ইউক্রেন অতিরিক্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, আর পশ্চিমা বিশ্ব ভণ্ডামিতে আচ্ছন্ন

তারিক সিরিল আমার
তারিক সিরিল আমার
ইউক্রেন অতিরিক্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, আর পশ্চিমা বিশ্ব ভণ্ডামিতে আচ্ছন্ন
পলিটিকো পত্রিকা লক্ষ্য করেছে, ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সম্প্রতি দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। এতে ইউক্রেনের প্রার্থী ইমেজ ‘ইউরোপীয় কমিশনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

অনেক, অনেক আগে–আবার যেন ঠিক গতকালের কথাই, ইউক্রেনীয়দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল- তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের এক প্রক্সি বা ছায়া যুদ্ধে যথেষ্ট রক্ত ঝরালে ন্যাটোর সদস্যপদ পাবে। এখন সেই প্রতিশ্রুতির কথা তোলা প্রায় অভদ্রতার মতো মনে করা হয়। কারণ বাস্তবে পশ্চিমা বিশ্ব সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। অথচ তারা ইউক্রেনীয়দের অনুরোধ করছে যেন তারা মরতে থাকে–আরও কিছু বছর, অন্তত পশ্চিমের স্বার্থ রক্ষায় যতদিন প্রয়োজন হয়।

বিষয়টা একটু ভেবে দেখা যাক, দীর্ঘ এক যৌথ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষাগত ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি রুশ ও ইউক্রেনীয়দের মধ্যে আরেকটি মিলও রয়েছে– ন্যাটো তাদের উভয়কেই নির্লজ্জভাবে প্রতারণা করেছে। মস্কোকে প্রতারিত করা হয়েছিল ন্যাটো সম্প্রসারণ নিয়ে, অর্থাৎ যা ঘটার কথা ছিল না অথচ ঘটেছে। আর কিয়েভকে প্রতারিত করা হয়েছে সদস্যপদ নিয়ে, যা হওয়ার কথা ছিল অথচ হয়নি। পশ্চিমাদের সম্পর্কে আপনি যা-ই বলুন না কেন, মাঝে মাঝে তাদের প্রতারণার মধ্যেও এক ধরনের প্রায় শৈল্পিক সামঞ্জস্য দেখা যায়।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার পার্থক্য হলো–রাশিয়া ইতিমধ্যেই শিখে গেছে: আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়বে না, বরং জোরালোভাবে প্রতিরোধ করবে। কখনো কখনো সত্য বলার একমাত্র উপায়ই হলো কিছুটা রূঢ় হওয়া। আর ইউক্রেনকে দেওয়া ন্যাটো সদস্যপদের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ না করলে, এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কিয়েভের মধ্যে যা ঘটছে, তা বোঝা সম্ভব নয়।

না, আমরা এখানে ইউক্রেনের প্রক্সি বা ছায়া যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে আরও অর্থ ঢালার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানান অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক পরিকল্পনার কথা বলছি না। যেমন, আটক করা রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে অর্থ জোগাড়ের অদ্ভুত কৌশল, যার শেষ পরিণতি হবে ইইউ নাগরিকদের করের অর্থে সেই ক্ষতি পূরণ করা। অথবা আরও সরাসরি খুলে বললে, এটা আসলে ঋণ পরিকল্পনা। কারণ এই অর্থের বোঝা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় করদাতাদের ঘাড়েই পড়বে। এসব তথ্য এখন গোপনে ফাঁস হচ্ছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে আলোচনায় আনা হচ্ছে।

আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, কিয়েভ কেবল ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ইউরো বা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাজেট ঘাটতির মুখে পড়বে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, কিয়েভ কেবল ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ইউরো বা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাজেট ঘাটতির মুখে পড়বে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

অবশ্যই, অর্থ প্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, কিয়েভ কেবল ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ইউরো বা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাজেট ঘাটতির মুখে পড়বে। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুদ্ধোত্তর (যে সময়ই হোক) ইউক্রেনের পুনর্গঠনের খরচ ধরেছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি ইউরো এবং তা আরও বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু এসব অর্থ ধীরে ধীরে খরচ হয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছে।

তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আরেকটি দিকও আছে। তারা ইউক্রেনীয়দের সামনে এক ধরনের ‘স্বপ্নরাজ্য’ তুলে ধরেছিল। এটা এমন এক কৃত্রিম কল্পরাজ্য, যা ইউক্রেনীয়দের পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জন্য লড়াই করতে প্রলুব্ধ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, ন্যাটোর সীমাহীন সম্প্রসারণের পাশাপাশি, ইউক্রেনের বর্তমান বিপর্যয়ের অন্যতম মূল কারণ ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের এই আশাবাদ। ইইউ ২০১৩-১৪ সালে কিয়েভের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতা চুক্তিতে রাজি হতে অস্বীকার করেছিল, যা ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ দিত। সেই অস্বীকৃতিই সংকটের সূচনা করে, যা ক্রমে এমন এক যুদ্ধের দিকে গড়িয়েছে, যে যুদ্ধে আজ ইউক্রেন পরাজয়ের মুখে।

এদিকে কিয়েভকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য আবারও এক নতুন ভবিষ্যৎ ও পুরস্কারের লোভ দেখানো হয়েছে। আর সেটা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ। ২০২২ সালের জুন থেকে ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এটাও অনেকটা ঠিক ন্যাটো সদস্যপদের প্রতিশ্রুতির মতোই। ন্যাটোর সদস্য পদের বিষয়টি এখন কার্যত ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। তাই ইইউ-র পূর্ণ সদস্যপদের প্রতিশ্রুতিটি ইউক্রেনের যুদ্ধের সামনে নতুন মুলা হিসেবে ঝুলছে।

এ প্রতিশ্রুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য একটি পরীক্ষাই যথেষ্ট। ২০২১ সালের শেষ দিকে মস্কো এমন এক সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ২০২২ সালের যুদ্ধ ঠেকাতে পারত। কিন্তু পশ্চিমারা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। এখন কল্পনা করুন, যদি সেই সময় পশ্চিমারা ঘোষণা করত যে, ইউক্রেন ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে না–না আজ, না আগামীকাল, তাহলে কিয়েভে কী ঘটত?

ওই সময়ে সেটা হলে জেলেনস্কির শাসনকেও বাস্তবতার স্বাদ পেতে হতো। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করত দেশটি। পাশাপাশি যুদ্ধ এড়ানো যেত। অবশ্য তার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের কোনো পুরস্কারই ছিল না।

সেতুর নিচে প্রবাহিত হচ্ছে পানি বা রক্ত– এটা সত্যি। তবে এই প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা যায় না কেন ইউরোপীয় কমিশন এবং কিয়েভের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা এত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও পশ্চিমা মূল ধারার গণমাধ্যমে এটি যথেষ্ট হদিস দেওয়া হয় না।

ইউরোপীয় কমিশন সম্প্রতি ‘ইউক্রেন ২০২৪ রিপোর্ট’ প্রকাশ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে, এটি ‘কমিশন স্টাফ ওয়ার্কিং ডকুমেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপিত, যা ইউরোপীয় কমিশনার মার্টা কোস-এর অধীনে ‘ডিরেক্টরেট-জেনারেল ফর এঙ্গলারমেন্ট অ্যান্ড দ্য ইস্টার্ন নেইবারহুড’ দ্বারা প্রস্তুত। এটিকে একটি টেকনিক্যাল বা ব্যুরোক্র্যাটিক হিসাবনিকাশের কাগজপত্র মনে হতে পারে। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত: এটি স্পষ্টত একটি রাজনৈতিক দলিল। আর এটাই মূল সমস্যা।

পলিটিকো পত্রিকা লক্ষ্য করেছে, ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সম্প্রতি দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। এতে ইউক্রেনের প্রার্থী ইমেজ ‘ইউরোপীয় কমিশনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে। এই আত্ম-সৃষ্ট, কার্যত ব্যর্থতাই প্রতিফলিত হয়েছে প্রতিবেদনে, যেখানে ‘মজবুত এবং স্বতন্ত্র দুর্নীতি বিরোধী কাঠামো’ রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সমালোচনা থেকে দ্বিতীয় ইঙ্গিতটি পেয়ে গেছেন জেলেনস্কি। ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভায় ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণের সময় তার অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং অপ্রতুল প্রতিক্রিয়া দেখানোয় এই সমালোচনা হয়েছে। জেলেনস্কিকে তার নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে রাখার নিশ্চয়তা দিচ্ছে শতকোটি ইউরোর সাহায্য। অথচ তিনি জোর দিয়েছেন যে ইউক্রেনকে শুরু থেকেই ইইউ-র পূর্ণ সদস্যপদ নিশ্চিত করতে হবে, তার চেয়ে কম হলে চলবে না।

জেলেনস্কি নিজের কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। এমনকি বর্তমান ইইউ-র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের: বিশেষত হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ থামাতে পারছেন না। জেলেনস্কি মনে করছেন, ওরবানের কাছে ইউক্রেনের প্রতি কোনো সমর্থনের দায় আছে। কারণ ওরবান ইতিমধ্যেই দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন: তিনি মনে করেন, ইউক্রেনকে ইইউ-তে অন্তর্ভুক্ত করা মানে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়া। বাস্তবে, বুদাপেস্টের ইউক্রেনের প্রতি কোনো দায় নেই।

মনে হচ্ছে, জেলেনস্কি অনেক কিছু ভুলে গেছেন এবং কিছুই শিখতে পারেননি। তিনি ভুলে গেছেন যে তার দেশ একবার ন্যাটোর সদস্যপদ সংক্রান্ত ভঙ্গুর এবং অতি প্রশংসাপূর্ণ পশ্চিমা প্রতিশ্রুতির স্বাদ পেয়েছে এবং সেটি কীভাবে শেষ হয়েছে। আর তিনি সেই সহজ শিক্ষা নিতে পারছেন না, যা তিনি নিশ্চয়ই সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারতেন। জেলেনস্কির অহংকারী দাবি এবং আরও কুৎসিত সমালোচনা কোনো ধরনের সুপারপাওয়ার হতে পারেনি। এটি আগেও ব্যর্থ হয়েছিল; আবারও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে প্রকাশিত)

তারিক সিরিল আমার: জার্মান ইতিহাসবিদ, বর্তমানে ইস্তাম্বুলের কোচ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তার গবেষণার ক্ষেত্র রাশিয়া, ইউক্রেন ও পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক শীতল যুদ্ধ এবং স্মৃতির রাজনীতি।

সম্পর্কিত