Advertisement Banner

মে দিবসেই বোমায় প্রাণ হারিয়েছিলেন এক রাষ্ট্রনায়ক

মে দিবসেই বোমায় প্রাণ হারিয়েছিলেন এক রাষ্ট্রনায়ক
বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রনায়ক রানাসিংহে প্রেমাদাসা। ছবি: উইকিপিডিয়া কমনস

মে দিবস ছিল সেদিন! সালটা ১৯৯৩!

ছুটির দিন। ঠিক দুপুরের দিকে একটা সংবাদ বিমূঢ় করে দিল বাংলাদেশের মানুষকে। কলম্বোতে মে দিবসের মিছিলে হাঁটতে গিয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন শ্রীলঙ্কার সে সময়ের প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা।

সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন বিবিসির সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিল। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখা যেত বিবিসির অনুষ্ঠানমালা। স্যাটেলাইট টিভি দুনিয়াব্যাপী সহজলভ্য হলেও বাংলাদেশে সেটা তখনও সহজলভ্য নয়। ঘরে ঘরে কেবল টিভির দাপট তখনও সেভাবে শুরু হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে বিবিসির অনুষ্ঠান দেখে। বিবিসির খবরে চোখ রাখে। ১৯৯৩ সালের মে দিবসের ছুটির দিন সবাই বিবিসির খবরগুলোয় চোখ রেখেছিল বাড়তি আগ্রহ নিয়ে, মন খারাপ করেই।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা বাংলাদেশে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর এক মাস আগেই তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় হয়েছিল সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। সেই সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তার বক্তৃতার একটা অংশে বাংলায় কথা বলেছিলেন। তিনি বক্তৃতায় একটু বাংলা বলবেন, সে জন্য সঙ্গে করে টেলিপ্রম্পটার নিয়ে এসেছিলেন। এ সবই ছিল বাংলাদেশের মানুষকে একটু আনন্দ দিতে, বাংলাদেশের মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন বলেই। তার ভাঙা ভাঙা বাংলা বাংলাদেশের মানুষ খুব আগ্রহ ও আবেগের সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল।

যে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনটা ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়, সেটি আসলে হওয়ার কথা ছিল ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু সেবার ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় হিন্দুত্ববাদীদের হাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার কারণে গোটা উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সার্ক সম্মেলনের সব আয়োজন সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সেটি স্থগিত হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও ঢাকা আসতে পারেননি। কিন্তু বাংলাদেশের আয়োজনের প্রতি নিজের সহানুভূতি প্রকাশ করতে সার্ক সম্মেলন না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এসেছিলেন প্রেমাদাসা। অনেকটাই যেন বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর মতো করেই।

বাংলাদেশে এসেছিলেন প্রেমাদাসা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে এসেছিলেন প্রেমাদাসা। ছবি: সংগৃহীত

সবকিছু মিলিয়ে প্রেমাদাসার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষকে ব্যথিত করেছিল। শোকগ্রস্ত করেছিল। শ্রীলঙ্কার অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন প্রেমাদাসা। কিন্তু তাকে সেদিন হত্যা করেছিল কারা?

শ্রীলঙ্কায় তখনও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। আশির দশকের শুরুতে সিংহলী ও তামিলদের জাতিগত বিবাদ গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। স্বাধীন তামিল রাষ্ট্রের জন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী এলটিটিই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে। এই এলটিটিই–ই ১৯৯১ সালে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের সময় আত্মঘাতী হামলায় হত্যা করেছিল ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে।

প্রেমাদাসার সঙ্গে সেদিন নিহত হয়েছিলেন আরও ২৩ জন। ঘটনাটি ঘটে কলম্বো শহরের একেবারে মধ্যভাগে। তিনি সেদিন একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ওই হামলায় যে ব্যক্তি আত্মঘাতী হয়েছিল, তাকেও পরে চিহ্নিত করা হয়। তার নাম ছিল কুলবীরসিঙ্গম বীর কুমার। সেই ব্যক্তি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়ে যেকোনোভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত এক কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্বও করতে পেরেছিলেন।

শক্তিশালী সেই বিস্ফোরণে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের দেহ হয়ে গিয়েছিল ছিন্নভিন্ন। প্রেমাদাসার মৃতদেহ শনাক্ত হয়েছিল দেহের খণ্ডাংশে থাকা আংটি ও ঘড়ি দেখে। আত্মঘাতী বোমা হামলার পর কয়েক ঘণ্টা প্রেমাদাসার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়নি।

১৯৯৩ সালে মে দিবসের ওই শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল প্রেমাদাসার রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)। বেলা পৌনে ১টার দিকে শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি নিজেই। এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে এক মোটরবাইক আরোহী। শরীরেই তার বাঁধা ছিল শক্তিশালী বোমা। প্রেমাদাসার কাছাকাছি এসে সেই বোমায় বিস্ফোরণ ঘটায় আততায়ী। নিমেষেই সব শেষ।

শ্রীলঙ্কার অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন প্রেমাদাসা। ছবি: সংগৃহীত
শ্রীলঙ্কার অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন প্রেমাদাসা। ছবি: সংগৃহীত

রানাসিংহে প্রেমাদাসার জন্ম ১৯২৪ সালের ২৩ জুন কলম্বোর বস্তিতে। রিকশা ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতেন তার বাবা। ছেলেবেলাতেই তিনি অংশ নিয়েছিলেন শ্রমিক অধিকার আন্দোলনে। ১৯৪৬ সালে তিনি একজন পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন লেবার পার্টিতে। মাত্র চার বছরের মাথায় তিনি দলটির যুব সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫০ ও ১৯৫৪ সালে দুই দফায় কলম্বোর পৌর কাউন্সিল নির্বাচিত হন প্রেমাদাসা। পরে ১৯৫৫ সালে কলম্বোর ডেপুটি মেয়র পদে বসেন তিনি।

১৯৫৬ সালে লেবার পার্টি ছেড়ে ইউএনপিতে যোগ দেন প্রেমাদাসা। এই দলের হাত ধরেই একটু একটু করে আরও সামনে এগোন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর পরের বছরই বসেন প্রেসিডেন্টের গদিতে। রাজনৈতিক জীবনে এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কোনো ‘গডফাদার’ ছিল না প্রেমাদাসার। এমনকি শ্রীলঙ্কার অনেক রাজনীতিবিদের মতো শক্তিশালী পারিবারিক সমর্থনও ছিল না তার। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনীতিক।

প্রেমাদাসার মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের শ্রদ্ধা পৌঁছে দিয়েছিলেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

সম্পর্কিত