ফজলে রাব্বি

তীব্র ভ্যাপসা গরমে এক পশলা বৃষ্টি নিশ্চিতভাবেই স্বস্তি এনে দেয়। ফুটবলপ্রেমী হয়ে থাকলে তো কোন কথাই নাই। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা দর্শকদের স্বস্তির মাত্রাটা বেড়ে যায় নিশ্চিতভাবেই।
চারদিকের গাছের পাতাগুলোর বাড়াবাড়ি রকমের সজীবতা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, নগরীতে চলছে আষাঢ় মাস, তথা বর্ষাকাল। কাজেই বৃষ্টিজনিত এমন স্বস্তি হয়তো মাঝেমধ্যেই পাবেন এই ব-দ্বীপের মানুষ। বরষার গান, গরম চা কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে আপনি হয়তো এই স্বস্তির সময়টুকু উদযাপন করেন বা করেন না। কিন্তু গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, দুই শ্রেণির মানুষ কিন্তু বর্ষার দিনগুলো উদ্যাপন করে, বলতে পারেন রীতিমতো অপেক্ষা করে। শ্বাস কষ্টের রোগী আর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
বায়ুমান সূচক অনুযায়ী জুলাইয়ের প্রথম দিন সকাল ৯টায় বিশ্বের চতুর্থ (একিউআই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-১২৩ পয়েন্ট) দূষিত নগরী ছিল ঢাকা। সন্ধ্যায় বৃষ্টির পর সেই সূচকে ঢাকার অবস্থান হয় ৪০-এ (একিউআই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স- পয়েন্ট ৬৩)। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বাতাসের সব বিষাক্ত উপাদান ধুয়ে দেওয়া বৃষ্টির পর নির্মল বাতাসের জন্য অপেক্ষা করেন শ্বাসকষ্টের রোগীরা। একই সাথে, বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ায় লোডশেডিং কম করতে হয়। স্বস্তি নেমে আসে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মনে।
সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের তাণ্ডবে খেলাপ্রেমী, শিক্ষার্থী, হাসপাতালের রোগী, সাধারণ মানুষ যেভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, তাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তারা তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় যে স্বস্তি পান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন কি না–তা অবশ্য হলফ করে বলা যাচ্ছে না।
বিদু্ৎ আবিষ্কারের পর থেকে এর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিদ্যুতের জন্য রীতিমতো ক্ষুধা তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে। এই ক্ষুধা মেটাতে পাতাল ফুঁড়ে মানুষ তেল-গ্যাস-কয়লা বের করে এনেছে। সূর্যের আলো, বাতাস, পরমাণু ভাঙা থেকে শুরু করে কী না করছে মানুষ। যেখান থেকে যতটুকু, যত কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তার সব পথ খুঁজে বের করার রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্বজুড়ে। বাদ যাচ্ছে না সমূদ্রের ঢেউ, বিভিন্ন স্তরে পানির তাপমাত্রার পার্থক্য, জোয়ার-ভাটা–সবকিছু থেকে বিদু্ৎ খুঁজছে মানুষ। ফলে বিদ্যুতের সাথে পরিবেশের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুতের এই ক্ষুধা যেমন পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধের কারণ হয়েছে, তেমনি ক্ষুধার ঠ্যালায় ধরাধামের ১২টা বাজিয়ে ফেলেছে মানুষ। ফলে পরিবেশ রক্ষার একটা চাপ তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে। বিষয়টা এমন–বিদ্যুৎ চাই, আবার পরিবেশের সতেজতাও রক্ষা করা চাই।
পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের কথা আমরা সবাই জানি। যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করতে হয় না, তা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ। কিন্তু স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যুতের কথা শুনেছেন?
ফুটবলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলে উৎপাদন হয় স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যুৎ। দেশটির মিনাস জেরাইস শহরের একটি কারাগারে কয়েদিরা ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করে বিদ্যুৎ। না! আপনি যা ভাবছেন, তেমনটি নয়। ঘাম থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয় না। কারাগারে রাখা সারি সারি এক্সারসাইজ বাইসাইকেলের চাকার ঘুর্ণন গতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
সেখানকার কর্তৃপক্ষ, এই সাইক্লিংয়ে যেসব বন্দি স্বেচ্ছায় অংশ নেন, তাদের সাজার মেয়াদ কমিয়ে দেয়। এতে একদিকে কয়েদিদের স্বাস্থ্য ও মন ভালো থাকে, আবার উৎপাদন হয় বিদ্যুৎ। সে বিদ্যুতে আলোকিত হয় স্থানীয় একটি পার্ক। আবার, সাজার মেয়াদ কমে যাওয়ায় কারাগারও উপচে পড়ে না বন্দিতে। বাংলাদেশে যেমন ৪৪ হাজার ধারণক্ষমতার কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি!
সে যাই হোক–আপনি অবশ্যই জানেন, আরেক ধরনের বিদ্যুৎ আছে, যা পুরো নগরীর পরিবেশ বদলে দেয়। ভোজবাজির মতো পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় শহর। তার নাম বর্জ্য-বিদ্যুৎ। এটি শুধু বিদ্যুতের ক্ষুধা মেটায় না পুরো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি শৃঙ্খলায় নিয়ে আসে। উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি।
জাপানের টোকিও, সুইডেনের স্টকহোম, জার্মানির বার্লিন, ডেনমার্কের কোপেনহেগনে, চীনের শেনজেনসহ অনেক শহরের সাফল্য উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মানুষের জন্য সিঙ্গাপুর সিটির উদাহরণ সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
বেশি দিন আগের কথা না। সত্তরের দশকে সিঙ্গাপুর সিটির অপরিকল্পিত ডাম্পিং, দুর্গন্ধ, মাছি আর যত্রতত্র আবর্জনায় রীতিমতো সংকট পড়ে গিয়েছিল নগরীর জনস্বাস্থ্য। ওদিকে, ছোট্ট শহর। জমির পরিমাণ কম। ফলে ল্যান্ডফিল উপচে পড়তে থাকে আবর্জনা। এ পরিস্থিতিতে ১৯৭৯ সালে পুরো শহরের পরিবেশ বদলে দেয় ‘উলু পান্ডা ইনসারশন প্ল্যান্ট’।

পুরো নগরীর আবর্জনা পরিণত হয় সম্পদে। নগরীর মানুষের আবর্জনাকেন্দ্রিক আচরণ বদলে যায়। উপরন্তু উলু পান্ডার বিদ্যুতের আলোয় সিঙ্গাপুরের ঝা চকচকে চেহারা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। চীনের শেনজেনও হতে পারে উদাহরণ। এসব শহরে যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেললে জরিমানা গুনতে হয়। সেটা যেমন সত্য; তেমনি আবর্জনার আর্থিক মূল্যের কারণেও তা যেখানে সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। কোনো কোনো শহরে খালি ক্যান, প্লাস্টিকের বোতল ভেন্ডিং মেশিনে জমা দিয়ে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে নগর কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে এমন একটি প্রকল্প হলে আশা করা যায় কেউ আর যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলার মতো বিলাসিতা করবে না।
কী এই বর্জ্য-বিদ্যুৎ? কীভাবে নগর বদলে দেয় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র? সহজ কথায় বললে, বিষয়টি অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই। কয়লা পুড়িয়ে তাপ উৎপাদন, সেই তাপে বাষ্প, বাষ্প থেকে টারবাইন ঘুরিয়ে উৎপাদন হয় বিদ্যুৎ। এক্ষেত্রে তাপ উৎপাদনে কয়লার পরিবর্তে ব্যবহার হবে আবর্জনা। কিন্তু সব আবর্জনা তো আর দাহ্য না! মানে, মাছের আঁশ, মাংসের হাড়, কাঁটা কিংবা পটলের খোসাতে তো আর আগুন ধরে না। আগুন ধরে কঠিন বর্জ্যে। প্লাস্টিক, পলিথিন, কাগজ, কাঠের পরিত্যাক্ত আসবাব বা এমন উপাদানে। মানে কাঁচা সবজি কিংবা প্রাণিজ আবর্জনা বাদে প্রায় সব বর্জ্যেই তো আগুন ধরে। তবে উদ্ভিজ্জ কিংবা প্রাণিজ আবর্জনাও কিন্তু ফেলনা না। এগুলো থেকে তৈরি হয় জৈবসার। সে অন্য প্রসঙ্গ।
তো এসব শহরের কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিপর্যায়েই আবর্জনাগুলো পৃথক করার জন্য দুই কিংবা তিন ধরনের ডাস্টবিন ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। সেভাবেই সেসব ময়লা সংগ্রহ করছে সিটি করপোরেশন। ফলে দুই ধরনের বর্জ্যই রূপান্তরিত হচ্ছে সম্পদে। জোগান দিচ্ছে বিদ্যুৎ কিংবা সার। শহর হচ্ছে পরিচ্ছন্ন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ২০২৬ সালে এসেও আমাদের এই অতি পরিচিত, বিশ্বজুড়ে কেন এই আলোচনা করছি? বাংলাদেশ তো সেই ২০২১ সালে সাভারের আমিনবাজারে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে ‘চায়না মেশিনারিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’ বা সিএমইসির সাথে চুক্তি করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিএমইসির সাথে চুড়ান্ত চুক্তি হয়। ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রর জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ১১৩১ কোটি টাকা।

শুধু আমিনবাজার কেন? নারায়ণগঞ্জেও ৬ মেগাওয়াট ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি হয়েছিল অন্য এক চীনা প্রতিষ্ঠান ‘ইউ অ্যান্ড ডি এনভায়রমেন্ট’-এর সঙ্গে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের ওই প্রকল্পের জমি বরাদ্দ, এমনকি আবর্জনা সরবরাহ চুক্তিও হয়ে গিয়েছিল।
নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই মাতুয়াইলেও বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল। শুধু তাই নয়; চট্টগ্রামেও বর্জ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো একই সময়। এসব প্রকল্পর একটি থেকেও এখনো বিদ্যুৎ আসছে না। এটি বোঝার জন্য আপনাকে পিডিবির ডেটার দিকে তাকাতে হবে না। নগরীর আবর্জনা ব্যবস্থাপনা আর দূষণ দেখেই আপনি বুঝতে পারবেন এসব প্রকল্প শেষ হয়নি। কিন্তু কোন পর্যায়ে আছে? দুঃখজনক হলেও সত্য–এগুলোর একটিরও অবকাঠামো নির্মাণকাজই শুরু হয়নি।
অথচ বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্ষুধা আছে। নগরীতে পর্যাপ্ত আবর্জনা আছে। এসব আবর্জনা ঘিরে নাগরিক বিড়ম্বনা আছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে, দূষণের যন্ত্রণা আছে, এর থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশ্বজুড়ে সফলতার উদাহরণও আছে, বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাবিদদের আগ্রহ আছে, নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ আছে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি আছে, এমনকি বিনিয়োগকারীও আছে। কিন্তু দুই আনাও কাজের অগ্রগতি নেই। কেন?

তীব্র ভ্যাপসা গরমে এক পশলা বৃষ্টি নিশ্চিতভাবেই স্বস্তি এনে দেয়। ফুটবলপ্রেমী হয়ে থাকলে তো কোন কথাই নাই। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা দর্শকদের স্বস্তির মাত্রাটা বেড়ে যায় নিশ্চিতভাবেই।
চারদিকের গাছের পাতাগুলোর বাড়াবাড়ি রকমের সজীবতা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, নগরীতে চলছে আষাঢ় মাস, তথা বর্ষাকাল। কাজেই বৃষ্টিজনিত এমন স্বস্তি হয়তো মাঝেমধ্যেই পাবেন এই ব-দ্বীপের মানুষ। বরষার গান, গরম চা কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে আপনি হয়তো এই স্বস্তির সময়টুকু উদযাপন করেন বা করেন না। কিন্তু গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, দুই শ্রেণির মানুষ কিন্তু বর্ষার দিনগুলো উদ্যাপন করে, বলতে পারেন রীতিমতো অপেক্ষা করে। শ্বাস কষ্টের রোগী আর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
বায়ুমান সূচক অনুযায়ী জুলাইয়ের প্রথম দিন সকাল ৯টায় বিশ্বের চতুর্থ (একিউআই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-১২৩ পয়েন্ট) দূষিত নগরী ছিল ঢাকা। সন্ধ্যায় বৃষ্টির পর সেই সূচকে ঢাকার অবস্থান হয় ৪০-এ (একিউআই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স- পয়েন্ট ৬৩)। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বাতাসের সব বিষাক্ত উপাদান ধুয়ে দেওয়া বৃষ্টির পর নির্মল বাতাসের জন্য অপেক্ষা করেন শ্বাসকষ্টের রোগীরা। একই সাথে, বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ায় লোডশেডিং কম করতে হয়। স্বস্তি নেমে আসে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মনে।
সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের তাণ্ডবে খেলাপ্রেমী, শিক্ষার্থী, হাসপাতালের রোগী, সাধারণ মানুষ যেভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, তাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তারা তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় যে স্বস্তি পান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন কি না–তা অবশ্য হলফ করে বলা যাচ্ছে না।
বিদু্ৎ আবিষ্কারের পর থেকে এর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিদ্যুতের জন্য রীতিমতো ক্ষুধা তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে। এই ক্ষুধা মেটাতে পাতাল ফুঁড়ে মানুষ তেল-গ্যাস-কয়লা বের করে এনেছে। সূর্যের আলো, বাতাস, পরমাণু ভাঙা থেকে শুরু করে কী না করছে মানুষ। যেখান থেকে যতটুকু, যত কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তার সব পথ খুঁজে বের করার রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্বজুড়ে। বাদ যাচ্ছে না সমূদ্রের ঢেউ, বিভিন্ন স্তরে পানির তাপমাত্রার পার্থক্য, জোয়ার-ভাটা–সবকিছু থেকে বিদু্ৎ খুঁজছে মানুষ। ফলে বিদ্যুতের সাথে পরিবেশের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুতের এই ক্ষুধা যেমন পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধের কারণ হয়েছে, তেমনি ক্ষুধার ঠ্যালায় ধরাধামের ১২টা বাজিয়ে ফেলেছে মানুষ। ফলে পরিবেশ রক্ষার একটা চাপ তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে। বিষয়টা এমন–বিদ্যুৎ চাই, আবার পরিবেশের সতেজতাও রক্ষা করা চাই।
পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের কথা আমরা সবাই জানি। যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করতে হয় না, তা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ। কিন্তু স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যুতের কথা শুনেছেন?
ফুটবলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলে উৎপাদন হয় স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যুৎ। দেশটির মিনাস জেরাইস শহরের একটি কারাগারে কয়েদিরা ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করে বিদ্যুৎ। না! আপনি যা ভাবছেন, তেমনটি নয়। ঘাম থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয় না। কারাগারে রাখা সারি সারি এক্সারসাইজ বাইসাইকেলের চাকার ঘুর্ণন গতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
সেখানকার কর্তৃপক্ষ, এই সাইক্লিংয়ে যেসব বন্দি স্বেচ্ছায় অংশ নেন, তাদের সাজার মেয়াদ কমিয়ে দেয়। এতে একদিকে কয়েদিদের স্বাস্থ্য ও মন ভালো থাকে, আবার উৎপাদন হয় বিদ্যুৎ। সে বিদ্যুতে আলোকিত হয় স্থানীয় একটি পার্ক। আবার, সাজার মেয়াদ কমে যাওয়ায় কারাগারও উপচে পড়ে না বন্দিতে। বাংলাদেশে যেমন ৪৪ হাজার ধারণক্ষমতার কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি!
সে যাই হোক–আপনি অবশ্যই জানেন, আরেক ধরনের বিদ্যুৎ আছে, যা পুরো নগরীর পরিবেশ বদলে দেয়। ভোজবাজির মতো পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় শহর। তার নাম বর্জ্য-বিদ্যুৎ। এটি শুধু বিদ্যুতের ক্ষুধা মেটায় না পুরো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি শৃঙ্খলায় নিয়ে আসে। উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি।
জাপানের টোকিও, সুইডেনের স্টকহোম, জার্মানির বার্লিন, ডেনমার্কের কোপেনহেগনে, চীনের শেনজেনসহ অনেক শহরের সাফল্য উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মানুষের জন্য সিঙ্গাপুর সিটির উদাহরণ সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
বেশি দিন আগের কথা না। সত্তরের দশকে সিঙ্গাপুর সিটির অপরিকল্পিত ডাম্পিং, দুর্গন্ধ, মাছি আর যত্রতত্র আবর্জনায় রীতিমতো সংকট পড়ে গিয়েছিল নগরীর জনস্বাস্থ্য। ওদিকে, ছোট্ট শহর। জমির পরিমাণ কম। ফলে ল্যান্ডফিল উপচে পড়তে থাকে আবর্জনা। এ পরিস্থিতিতে ১৯৭৯ সালে পুরো শহরের পরিবেশ বদলে দেয় ‘উলু পান্ডা ইনসারশন প্ল্যান্ট’।

পুরো নগরীর আবর্জনা পরিণত হয় সম্পদে। নগরীর মানুষের আবর্জনাকেন্দ্রিক আচরণ বদলে যায়। উপরন্তু উলু পান্ডার বিদ্যুতের আলোয় সিঙ্গাপুরের ঝা চকচকে চেহারা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। চীনের শেনজেনও হতে পারে উদাহরণ। এসব শহরে যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেললে জরিমানা গুনতে হয়। সেটা যেমন সত্য; তেমনি আবর্জনার আর্থিক মূল্যের কারণেও তা যেখানে সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। কোনো কোনো শহরে খালি ক্যান, প্লাস্টিকের বোতল ভেন্ডিং মেশিনে জমা দিয়ে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে নগর কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে এমন একটি প্রকল্প হলে আশা করা যায় কেউ আর যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলার মতো বিলাসিতা করবে না।
কী এই বর্জ্য-বিদ্যুৎ? কীভাবে নগর বদলে দেয় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র? সহজ কথায় বললে, বিষয়টি অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই। কয়লা পুড়িয়ে তাপ উৎপাদন, সেই তাপে বাষ্প, বাষ্প থেকে টারবাইন ঘুরিয়ে উৎপাদন হয় বিদ্যুৎ। এক্ষেত্রে তাপ উৎপাদনে কয়লার পরিবর্তে ব্যবহার হবে আবর্জনা। কিন্তু সব আবর্জনা তো আর দাহ্য না! মানে, মাছের আঁশ, মাংসের হাড়, কাঁটা কিংবা পটলের খোসাতে তো আর আগুন ধরে না। আগুন ধরে কঠিন বর্জ্যে। প্লাস্টিক, পলিথিন, কাগজ, কাঠের পরিত্যাক্ত আসবাব বা এমন উপাদানে। মানে কাঁচা সবজি কিংবা প্রাণিজ আবর্জনা বাদে প্রায় সব বর্জ্যেই তো আগুন ধরে। তবে উদ্ভিজ্জ কিংবা প্রাণিজ আবর্জনাও কিন্তু ফেলনা না। এগুলো থেকে তৈরি হয় জৈবসার। সে অন্য প্রসঙ্গ।
তো এসব শহরের কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিপর্যায়েই আবর্জনাগুলো পৃথক করার জন্য দুই কিংবা তিন ধরনের ডাস্টবিন ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। সেভাবেই সেসব ময়লা সংগ্রহ করছে সিটি করপোরেশন। ফলে দুই ধরনের বর্জ্যই রূপান্তরিত হচ্ছে সম্পদে। জোগান দিচ্ছে বিদ্যুৎ কিংবা সার। শহর হচ্ছে পরিচ্ছন্ন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ২০২৬ সালে এসেও আমাদের এই অতি পরিচিত, বিশ্বজুড়ে কেন এই আলোচনা করছি? বাংলাদেশ তো সেই ২০২১ সালে সাভারের আমিনবাজারে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে ‘চায়না মেশিনারিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’ বা সিএমইসির সাথে চুক্তি করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিএমইসির সাথে চুড়ান্ত চুক্তি হয়। ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রর জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ১১৩১ কোটি টাকা।

শুধু আমিনবাজার কেন? নারায়ণগঞ্জেও ৬ মেগাওয়াট ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি হয়েছিল অন্য এক চীনা প্রতিষ্ঠান ‘ইউ অ্যান্ড ডি এনভায়রমেন্ট’-এর সঙ্গে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের ওই প্রকল্পের জমি বরাদ্দ, এমনকি আবর্জনা সরবরাহ চুক্তিও হয়ে গিয়েছিল।
নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই মাতুয়াইলেও বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল। শুধু তাই নয়; চট্টগ্রামেও বর্জ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো একই সময়। এসব প্রকল্পর একটি থেকেও এখনো বিদ্যুৎ আসছে না। এটি বোঝার জন্য আপনাকে পিডিবির ডেটার দিকে তাকাতে হবে না। নগরীর আবর্জনা ব্যবস্থাপনা আর দূষণ দেখেই আপনি বুঝতে পারবেন এসব প্রকল্প শেষ হয়নি। কিন্তু কোন পর্যায়ে আছে? দুঃখজনক হলেও সত্য–এগুলোর একটিরও অবকাঠামো নির্মাণকাজই শুরু হয়নি।
অথচ বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্ষুধা আছে। নগরীতে পর্যাপ্ত আবর্জনা আছে। এসব আবর্জনা ঘিরে নাগরিক বিড়ম্বনা আছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে, দূষণের যন্ত্রণা আছে, এর থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশ্বজুড়ে সফলতার উদাহরণও আছে, বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাবিদদের আগ্রহ আছে, নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ আছে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি আছে, এমনকি বিনিয়োগকারীও আছে। কিন্তু দুই আনাও কাজের অগ্রগতি নেই। কেন?

জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যকে মোটেই ভালোভাবে নেননি জামায়াতের নেতারা।