Advertisement Banner

ভারতের রাজ্যে রাজ্যে তারা, তবুও প্রশ্ন, ‘বিজেপি কোথায়?’

ভারতের রাজ্যে রাজ্যে তারা, তবুও প্রশ্ন, ‘বিজেপি কোথায়?’
ফল ঘোষণার পর বিজেপি সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ভূমিধ্বস বিজয়ের পর থেকে প্রশ্নটা আরও তীব্র হচ্ছে–‘বিজেপি কোথায়?’ পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতকে কংগ্রেস মুক্ত করার পর প্রশ্নটা আরও বাড়ছে– ‘কোথায় বিজেপি?’ উত্তরটাও লুকিয়ে রয়েছে আদি বা আসলি বনাম নব্য বা তৎকাল বিজেপির দ্বন্দ্বে। সেই দ্বন্দ্বকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়েই তৎকাল বা নব্য নেতাদের থেকেই শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব।

এই নিয়ে মৃদু গুঞ্জন চলতে থাকলেও দলের লাগাম কিন্তু বহু রাজ্যে দলবদলুদের হাতেই থাকছে। আদি বা বহুকাল ধরে যারা বিজেপি করছেন, তাদের প্রশ্ন, এতকিছু করে পেলাম কী? আর দলবদলুদের পাল্টা প্রশ্ন, এতকাল কোথায় ছিলেন? পেরেছেন সরকার গড়তে? সাফল্যই সব বিতর্ককে ধামাচাপা দেয়। এক্ষেত্রেও নির্বাচনী সাফল্যে সব ক্ষোভ-বিক্ষোভ ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে।

পূর্ব ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ বা ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স শাসিত ১১টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র একটির মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির ঘরের ছেলে। তিনি উড়িশ্যার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। বাকিরা সবাই দলবদলু। গোটা দেশের দিকে যদি তাকান গোটা দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টি রাজ্যে বিজেপি একক শক্তিতে ক্ষমতায় রয়েছে। আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে মাত্র তিনটিতে বর্তমানে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে দুটিতে রয়েছে এনডিএ। একক ক্ষমতায় বিজেপি শাসিত ১৪ রাজ্যের মধ্যে ছয়টিতেই মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন দলবদলুরা। এই ছয়টি রাজ্য হলো আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মণিপুর, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ। অর্থাৎ পূর্ব এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের প্রায় সকলেই দলবদলু।

প্রথমেই আসা যাক বিহারে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। আর ২০১৮ সালেই হয়ে ওঠেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি। তিনি আগে জনতা দল ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)। তারপর সেখান থেকেই বিজেপি। বহু বিতর্ক রয়েছে তাকে নিয়ে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি রয়েছে একাধিক খুনের অভিযোগ। শুধু অভিযোগই নয়, খুনের অপরাধে আদালতে শাস্তিও হয়েছিল তার। কিন্তু নিজেকে নাবালক প্রমাণ করে ছাড় পান তিনি। এখন তিনি নিজেকে বিজেপির পছন্দের মানুষ হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন।

অসমে দ্বিতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। শপথ তার কাছে নতুন কিছু নয়। কারণ রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে একাধিকবার তিনি পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তারও আগে সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন আসাম গণ পরিষদেও। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস ছেড়ে ২০১৬–তে বিজেপিতে যোগদান। তারপর ২০১৬ সালে বিজেপির সর্বানন্দ সোনোয়ালের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসাবে জায়গা করে নেন তিনি। ২০২১ এবং ২০২৬ সালে তিনিই আসামে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, অন্য রাজ্যেও বিজেপি নেতা হিসেবে তার কদর এখন অনেক।

এক সময় কংগ্রেস করলেও এখন তিনি বিজেপির অন্য নেতাদের টেক্কা দিচ্ছেন মুসলিম বিদ্বেষে। চালাচ্ছেন বুলডোজারও। এনকাউন্টারেও বিশেষ পারদর্শী হিমন্তের পুলিশ।

কথায় আছে, কেন্দ্রে যেই সরকারে থাকে অরুণাচল প্রদেশের সরকারও তারই হয়! ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির সরকার হতেই গণেশ উল্টায় অরুণাচলে। অকাল প্রয়াত কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী দোর্জি খান্ডুর ছেলে পেমা খান্ডু মন্ত্রী-সান্ত্রীদের নিয়ে সদলবলে যোগ দেন বিজেপিতে। সেই থেকে সেখানে বিজেপিরই সরকার। অনেকটা একই ছবি মণিপুরেও। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং এক সময় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সুবিধে হয়নি বিশেষ। তাই বিজেপিতে। তার পূর্বসূরী এন বীরেন সিং তো রীতিমতো কংগ্রেসি মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিলেন। ভোটের আগে দল বদলিয়ে বিজেপি। তার হাত ধরে অনেকেই কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি হয়েছেন।

ত্রিপুরাতে ২০১৮ সালে ঘরের ছেলে বিপ্লবকুমার দেবকেই মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গঠন করেছিল বিজেপি। তবে তার মন্ত্রিসভা এবং পরিষদীয় দলের প্রায় সকলেই ছিলেন দলবদলু কংগ্রেসি। ত্রিপুরাকে কংগ্রেস মুক্ত করতে গিয়ে বিজেপি দলটাই হয়ে ওঠে কংগ্রেসময়। শুধু মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিজেপির ঘরের ছেলে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ২০২২ সালে মাঝ পথে ঘরের ছেলেকেও গদি ছাড়তে হয়। মুখ্যমন্ত্রী হন সাবেক কংগ্রেসি ডা. মাণিক সাহা। তিনিই এখনো ত্রিপুরায় দলের প্রধান মুখ।

বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ ক্ষমতায় আছে উত্তর পূর্বাঞ্চলের নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজোরাম ও সিকিমে। ছোট্ট রাজ্য সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং। তিনি পি এস গোলে নামেও পরিচিত। তিনিও দলবদলু। আগে সিকিম ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট করতেন। এখন সিকিম ক্রান্তিকারি মোর্চা। নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেফু রিও আগে কংগ্রেসেরও মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা কংগ্রেসি পরিবারেই বড় হয়েছেন। তার বাবা পি এ সাংমা কংগ্রেসের কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদ লোকসভার স্পিকার ছিলেন। মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালডুহামাও ছিলেন কংগ্রেসে। ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের সাবেক সদস্য লালডুহামা মিজোরাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। এছাড়াও এনডিএ শাসিত দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে একজন সাবেক কংগ্রেসি। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা বিজেপির ঘরের মেয়ে হলেও পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী এন রঙ্গস্বামী আগে কংগ্রেসেরও মন্ত্রী ছিলেন।

এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গে। শুভেন্দু অধিকারী ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তার আগে তিনি তৃণমূলের প্রথমসারির নেতা ছিলেন। ছিলেন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। লোকসভার সদস্য। তার বাবা শিশির অধিকারীও মমতা ব্যানার্জির সৌজন্যে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে নারদা মামলা নামে পরিচিত স্টিং অপারেশনে তাকে ঘুষ নিতে দেখা গিয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গে এক সময় তৃণমূলের যুব সভাপতিও ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তার অভিযোগ মূলত মমতা ব্যানার্জির ভাইপো, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে। বিজেপিতে গিয়ে প্রচারে আরও ঝড় তোলেন।

মমতার দলে যোগদানের আগে তিনিও কংগ্রেস করতেন। কিন্তু তৃণমূলে গিয়ে তিনি রাজ্য রাজনীতির প্রথম সারিতে উঠে আসেন। গতবারের নির্বাচনে মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে মমতা ব্যানার্জিকে হারিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদেরও নজরে পড়েন। আর এবার ভবানীপুরে নিজের গড়ে শুভেন্দুর কাছে পরাস্ত হন মমতা। ফলে আর তাকে পায় কে! বিজেপি নেতারা তাকেই বেছে নেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। আর তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েই আরও জোরে সনাতন ধর্মের প্রচারে গলা ফাটাচ্ছেন বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতাদের সুরে।

অন্যদিকে, ঘরের ছেলেদের ধরে রাখতে না পেরে কংগ্রেস ধুঁকছে। ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে কংগ্রেস রয়েছে মাত্র চারটি রাজ্যে। হিমাচল প্রদেশ, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা ও কেরলমে। এছাড়া জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ঝাড়খন্ড এবং তামিলনাডুতে নামমাত্র শক্তি নিয়ে সরকারি জোটে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন দলটি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আপ রয়েছে শুধুমাত্র পাঞ্জাবে। দলবদল থেকে শুরু করে নির্বাচনে দলীয় সংগঠনকে যেভাবে বিজেপি ব্যবহার করতে শুরু করেছে তাতে করে অদূর ভবিষ্যতেও কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকেই উদাহরণ হিসাবে ধরে নিলে বোঝা যাবে বিজেপি ভোটে জিততে কতোটা মরিয়া এবং আগ্রাসী। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই একাধিক সভা করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে প্রচার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়াও বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা চষে বেড়িয়েছেন গোটা রাজ্য। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নামমাত্র প্রচারেই দায় সেরেছেন। পশ্চিমবঙ্গ বাদ দিলেও অন্য রাজ্যেও কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বা প্রচারের জৌলুস বিজেপির তুলনায় নিমিত্ত মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে দেখা গিয়েছে, সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পুলিশ বা প্রশাসনে বিন্দুমাত্র পক্ষপাত দেখলেই কড়া ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করেছেন বিজেপি নেতারা। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী থেকে শুরু করে নির্বাচনের তিন মাস আগে থেকেই প্রচারে ঝড় তোলার যে মুন্সিয়ানা বিজেপি দেখিয়েছে তার সঙ্গে পেরে ওঠা অন্য কোনো দলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সঙ্গে রয়েছে বিপুল পরিমান অর্থবল। এর সঙ্গে পেরে ওঠা কংগ্রেসের কম্মো নয়। আর সেটা বুঝেই ডুবন্ত জাহাজ থেকে একে একে বিজেপির বিলাসবহুল নিশ্চিন্ত জাহাজে সওয়ার হচ্ছেন কংগ্রেসের নেতারা। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে দলবদলুদের খাতির করতে কসুর করছেন না বিজেপির শীর্ষ নেতারাও। ফলে বিরোধীদের রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার নয়।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)।

সম্পর্কিত