পর্ব ৫

বর্তমান পাকিস্তান কি ইরানের ভবিষ্যৎ

করিম সাদজাদপোর
করিম সাদজাদপোর
বর্তমান পাকিস্তান কি ইরানের ভবিষ্যৎ
বিপ্লবের পর থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধীরে ধীরে এক ধর্মীয় রাষ্ট্র থেকে রূপান্তরিত হয়েছে এক নিরাপত্তা রাষ্ট্রে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরানের ভবিষ্যতের ধারক ও বাহক যদি ইসলামিক রেভ্যুলেশন গার্ড কোর (আইআরজিসি) হয়, তাহলে ইরানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃষ্টান্ত পাকিস্তান। কারণ বিপ্লবের পর থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধীরে ধীরে এক ধর্মীয় রাষ্ট্র থেকে রূপান্তরিত হয়েছে এক নিরাপত্তা রাষ্ট্রে। আর এই নিরাপত্তা রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি এই গার্ড অর্থাৎ আর্মিরা।

১৯৭৯ সালে ‘বিপ্লবের রক্ষক’ হিসেবে জন্ম নেওয়া আইআরজিসির উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি সেনা অভ্যুত্থান, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও রেজা শাহের সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে দেশকে সুরক্ষা দেওয়া। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এ বাহিনী আরও বড় হয়। যুদ্ধের পর তারা ব্যবসা, বন্দর, নির্মাণ, চোরাচালান ও গণমাধ্যমে ঢুকে পড়ে। আর এতে সবকিছুতে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন হয় যেমন- আংশিক সামরিক বাহিনী, আংশিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আংশিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি মিলিটারি দেশের অর্থনীতির বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে আইআরজিসি। সর্বস্তরে তাদের এই বিশাল প্রভাবের ফলে ইরান এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সম্পর্কে বলা বিখ্যাত উক্তিটি ক্রমেই প্রযোজ্য হয়ে উঠছে, ‘এটি সেনাবাহিনীসহ একটি দেশ নয়, বরং একটি দেশের সঙ্গে সেনাবাহিনী।’

খামেনির অনিরাপত্তাবোধের কারণেই তার শাসনকালে আইআরজিসির এত আধিপত্য বেড়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনের পর আইআরজিসি বাজেট বাড়ানো, বিদেশে প্রক্সি গোষ্ঠী গড়ে তোলা ও অস্ত্র সরবরাহের সুযোগ পায়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের বন্দরগুলোকে চোরাচালানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে সংগঠনটিকে আরও ধনী করেছে।

আইআরজিসির বর্তমান প্রভাব-প্রতিপত্তিকে তাদের জনপ্রিয়তার প্রতীক ভেবে ভুল করা উচিত হবে না।
আইআরজিসির বর্তমান প্রভাব-প্রতিপত্তিকে তাদের জনপ্রিয়তার প্রতীক ভেবে ভুল করা উচিত হবে না।

তবে আইআরজিসি কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি নয়। এদের মধ্যে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। প্রজন্মগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব সারাক্ষণই লেগে থাকে তাদের মধ্যে। খামেনির কর্তৃত্বই এতদিন এসব বিরোধ দমিয়ে রেখেছে। তার বিদায়ের পর, এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলো প্রকাশ্যে চলে আসার আশঙ্কা প্রবল।

যদি এমন হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে, আইআরজিসি প্রভাবশালী শক্তি থেকে সরাসরি শাসকের ভূমিকায় যেতে পারে। শুরুতে তারা হয়তো কিছুদিন অস্থিরতা চলতে দেবে, তারপর জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসবে। এ কৌশল অনেকটা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মতো হবে। তারা ভারতের হুমকি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেখিয়ে নিজেদেরকে জাতীয় ঐক্যের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে এসেছে।

তবে এই পথে হাঁটলে আইআরজিসিকে শুধু ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব কমানোই নয়, রাষ্ট্রের আদর্শকেই বদলে দিতে হবে। শিয়াপন্থী বিপ্লবী মতাদর্শ থেকে ইরানি জাতীয়তাবাদের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে আলেমরা এখন আল্লাহর নামে সবাইকে আহ্বান করেন, তখন গার্ডরা আহ্বান জানাবে দেশের নামে।

তবে আইআরজিসির বর্তমান প্রভাব-প্রতিপত্তিকে তাদের জনপ্রিয়তার প্রতীক ভেবে ভুল করা উচিত হবে না। সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি খামেনির পছন্দে নিয়োগ পাওয়া। কাউকে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হতে না দেওয়ার জন্য নিয়মিতভাবে বদলি করা হয়। তাদের নামে এখন দমননীতি, দুর্নীতি ও অদক্ষতার সঙ্গে জড়িত।

আমেরিকান নাগরিক সিয়ামাক নামাজি আট বছর ধরে এই সংগঠনের হাতে বন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, “আজকের ইরান আসলে আইাআরজিসির বর্তমান ও তাদের প্রাক্তন সদস্যদের মাফিয়াতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ আনুগত্য দেশ, ধর্ম বা আদর্শের প্রতি নয় বরং ব্যক্তিগত সম্পদ ও স্বার্থের প্রতি।”

যদি আইআরজিসির হাতে ইরানের শাসনভার ওঠে তবে অনেক কিছু নির্ভর করবে নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
যদি আইআরজিসির হাতে ইরানের শাসনভার ওঠে তবে অনেক কিছু নির্ভর করবে নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইসরায়েল প্রায় দুই ডজন আইআরজিসি অফিসারকে তাদের নিজেদের বেডরুম এবং বাঙ্কারে ঢুকে হত্যা করেছে। এতেই এই সংগঠনের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ভঙ্গুর অবস্থা স্পষ্ট হয়। তাদের এই অবস্থা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোনো সংগঠন যদি দক্ষতার চেয়ে ধর্মীয় আদর্শকে বেশি প্রাধান্য দেয় তাহলে তাদের আসলে কি অবস্থা হয়।

যদি আইআরজিসির হাতে ইরানের শাসনভার ওঠে তবে অনেক কিছু নির্ভর করবে নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর। কমান্ডার যদি বদমেজাজি হয় তবে তিনি হতে পারে ইরানের পুতিন। তিনি ইসলামিক আদর্শের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, একজন বাস্তববাদী কর্মকর্তা ইরানের আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির মতো হতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনি কর্তৃত্ব বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পথ খুঁজে নেবেন যেমন মিশরের প্রেসিডেন্ট করেছেন।

এক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। আইআরজিসির স্ট্রাটেজিস্টরা সবসসময়ই তাদের লেখালেখিতে সাদ্দাম এবং লিবিয়ার স্বৈরাচারী শাসক গাদ্দাফির পতনের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র না থাকাকে দায়ী করেন। আবার উত্তর কোরিয়ার স্থিতিশীলতাও তাদের পরমাণু শক্তিধর দেশ হওয়ার জন্যই বলে মনে করেন। তবে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আইআরজিসি নেতৃত্বাধীন ইরান এক বড় দ্বিধার মুখোমুখি হবে। পতনের হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু বোমা বানাবে নাকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারানোর ভয়ে এই পরিকল্পনা বাদ দেবে, এই দোটানায় পড়বে ইরান।

পাকিস্তানের মতো তখন ইরানেও ধর্মের চেয়ে বেশি জাতীয়তাবাদ আর ধর্মগুরুদের বদলে জেনারেলদের প্রাধান্য বাড়বে। তখন আদর্শের বদলে জনগণের জাতীয়তাবাদী আবেগ জিইয়ে রাখতে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কখনো সংঘাত আবার কখনো বা সমঝোতার দোলাচলে থাকবে ইরান।

**ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**

করিম সাদজাদপোর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক ‘চিফ ইরান অ্যানালিস্ট’ সাদজাদপোরের কাজের প্রধান ক্ষেত্র ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি।

অনুবাদ করেছেন: রিতু চক্রবর্ত্তী

সম্পর্কিত