গাজার জন্য ধারাবাহিক চুক্তি দরকার?

আমির হামজাওয়ি
আমির হামজাওয়ি
গাজার জন্য ধারাবাহিক চুক্তি দরকার?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বিষয়ে নিয়ে গত ৯ অক্টোবর মিশরে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি নিয়ে বিশ্ব নেতারা যখন আলোচনা করছেন, তখন অনেকেই এই চুক্তির পর্যায়ক্রমিক কাঠামো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে যে প্রাথমিক পর্যায় চলছে, তাতে গাজা থেকে ইসরায়েলিদের আংশিক বা সীমিত প্রত্যাহার এবং হামাসের হাতে থাকা অবশিষ্ট ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা এবং এই অঞ্চলে নিরাপত্তা দেবে যে বাহিনী, সে সংক্রান্ত গভীর সমস্যাগুলো পরবর্তী পর্যায়গুলোর জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শুরুতে পুরোপুরি সমাধান না করার অর্থই হলো, এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

তবে ট্রাম্প পরিকল্পনার ধাপে ধাপে এগোনোর এই কৌশলটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকট-কূটনীতির প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। বরং, এই অঞ্চলে সংঘাত অবসানের জন্য বহু দশক ধরে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই পদ্ধতি তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনের সংকটই মোকাবিলা করে। প্রকৃতপক্ষে, ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি এই কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সমাপ্তি টানা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং ১৯৭৯ সালের মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি। এই দুটি ক্ষেত্রেই, প্রাথমিক চুক্তির পর বাস্তবায়নের পর্যায় শুরু হয়েছিল। চুক্তি কার্যকর ও মেনে চলা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সংহত করতে এই পর্যায়গুলোতে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হয়েছিল।

ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিগুলো নিয়ে করা এক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, সঠিক পরিবেশ থাকলে, পর্যায়ক্রমিক চুক্তিগুলো কেবল কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোকেই মোকাবিলা করে না, সেই সাথে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন এবং আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। এভাবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোনো যায়। তবে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার আসল চ্যালেঞ্জের পর্যায়ক্রমিক কাঠামো নয়। বরং, প্রধান প্রশ্নটি হলো, ওয়াশিংটন এবং তার আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদাররা কি এমন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসমূহ, প্রণোদনা এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারবে, যাতে এই পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো সফল হয়?

সীমিত লক্ষ্য, বৃহত্তর স্থায়িত্ব

পর্যায়ক্রমিক শান্তিচুক্তিগুলোর মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল এবং মিশর, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার মধ্যে হওয়া ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোর কথা ধরা যাক।

এগুলো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি মীমাংসা ছিল না, বরং এগুলো ছিল কেবল যুদ্ধ থামানোর এবং ইসরায়েলের কার্যত সীমানা বা ‘গ্রিন লাইন’ প্রতিষ্ঠা করার একটি ব্যবস্থা। এই চুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানোর জন্য একটি পরিসর তৈরি করা, যাতে বৃহত্তর কূটনৈতিক ব্যবস্থার একটি ভিত্তি স্থাপন করা যায়।

তবে এই চুক্তিগুলোতে কিছু ব্যবহারিক প্রক্রিয়ও ছিল, যেমন মাঠ কমিটি, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধান, বন্দি বিনিময়ের নিয়ম এবং মানবিক সহায়তার বিধান।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছিল। অভ্যন্তরীণ চাপ এবং বহিরাগত নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে এই কাঠামো হয় বিকশিত হতে পারত, নয়তো ভেঙে পড়তে পারত।

১৯৪৯ সালের চুক্তিগুলো ইসরায়েল এবং তার আরব প্রতিবেশিদের মধ্যে একটি আপেক্ষিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট, যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণের পর ফ্রান্স, ইসরায়েল এবং যুক্তরাজ্য মিশর আক্রমণ করে।

এই চুক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের কারণ ছিল এগুলি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিল এবং মিশর-ইসরায়েল সীমান্তে নিয়োজিত একটি শান্তিবাহিনীসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশন এই চুক্তির শর্তগুলো দেখভাল করেছিল।

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পরে পর্যায়ক্রমিক চুক্তিগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সময়ে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাগুলো দ্রুত এবং আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের হাতে চালিত ‘শাটল কূটনীতি’র ফলস্বরূপ ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে, এবং পরে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একের পর এক বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এই চুক্তিগুলোর প্রত্যেকটি সামরিক দিক থেকে সীমিত ছিল। এগুলিতে কেবল সেনা প্রত্যাহার, নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল তৈরি এবং যোগাযোগের পথ খুলে দেওয়া ও বন্দি বিনিময়ের মতো পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই অগ্রগতিগুলি যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের জন্য একটি সামগ্রিক মীমাংসায় পৌঁছানোর মাধ্যমে অর্জিত হয়নি, বরং চুক্তিগুলোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং কারিগরি প্রয়োগের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।

ইসরায়েল ও মিশরের ক্ষেত্রে, বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তিগুলো পরবর্তী শান্তি আলোচনার ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা ১৯৭৯ সালের মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তিটি ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে দুই পক্ষের আলোচনার একটি মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য মাদ্রিদ শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বর্তমানে এই চুক্তিটিই আবার ইসরায়েলি সরকার ও দামেস্কের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এই প্রত্যেকটা ঘটনায়/চুক্তির ক্ষেত্রেই দেখা যায় যেকোনো চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা থামিয়ে দেয়নি। যেহেতু মার্কিন কর্মকর্তারা এই চুক্তিগুলির সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং জানতেন যে এর সাথে আমেরিকার প্রভাব জড়িয়ে আছে, তাই চুক্তিগুলো যেন ভেঙে না পড়ে এবং পরবর্তী পর্যায়ে শক্তিশালী হতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য ওয়াশিংটন আলোচনা দল, কূটনৈতিক চাপ এবং সহায়তা বা নিরাপত্তা প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল।

ইসরায়েল-হামাস শান্তিচুক্তিটিও এই আলোকেই দেখা যেতে পারে-চুক্তিটির খসড়া তৈরি ও ঘোষণায় ট্রাম্প প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য সংশ্লিষ্টতা ও নেতৃত্ব থাকার কারণে এই সম্ভাবনা বেড়ে যায় যে, প্রথম ধাপটি যেন পরবর্তী ধাপগুলোতেও টেকসই অগ্রগতি আনতে পারে, তা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে।

প্রতীকী ছবি: এই দিয়ে তৈরি
প্রতীকী ছবি: এই দিয়ে তৈরি

শান্তির ধীর পথ

পর্যায়ক্রমিক চুক্তিগুলো বড় ধরনের সাফল্যের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাক্ষরিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তিগুলোর মধ্যে ছিল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি যা সরাসরি মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির জন্ম দিয়েছিল।

এই চুক্তিগুলি সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেনি। বরং, এগুলি দুটি কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তাব করেছিল। এর একটি ছিল ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে শান্তির জন্য এবং অন্যটি ছিল ফিলিস্তিন প্রশ্ন সমাধানের জন্য, যা পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের স্ব-শাসনের জন্য ভবিষ্যতে আলোচনার মঞ্চ তৈরি করে।

যদিও ফিলিস্তিন সংক্রান্ত দ্বিতীয় কাঠামোটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এই দুটি পথকে আলাদা করার মাধ্যমে চুক্তিগুলি উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ কমিয়ে দেয় এবং শান্তি চুক্তিটিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তিগুলো সহজ করতে, উভয় দেশকে সহায়তা প্রদান করতে এবং দলগুলোর চুক্তি মানা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গীকার ছিল। ক্যাম্প ডেভিডের আলোচনার পর যে চুক্তিটি হয়েছিল, সেটিও উল্লেখযোগ্যভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা শুরু হয়েছিল ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহার এবং ভূখণ্ড বিনিময়ের মাধ্যমে।

এই চুক্তিতে আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতা কেবল চুক্তি সই হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চুক্তি মানতে উৎসাহিত করতে ওয়াশিংটন শুধু কূটনৈতিক সহায়তা নয়, বরং উভয় পক্ষকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তাও দিয়েছিল। মার্কিন সৈন্যরাও সীমান্তে একটি বহুজাতিক শান্তিবাহিনীতে অংশ নিয়েছিল।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর মিশর ও ইসরায়েলের ঘটনা প্রমাণ করে যে যখন পর্যায়ক্রমিক চুক্তিগুলোকে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়-যার মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনী বা পর্যবেক্ষণকারী দলের মোতায়েন অন্তর্ভুক্ত, তখন প্রাথমিক উত্তেজনা প্রশমন ও স্থিতিশীলতা একটি বৃহত্তর ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। আজ, মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যেকার শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।

সফল পর্যায়ক্রমিক কূটনীতির আরেকটি উদাহরণ হলো ১৯৯৪ সালের ইসরায়েল ও জর্ডানের মধ্যে হওয়া ওয়াদি আরাবা চুক্তি। মিশর-ইসরায়েল চুক্তির মতোই এটিও একবারে সম্পন্ন না হয়ে পরপর কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই ধাপগুলোর মধ্যে ছিল সীমানা চিহ্নিতকরণ, উভয় পক্ষের যৌথ সীমান্ত বরাবর সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি হ্রাস, জর্ডান ও ইয়ারমুক নদী এবং আরাবা অঞ্চলে পানি-বণ্টনের ব্যবস্থা, একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পর্যায়ক্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির স্বাক্ষরের সময় জামিনদার হিসেবে এবং উভয় পক্ষকে চলমান নিশ্চয়তা ও প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। ওয়াদি আরাবা চুক্তির সফলতা ছিল আপেক্ষিক। পানি-বণ্টন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো কিছু ক্ষেত্রে এর সফলতা খুব বেশি ছিল না। তবে সামগ্রিকভাবে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো যখন দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী ধাপগুলোর স্পষ্ট বিন্যাস দ্বারা সমর্থিত হয়, তখন তা খুব জটিল সংঘাত নিরসনের জন্য একটি টেকসই সমাধানে পরিণত হতে পারে।

তবে সমস্ত পর্যায়ক্রমিক চুক্তিই যে সফল হয়েছে এমন নয়। অসলো চুক্তির কথাই ধরা যাক। ১৯৯৩ সালে যখন ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তখন লক্ষ্য ছিল স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বহুধাপের পরিকল্পনা তৈরি করা।

পারস্পরিক স্বীকৃতির পরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় আসার কথা ছিল, যেখানে নবগঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীর ও গাজা শাসন করবে, এবং ফিলিস্তিনিদের বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে ইসরায়েলি সেনারা নতুন করে মোতায়েন হবে। অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ের তৃতীয় বছরের মধ্যে, সীমান্ত, ইসরায়েলি বসতি, ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং জেরুজালেম ইস্যু-এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল।

ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কট্টরপন্থী দলগুলো চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করে, এবং উসকানির ফলে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়, যার কারণে চুক্তিটি ভেঙে যায়।

এই চুক্তিগুলোতে সেই ধরনের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং কার্যকর প্রয়োগের সরঞ্জামাদির অভাব ছিল, যা তীব্র বিরোধী শক্তির মধ্যেও এর টিকে থাকা নিশ্চিত করতে পারত। চুক্তিটি সদিচ্ছার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল না, এবং চুক্তি মেনে চলা ও অগ্রগতি বজায় রাখার জন্য কোনো প্রণোদনা বা নিষেধাজ্ঞার কাঠামোও ছিল না। শেষ পর্যন্ত, অসলো চুক্তি মূলত ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা ধীরে ধীরে এগোনোর পরিকল্পনা করেছিল বলে নয়, বরং সেই প্রক্রিয়াটি সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ছিল না। একইভাবে, গাজার যুদ্ধ শেষ করার উদ্দেশ্যে প্রণীত জানুয়ারি ২০২৫-এর ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধবিরতিও ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার অভাব ছিল এবং যুদ্ধ যাতে পুনরায় শুরু নাহয় তারজন্য ইসরায়েলের উপর কোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ ছিল না।

যেহেতু হামাস এবং ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে, তখন গাজার জন্য একটি স্থায়ী সমাধান আসার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগের ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে এই সমাধান একা একাই আসবে না। গাজা চুক্তির ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য আরও কিছু নির্ণায়ক প্রয়োজন হবে।

এসব নির্ণায়কের মধ্যে একদম প্রথমে থাকবে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠোপোষকতা। এর মানে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর এবং প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নয়, বরং আগামী সপ্তাহগুলিতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা যে তারা চুক্তি অনুসরণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে, প্রণোদনা দেবে এবং যখন কোনো পক্ষ চুক্তি মানতে ব্যর্থ হবে, তখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে।

কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উপস্থিতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে যৌথ কমিটি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মিশন এবং সম্ভবত আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী থাকার কথা বলা হয়েছে, যার দায়িত্ব থাকবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ তত্ত্বাবধানসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করা। জরুরি ত্রাণ দ্রুত সরবরাহের জন্য এই বাহিনীকে মানবিক সংস্থাগুলোর সাথেও সমন্বয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের এমন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া এই চুক্তি দ্রুতই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এটা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত চুক্তির প্রতিটি ধাপের সাথে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা এবং নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা।

এই প্রণোদনাগুলোর মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সহায়তা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ওয়াশিংটন এবং এর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মিত্রদের কাজ হবে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের প্রভাবশালী অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলিকে তাদের প্রত্যাশাগুলো পূরণে আশ্বাস দেওয়া। গাজা চুক্তির জন্য টেকসই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হবে।

অতীতের চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, নমনীয়তাই হলো মূল চাবিকাঠি। আঞ্চলিক সংঘাতের খুবই জটিল বিষয়। তাই এটা সমাধানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোর হলে হিতে বিপরীত হয়।

গাজা চুক্তির আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জামিনদারদের অবশ্যই এটিকে একটি রোড ম্যাপে রূপান্তরিত করার জন্য কাজ করতে হবে। এই রোড ম্যাপে সময়সীমা, যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি, চুক্তি অমান্য করলে তা রিপোর্ট করার নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক শান্তিবাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

চুক্তির প্রতিটা ধাপের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের উচিত ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি উভয় পক্ষকে চুক্তির শর্ত মানার জন্য প্রণোদনা এবং অমান্য ক্করলে নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখা।

যেমন, তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বর্তমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর প্রস্তাব দিতে পারে এবং অস্ত্র বিক্রির ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি দিতে পারে।

হামাসের ক্ষেত্রে তাদের সাধারণ কর্মীদের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে পুনর্বাসন এবং গাজার নতুন বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যম ও নিম্ন স্তরে তাদের একীভূতকরণের মাধ্যমে চলতে পারে। চুক্তির বিধান মানতে হামাসের ব্যর্থতা এড়ানোর জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হামাসের অবশিষ্ট সামরিক ও আর্থিক সক্ষমতা আরও দ্রুত এবং আক্রমণাত্মকভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিতে পারে।

একটি পর্যায়ক্রমিক চুক্তি গ্রহণ করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন উভয় পক্ষকে একটি ভয়াবহ সংঘাত থামাতে এবং আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের উভয় স্থানে চুক্তিটি যে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে পারে, তা সত্ত্বেও চুক্তিটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এর আন্তর্জাতিক সমর্থকদের উৎসাহিত করা।

একটি নৃশংস যুদ্ধের পর, উভয় পক্ষেরই বোঝা দরকার যে, এই চুক্তি ব্যর্থ হলে তার মূল্য হবে অনেক বেশি। তাই, যেকোনো মুল্যে এই চুক্তি সফল করতে হবে। তবে তা অবশ্যই একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে।

আমির হামজাওয়ি কার্নেগি মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো এবং পরিচালক। তার গবেষণা ও লেখালেখির মূল কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার শাসন ব্যবস্থা, সামাজিক দুর্বলতা এবং এই অঞ্চলে সরকার ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন ভূমিকা। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রোতে পাবলিক পলিসি প্রফেসর অফ দ্য প্র্যাকটিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

**ফরেন অ্যাফেসার্স ডটকমের সৌজন্যে লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**

সম্পর্কিত