Advertisement Banner

পাকিস্তান: খুন হওয়ার আগে নওয়াজের সঙ্গে বেনজিরের শেষ কথা

পাকিস্তান: খুন হওয়ার আগে নওয়াজের সঙ্গে বেনজিরের শেষ কথা
বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডির শাহীনবাগের জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে মারা যান। এর ঠিক ৫৬ বছর পর সেই শাহীনবাগের (তখন এর নাম হয়েছে লিয়াকতবাগ) জনসভায় ভাষণ শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন বেনজির ভুট্টো। পাকিস্তানের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনসভায় যে জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, তারাই তাকে নিশানা করে। জনসভাস্থল ও সড়কে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল।

সম্প্রতি লাইটস্টোন পাবলিশার্স প্রকাশিত ফারহাতুল্লাহ বাবরের লেখা ‘বেনজির ভুট্টো: শি ওয়াকড ইনটু দ্য ফায়ার’ বইয়ে নিহত হওয়ার আগে লিয়াকতবাগের জনসভা ও এর আগে ইসলামাবাদের জারদারি হাউসে আরেক প্রধানমন্ত্রীর নওয়াজ শরিফের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। পেশায় সাংবাদিক ফারহাতুল্লাহ বাবর পাকিস্তানের প্রাক্তন সিনেটর, বেনজির ভুট্টো ও আসিফ জারদারির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

করাচি থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ডন-এ দুই প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনটি প্রকাশ করেছে, যা ছিল বেনজিরের শেষ সংলাপ। এর আগে অক্টোবরে তিনি দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে ফিরে আসেন সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে। মোশাররফ গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে ডিসেম্বরে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখেই বেনজির ভুট্টো তার একদা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান।

দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনে বেরিয়ে আসে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সংকট ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়টি। দুই দশক পরও সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ বহাল আছে এবং তাদের জিঘাংসার শিকার হয়ে আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন বন্দী জীবনযাপন করছেন।

ফারহাতুল্লাহ বাবর লিখেছেন, সময়টা ছিল ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাস। সমঝোতা স্মারক-এ উল্লিখিত কষ্টকর আলোচনার পর জেনারেল মোশাররফ ও বেনজির ভুট্টোর মধ্যে সম্মত হওয়া সাধারণ নির্বাচন হতে দেশটি মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে ছিল। নির্বাসন থেকে ফিরে বেনজির ভুট্টো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত–উভয় ধরনের হুমকির এক মাইনফিল্ডের মধ্যে দিয়ে পথ চলছিলেন।

বেনজির ভুট্টো।
বেনজির ভুট্টো।

এই নৈশভোজটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মাত্র এক বছর আগে দুজনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘গণতন্ত্রের সনদ’ ১৯৯০-এর দশকের পুরনো শত্রুতার অবসান ঘটিয়েছিল, যখন পালাক্রমে সরকার গঠনের সময় দুই দল একে অপরের ঘোর শত্রু ছিল। এটিই ছিল তাদের শেষ কথোপকথন–যেখানে দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী আগের চেয়ে অনেক বেশি মন খুলে কথা বলেছিলেন।

ফারহাতুল্লাহর পর্যবেক্ষণ হলো–তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে তাদের রাজনৈতিক শত্রুতা এবং এর সমাধান করা অপরিহার্য। তার ভাষায়, সেই সন্ধ্যাটি ভোলা কঠিন। তিনি তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেতা মিয়া নওয়াজ শরিফকে জারদারি হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার সাথে ছিলেন দলের দুই সহসভাপতি মখদুম আমিন ফাহিম এবং ইউসুফ রাজা গিলানি, যিনি পরে প্রধানমন্ত্রীও হন। নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ছিলেন রাজা জাফরুল হক এবং আরেকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

২০০৭ সালের অক্টোবরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো যখন আট বছরের নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনি পাকিস্তানের জন্য তার একটি রূপকল্পও তৈরি করেছিলেন, যা রাজনীতিতে চরমপন্থা এবং সামরিক হটকারিতার অবসান ঘটাতে সক্ষম।

ডন বেনজির ভুট্টোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফারহাতুল্লাহ বাবরের তৃতীয় স্মৃতিকথা ‘বেনজির ভুট্টো: শি ওয়াকড ইনটু দ্য ফায়ার’ থেকে নির্বাচিত অংশ উপস্থাপন করছে।

নওয়াজ শরিফকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বেনজির বলতে শুরু করলেন। “মিয়া সাহেব, আমি আজ রাতে আপনাকে বিরক্ত করেছি।” তিনি উর্দুতে বলার পর ইংরেজিতে বলতে শুরু করলেন, “কয়েক বছর পর পর রাজনীতিতে বারবার হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে লাইনচ্যুত করা এবং সংবিধানের অবমাননা নিয়ে কথা বলার জন্য আমাদের দেখা করা উচিত।”

নওয়াজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স
নওয়াজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

নওয়াজ শরিফের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন তিনি আরও শুনতে চান। তিনি সামনের দিকে ঝুঁকলেন, দৃশ্যত আবেগাপ্লুত এবং তার আরও কথা শোনার জন্য উদগ্রীব।

বেনজির বলতে থাকেন, “এটা চলতে পারে না। দেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এটা আর সহ্য করা যায় না।” এরপর তিনি যোগ করলেন, “আমি নির্বাসনে বসে এটা নিয়ে ভেবেছি। আমাদের এটা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে এবং একসঙ্গে এর প্রতিকারের জন্য কিছু একটা করতে হবে।”

“দুইবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, যারা এই সবকিছু দেখেছি, আমার মনে হয় কিছু একটা করা আমাদের দায়িত্ব।” আমার ইচ্ছা হচ্ছিল তিনি যদি তার বিশ্লেষণটা চালিয়ে যেতেন। কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই, ক্ষুব্ধ নওয়াজ শরিফ কথা থামিয়ে দিয়ে উর্দুতে বললেন: “বিবি, আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমিও এটা নিয়ে ভেবেছি। অনেক হয়েছে। আমিও এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি”, তিনি উর্দুতে বললেন।

তিনি বলতে থাকলেন, “বিবি, আমি ঠিক করে ফেলেছি যে, ওরা যদি আবার অতর্কিত হামলা করে, তাহলে কী করব।” তার মন্তব্যটি ছিল বিদ্যুৎ চমকের মতো। ‘সত্যি?’ তিনি অবাক হয়ে বললেন, তার দৃষ্টি নওয়াজ শরিফের দিকে স্থির।

“আপনি কী করবেন, আপনি কীভাবে প্রস্তুত?”

তিনি বেশ অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলেন। তিনি এই ভেবে উত্তেজিত ছিলেন যে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন এবং ‘বোনাপার্ট’রা আবার আঘাত হানলে কী করতে হবে, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

ফারহাতুল্লাহর মন্তব্য একদিক থেকে দেখলে, এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক বৈঠক। দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যারা প্রত্যেকে দুবার করে দায়িত্ব পালন করেছেন, রাষ্ট্রের গভীর ষড়যন্ত্র, অসাংবিধানিকভাবে বরখাস্ত হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা আসন্ন নির্বাচন, আসন সমন্বয় বা রাজনৈতিক সমাবেশ নিয়ে কথা বলছিলেন না। তারা সেখানে এসেছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভ্যুত্থানকারীদের মোকাবিলা করার এবং দেশকে বাঁচানোর কাজে নিজেদের প্রস্তুত করতে। দুজনেই একমত হয়েছিলেন যে, দেশের অস্তিত্বই এখন ঝুঁকির মুখে এবং এই দুঃসাহসীদের অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

নওয়াজ শরিফ প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে একমত হলেন। তারা কীভাবে তা করার পরিকল্পনা করছেন? সেই মুহূর্তে, ফারহাতুল্লাহ তার নোটবুক ও কলম হাতে তলে নিলে নওয়াজ শরিফ জানান, “বাবর সাহেব, এটা রেকর্ড করা যাবে না।” বেনজিরও তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এফবি, আমি কি তোমাকে নোট নিতে বলেছিলাম?” এরপর ফারহাতুল্লাহ নোটবুকটা ভাঁজ করে কলমটা পকেটে রেখে দেন।

তিনি বইয়ে সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ইতিহাসের ভার শুধু খাতা ভাঁজ করে কলমটা পকেটে রাখলেই ঝেড়ে ফেলা যায় না। উচ্চারিত কথাগুলো এতটাই ভারী আর তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে, স্মৃতি থেকে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

২৬ ডিসেম্বর রাতে বেনজির ভুট্টো পেশোয়ার থেকে ইসলামাবাদ ফিরে আসেন। বইয়ের লেখক ফারহাতুল্লাহ বাবরও তার সফরসঙ্গী ছিলেন। জারদরি হাউস থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বেনজির তাকে পরদিন সেখানে আসতে বললেন, যাতে তারা এক সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকতবাগের জনসভায় যেতে পারেন।

এর পর ফারহাতুল্লাহ লিখেছেন, সেই জনসভায় যাওয়াই তার শেষ যাত্রা ছিল–এটা কেউ ভাবেননি। জনসভার আগে বেনজির হোটেল সেরেনায় আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। এর পর তিনি তার বুলেট প্রুফ ল্যান্ড ক্রুজারে উঠে বসেন। সঙ্গে ছিলেন তার রাজনৈতিক সচিব মাখদুম আমিন ফাহিম ও নিরাপত্তা রক্ষীরা। ফারহাতুল্লাহসহ কয়েকজন ছিলেন মার্সিডিসে।

লিয়াকতবাগের গেট দিয়ে কেবল বেনজিরের ল্যান্ড ক্রুজার ও মারসিডিস প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। জনসভায় তিনি উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি ওয়াদা করেন, তিনি সোয়াতের বিভিন্ন সরকারি অফিসে নামিয়ে ফেলা জাতীয় পাতাকা ফের উত্তোলন করবেন। বেনজির বলেন, এর সঙ্গে পাকিস্তানের জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত। তার জীবনের ওপর হুমকি থাকা সত্ত্বেও উগ্রন্থীদের কাছে নতিস্বীকার করবেন না।

বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর বেনজির ফের ল্যান্ডক্রুজারে উঠে ইসলামাবাদের উদ্দেশে মারী রোডে প্রবেশ করেন। চারিদিকে জনতার প্রচণ্ড ভিড় ও স্লোগান। তারা বেনজিরকে বহনকারী ল্যান্ডক্রুজারটি জারদারি হাউসে না গিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হয়। সেটাই ছিল বেনজিরের শেষ যাত্রা।

ফারহাতুল্লাহ সে দিনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এভাবেই একজন নেতা বিদায় নিলেন, পুরো জাতি শোকাহত ও কান্না ভারাক্রান্ত হলো। আর এটি ছিল সেদিন, যেদিন বুলেটবিদ্ধ হলো গণতন্ত্র।

লেখক: সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত