ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি অবরোধ শুরু করবে– যা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর একটি। এই নির্দেশ বিস্তৃত: প্রণালিতে ঢোকা বা বের হওয়া যেকোনো জাহাজকে থামিয়ে তল্লাশি করতে হবে মার্কিন নৌবাহিনীকে। যেসব জাহাজ ইরানকে ট্রানজিট ফি দিয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক করা হবে। প্রণালিতে ইরানের পাতা মাইন ধ্বংস করা হবে। কোনো ইরানি বাহিনী যদি মার্কিন জাহাজ বা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, তার জবাব হবে ভয়াবহ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। ট্রাম্প আরও বলেন, কোনো এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী “ইরানের যা অবশিষ্ট আছে তা শেষ করে দেবে।” এখানে কোনো মিত্রের সঙ্গে পরামর্শ ছিল না, কোনো আইনি কাঠামো ছিল না, কোনো কার্যকরী পরিকল্পনাও ছিল না। তার প্রশাসনে কেউ পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ভেবেছে– এমন কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। এটি ছিল কেবল একটি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, যেখানে ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। কিন্তু ট্রাম্প একটি বিষয় বুঝেছেন– যা এই পদক্ষেপকে শুধু বেপরোয়া নয়, আরও জটিল করে তোলে: এই অবরোধের মূল ক্ষতি অন্য দেশগুলো বহন করবে। এটি কখনোই ভারতের যুদ্ধ ছিল না, বা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানিরও নয়। এসব দেশ এই সংঘাতে জড়াতে চায়নি। বরং তারা চেষ্টা করেছে দূরে থাকতে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে, একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের জটিল সম্পর্কও সামাল দিতে। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের কোনো সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা নেই, কোনো টেবিলে তাদের আসন নেই।
ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্সতবুও ঘোষণার পরিণতি সরাসরি তাদের ওপরই এসে পড়েছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্র, যা উপসাগরীয় জ্বালানি সংকট থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত। গত সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেই পোস্ট করেছিলেন, খালি ট্যাঙ্কারগুলো ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে আমেরিকান তেল ভরার জন্য। অর্থাৎ, এই অবরোধ একটি বাজার কৌশলও: উপসাগরের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে চাহিদা আমেরিকান উৎপাদকদের দিকে সরিয়ে দেওয়া এবং এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার নামে বৈধতা দেওয়া। এটি এক ধরনের শক্তি প্রদর্শন, যার সঙ্গে আছে হিসাবি স্বার্থসিদ্ধি।
ইরান বহু বছর ধরে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। সমুদ্রের মাইন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী নৌযান এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক– সবই তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে হরমুজ প্রণালির মতো সংকীর্ণ এলাকায় মার্কিন নৌ অভিযানকে কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তোলা যায়। এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো– তাৎক্ষণিক মার্কিন লাভের বাইরে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। এমন একটি অবরোধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অংশীদার দেশ, যারা আইনি ও সামরিক দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। প্রয়োজন স্পষ্ট ধারণা– ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে এবং তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। আরও প্রয়োজন, সফলতার সংজ্ঞা কী এবং তা অর্জনের পথ কী। কিন্তু ঘোষণায় এসবের কিছুই ছিল না।
এই ধারা এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে। শুল্ক আরোপের ঘোষণাগুলো বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, আর মার্কিন আলোচকেরা অপেক্ষা করেছেন অন্য দেশগুলো কখন নতি স্বীকার করবে– সেজন্য। যুদ্ধবিরতির আলোচনা মিত্রদের বিভ্রান্ত করেছে, আর প্রতিপক্ষকে দিয়েছে নতুন পরিকল্পনার সুযোগ। বড় বড় দাবি তোলার এই অভ্যাস চলতেই থেকেছে। কিন্তু এরপর কী হবে, তার কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই।
যা প্রথমে শক্ত অবস্থান বলে মনে হয়, কাছ থেকে দেখলে তা একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন: সংকট তৈরি করা, অন্যদের দিয়ে তার মূল্য চুকানো এবং সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিজের সুবিধা আদায় করা।
হরমুজ প্রণালীতে দুটি জাহাজ। ছবি: রয়টার্সভারতের জন্য এটি একটি সরাসরি সমস্যা। ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ আমদানি করে, এবং সেখানে কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিক দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। নয়াদিল্লি বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কিন্তু যখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তখন বারবার পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হওয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যখন আমেরিকা এমন সংকট তৈরি করে যা তার নিজের জন্য লাভজনক কিন্তু অন্যদের জন্য ক্ষতিকর, তখন সেই চাপ ভারতের ওপরও এসে পড়ে।
এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সুনাম গড়েছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ ও সমুদ্রপথ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার মাধ্যমে। কিন্তু যে প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত জলপথগুলোর একটি বন্ধ করে দেন, একই সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে আমেরিকান তেল রপ্তানিকারকেরা এই বিশৃঙ্খলা থেকে লাভবান হবে– তিনি সেই ভূমিকাকে ত্যাগ করছেন। বরং তিনি সেই ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছেন, যা তারই দেশ একসময় গড়ে তুলেছিল।
লেখক: তক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের একজন গবেষণা ফেলো
(লেখাটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে প্রকাশিত)