ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেসেট ভাষণ হয়ত ইতিহাসে লেখা থাকবে কূটনীতির দলিল হিসেবে নয়, বরং সভ্যতার নৈতিক পতনের প্রতীক হিসেবে। সেখানে এক মহাশক্তিধর নেতা শান্তির কথা বলেননি; তিনি যুদ্ধকে গৌরবময় করে তুলেছিলেন। “আমরাই বিশ্বের সেরা অস্ত্র তৈরি করি এবং আমরা ইসরায়েলকে অনেক দিয়েছি”– ট্রাম্পের এই কথায় ছিল না অহংকারের ভুলচুক উচ্চারণ, বরং আমেরিকার নীতির নগ্ন প্রতিফলন। এটি ছিল এক সাম্রাজ্যের ঘোষণা, যা শান্তিকে সংজ্ঞায়িত করে বোমার পরিমাণে, কূটনীতিকে মাপে ও ধ্বংসের দক্ষতায়।
সেদিন ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ভেতরে দেওয়া করতালি ইতিহাসের নির্মম বিদ্রূপ হয়ে রইল। সেই একই পার্লামেন্ট ভবন, যা দশকের পর দশক দখল, বাস্তুচ্যুতি আর রক্তপাতের সাক্ষী। সেখানে শান্তির নামে ট্রাম্পের যুদ্ধের বাণীকে উল্লাসে স্বাগত জানানো হলো। তিনি যে বক্তৃতা দিলেন, তা কোনো কূটনৈতিক বিবৃতি ছিল না, ছিল অস্ত্র ঝনঝনানির বিজ্ঞাপন। আমেরিকান সাম্রাজ্যের বিপণন। পাশে দাঁড়ানো নেতানিয়াহু ছিলেন তুষ্ট ক্রেতা, যিনি গাজার ওপর সেই অস্ত্র প্রয়োগ করে ‘শান্তি’র দাবি করেন।
ট্রাম্পের কথায় নৈতিকতার কোনো ছাপ ছিল না। “তুমি ওগুলো ভালোভাবে ব্যবহার করেছ”–নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে এই প্রশংসা যেন গাজার শিশুহত্যাকে দক্ষতার প্রদর্শনীতে রূপ দিল। এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে এক অবরুদ্ধ জাতির ধ্বংসযজ্ঞের প্রশংসা করছেন–এটি ইতিহাসের এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়। তার যুক্তি ছিল সহজ: শোষণ, অবরোধ ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের মাধ্যমে অর্জিত শক্তিই শান্তি আনে। কিন্তু গাজার ধ্বংসস্তূপে কী শান্তি জন্মায়? কোন সভ্যতা সেই শান্তি উদযাপন করে?
ট্রাম্পের ‘শান্তি’ সবসময়ই ছিল ব্যবসায়িক। তার আব্রাহাম চুক্তি ছিল না সমঝোতার পথ, বরং আরব বিশ্বকে ইসরায়েলের নৃশংসতায় সহযাত্রী করার রাজনৈতিক প্রকল্প। এতে লাভবান হয়েছে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ও তেল ব্যবসা, আর হারিয়েছে ফিলিস্তিনের ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়ার মুখে ট্রাম্পের সেই ভাষণ ছিল এক মরিয়া প্রয়াস। বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসায়ী ও তেল-লবিগুলোর কাছে আনুগত্যের ঘোষণা।
নেতানিয়াহু জানতেন, এই নাটক কীভাবে অভিনয় করতে হয়। তার রাজনীতি টিকে আছে স্থায়ী যুদ্ধের ওপর। এটা এমন রাষ্ট্রনীতি যেখানে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বই অপরাধ। ট্রাম্প তাকে দিলেন বৈধতা, অস্ত্র ও নিঃশর্ত সমর্থন; আর নেতানিয়াহু ফিরিয়ে দিলেন ট্রাম্পকে ‘শান্তির স্থপতি’ হওয়ার ভ্রম। কিন্তু তাদের তৈরি শান্তি কেবল নীরবতা–ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের নীরবতা, অগণিত কবরে ঢাকা নীরবতা, এক জাতির নিঃশেষিত কণ্ঠের নীরবতা।
আরও ভয়াবহ হলো, এই নৃশংসতার সামনে বিশ্বের নীরবতা। মানবাধিকারের বুলি কপচানো পশ্চিমা শক্তিগুলো আজ নির্বিকার, যখন গাজার হাসপাতাল ও স্কুলে মার্কিন বোমা পড়ে। ইউরোপের নীতিবাগীশ নেতারাও চোখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ নিহতরা মুসলমান, রাষ্ট্রহীন, অস্বস্তিকর। দ্বিচারিতা এখন বৈশ্বিক ব্যবস্থারই ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ‘শান্তি’ সবসময়ই ছিল ব্যবসায়িক। তার আব্রাহাম চুক্তি ছিল না সমঝোতার পথ, বরং আরব বিশ্বকে ইসরায়েলের নৃশংসতায় সহযাত্রী করার রাজনৈতিক প্রকল্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিআর মুসলিম বিশ্ব? অনেকের প্রতিক্রিয়াই আরও লজ্জাজনক। কেউ কেউ ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্ব’ প্রশংসা করেছেন, নেতানিয়াহুর অপরাধে নীরব থেকেছেন। এটাই সেই মুহূর্ত, যখন টিকে থাকার রাজনীতি নৈতিক রাজনীতিকে গিলে খেয়েছে। যারা আমেরিকান অনুগ্রহ হারানোর ভয়ে নিজেদের আত্মা বিকিয়ে দিয়েছে, তারা প্রমাণ করেছে, মুসলমানের জীবন আজ মুসলিম রাজধানীগুলিতেও দরকষাকষির পণ্য।
ট্রাম্পের নেসেটে দেওয়া ভাষণ আমাদের সময়ের মুখোশ খুলে দিয়েছে। এটি দেখিয়েছে, ‘শান্তি’ শব্দটি এখন প্রচারের অস্ত্র, মানবাধিকারের ভাষা, দাপটের কাছে নিঃশেষ। আর নৈতিক ক্ষোভের জায়গা নিয়েছে কৌশলগত হিসাব। ট্রাম্পের শান্তি মানে ন্যায়হীন শান্তি, মর্যাদাহীন শান্তি, সেই শান্তি যা নীরবতা দাবি করে। আর নীরবতা মানে সহযোগিতা।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এখন গণহত্যাকে কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ট্রাম্প যখন গর্ব করে বলেন, “আমরা অস্ত্র দিয়েছি, আমরা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করেছি,” তখন তিনি বিশ্বের রাজনীতির নৈতিক ব্যাকরণই বদলে দিচ্ছেন। শেখাচ্ছেন, দক্ষ হত্যাই সভ্যতার পরিচয়। এটি কেবল আমেরিকা বা ইসরায়েল নয়, বরং এক বৈশ্বিক নৈতিক পতনের প্রতীক– যেখানে নেতৃত্বের মানদণ্ড সহমর্মিতা নয়, সামরিক শক্তি।
ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য অভিযান ছিল ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থ ও লেনদেনের রাজনীতি। ফিলিস্তিনিদের সাহায্য বন্ধ করা, দূতাবাস সরানো– সবই ছিল নাটক। তেল-অস্ত্র জোটের জন্য মুনাফা সৃষ্টির উপায়। আর তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন নেতানিয়াহু, যিনি ধর্ম, ভয় আর জাতীয়তাবাদকে রাজনীতির অস্ত্র বানিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে।
এইসবের মাঝেই গাজা পুড়ছে। শিশুরা ধ্বংসস্তূপে বেড়ে উঠছে, মানুষ বেঁচে আছে পানি, বিদ্যুৎ ও আশাহীন জীবনে। বিশ্বের মিডিয়া একে বলে ‘সংঘাত’, বলে না ‘গণহত্যা’। পশ্চিমা সাংবাদিকরা ইসরায়েলি সৈন্যদের মানবিকভাবে তুলে ধরেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি মৃতদেহগুলোকে শুধুই সংখ্যা বানিয়ে রাখেন। ক্ষমতাধররা লিখছে, আর নিপীড়িতদের হাতে রয়ে গেছে শুধু শোকের ভাষা।
এই সময়ের শিক্ষা একটাই, সত্যিকারের শান্তি আসে না যুদ্ধ থেকে লোভী হাতের মাধ্যমে। শান্তি না গড়ে যারা অস্ত্রকে গর্বের প্রতীক বানায়। শান্তি শুরু হয় যখন মানুষ রাজনীতির চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন পৃথিবী অন্যায়ের মুখে নীরব থাকে না এবং যখন গাজা, ইয়েমেন, সুদান বা কাশ্মীরের জীবনগুলোকে পরিসংখ্যান নয়, পবিত্র হিসেবে দেখা হয়।
ততদিন পর্যন্ত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুরা নিজেদের শান্তিদূত বলেই চালিয়ে যাবেন, আর পৃথিবী তাদের প্রশংসায় মুখর থাকবে। কিন্তু ইতিহাস, যেমন সবসময় করে, শেষ পর্যন্ত বলবে অন্য গল্প– যেখানে এই তথাকথিত শান্তির স্থপতিরা চিহ্নিত হবেন তাদের প্রকৃত পরিচয়ে: সভ্যতার পোশাকে ছদ্মবেশী মৃত্যু-বণিক হিসেবে।
ইসমাইল সালাহউদ্দিন: দিল্লি ও কলকাতাভিত্তিক লেখক ও গবেষক। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র মুসলিম পরিচয়, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, জাত-প্রথা এবং জ্ঞানের রাজনীতি। তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সোশ্যাল এক্সক্লুশন অ্যান্ড ইনক্লুসিভ পলিসি বিভাগে গবেষণা করছেন।
লেখাটি মিডিল ইস্ট মনিটরের সৌজন্যে