবত সঠিক বা ভুলভাবে, বার্লিন সংকট সম্পর্কিত বলে মনে করতো। তাদের ধারণা ছিল যে, ক্রুশ্চেভ কিউবায় তার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো স্থানান্তর করেছিলেন যাতে তিনি বার্লিন সম্পর্কে আমাদের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে পারেন।

এই ঘটনাটি আমাদের অর্থাৎ ইউরোপের মানুষদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করিয়েছিল। এটি খুব ভীতিকর ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। কারণ আমরা ইতিহাসের মহান ঘটনাগুলোর ঠিক কেন্দ্রে ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল। এখানেই ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় প্রতিযোগিতা চলছিল।

স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হলো এবং হঠাৎ আমরা আবিষ্কার করলাম যে, আমরা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নই। বিশ্বের বাকি অংশ এগিয়ে গেছে এবং এগিয়ে চলেছে। ইউরোপের অনেক মানুষের জন্য, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের জন্য, এটি মেনে নেওয়া এবং বোঝা খুবই কঠিন। তাই আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যেন ১৯৫০, ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকের সেই বিশ্বে ফিরে যেতে চাইছি, যখন সংঘাত ইউরোপে ছিল।

আমরা সেই আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হতে চাই। আমরা সেই একই বুলি আওড়াই এবং একই ধরনের নীতি অনুসরণ করি। কারণ এগুলো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুভব করাতো। আর এটি বিশ্বের বাস্তবতা থেকে একটি ভয়ংকর এবং বিপর্যয়কর বিচ্যুতি, যা আপনি আমার চেয়েও অনেক বেশি ভালোভাবে বর্ণনা করেছেন। একজন ইউরোপীয় হিসেবে আমার চিন্তা হয়, এই কাজগুলো করে আমরা সেই সম্পদগুলো নষ্ট করছি, যা আমাদের এখনও আছে এবং যা আমরা গঠনমূলকভাবে ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারি। আমি মনে করি, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য ইতিবাচক হবে, কারণ আমরা ইউরোপে অনেক কিছু অবদান রেখেছি।

আমি মাঝে মাঝে ইউরোপীয়দের কাজের সমালোচনা করি, কিন্তু তারা অসাধারণ ও দারুণ কিছু কাজও করেছে। তাই, আমরা সেই অবদানগুলো রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা নিজেদেরকে প্রান্তিক করে তুলছি। নতুন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ইউরোপকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, যা আমাদের অবশ্যই করতে হবে, বরং তাদের নিজের ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়েও চিন্তা করতে হবে। আর আমাদের গঠনমূলকভাবে করার মতো অনেক কিছু আছে। আমাদের এখনো দারুণ সব বিশ্ববিদ্যালয়, অসাধারণ বিজ্ঞান এবং অসাধারণ সংস্কৃতি আছে। কিন্তু এর সবই আমরা নষ্ট করছি।

** চলবে...

সম্পর্কিত