মালামতি মুসাফির

(নথির ভিড়ে নিজেকে খুঁজি)
“That one may smile, and smile, and be a villain.”
-William Shakespeare, Hamlet
প্লেটো একটি গুহার কথা বলেছিলেন। সেই গুহায় কিছু মানুষ জন্ম থেকে শিকলে বাঁধা। তারা কেবল সামনের দেয়ালটুকু দেখতে পায়। তাদের পেছনে জ্বলে আগুন, আর সেই আগুনের আলোয় দেয়ালে পড়ে নানারকম ছায়া। বন্দিরা সেই ছায়াকেই সত্য মনে করে। ছায়ার নাম রাখে, ছায়াকে চেনে, ছায়াকেই বলে—বাস্তব। যেদিন কেউ একজন শিকল ছিঁড়ে ফিরে আসে এবং বলে, “ওগুলো আসল নয়, ছায়া মাত্র”—বন্দিরা তাকে বিশ্বাস করে না। বরং বিরক্ত হয়। কারণ, তাদের পরিচিত বাস্তবতাকে সে প্রশ্ন করেছে। আড়াই হাজার বছর পরেও সেই গুহাটি কোথাও না কোথাও বিদ্যমান। শুধু শিকলের জায়গায় এসেছে বর্ণনা, আর ছায়ার জায়গায় এসেছে narrative!
একটি ঘটনা ঘটে। মনে করুন, একটি পুকুরে ঢিল পড়ল। তরঙ্গ উঠল। কিন্তু যারা পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে তারা তরঙ্গটুকু দেখে না-তারা দেখে কার হাত থেকে ঢিলটা পড়েছে বলে বলা হচ্ছে। সেই বলাটুকুই সত্য হয়ে যায়। ঢিল কার হাত থেকে আসলে পড়েছিল, সেটি তখন গৌণ। হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন, একটি হিমশৈলের মাত্র এক-অষ্টমাংশ দেখা যায় জলের উপরে-বাকি সাত-অষ্টমাংশ থাকে অদৃশ্য গভীরে। কিন্তু সেই অদৃশ্য অংশটিই হিমশৈলকে তার গতি ও গাম্ভীর্য দেয়। ক্ষমতার বর্ণনাও ঠিক তেমনি। যা দেখা যায়-কাগজ, নিয়ম, আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন—সেটি এক-অষ্টমাংশ মাত্র। বাকি সবটা চলে অদৃশ্যে, গভীরে, যেখানে আলো পৌঁছায় না।
এই সত্য নির্মাণের শিল্পটি নতুন নয়। চাণক্য তার অর্থশাস্ত্রে বলেছিলেন, শত্রুকে সরাসরি পরাজিত করার চেয়ে তার সম্পর্কে জনমত গড়ে তুলতে পারলে যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। মৌর্য সাম্রাজ্যের সেই বৃদ্ধ কূটনীতিবিদ জানতেন, তলোয়ারের চেয়ে কথার ধার তীক্ষ্ণ। শত্রুকে মাঠে হারানো কঠিন, কিন্তু তার চরিত্রের গায়ে একটি গল্প সেঁটে দিতে পারলে সে নিজেই মাঠ ছেড়ে যায়। চাণক্যের রাজনীতি কেবল রাজদরবারের পাঠ ছিল না। এটি ছিল মানব প্রকৃতির এক নির্মম ও চিরন্তন পাঠ।
আর ম্যাকিয়াভেলি? তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, মানুষ যা আছে তার চেয়ে যা মনে হয়, তার দ্বারা বেশি শাসিত হয়। একজন শাসকের সিংহের শক্তি ও শিয়ালের চতুরতা দুটোই চাই। সিংহ জাল চেনে না, শিয়াল নেকড়ে তাড়াতে পারে না। কিন্তু যে শাসক কেবল বর্ণনা দিয়ে শাসন করে, সে আসলে সিংহও নয়, শিয়ালও নয়। সে এক দক্ষ যাদুকর, যে বাস্তবতার বদলে বাস্তবতার ভ্রম তৈরি করে। আর সেই ভ্রমের জগতে মানুষ বাস করে, বিচার করে, সিদ্ধান্ত নেয়, বাস্তবকে একবারও না ছুঁয়ে।
সুফি সাধকেরা একটি কথা বলতেন, আয়নায় যে মুখ দেখ, সেটি তোমার মুখ নয় আয়নার মুখ। এই কথাটির গভীরে যে সত্য লুকিয়ে আছে, তা কেবল আধ্যাত্মিক নয় সাংসারিকও বটে। আমরা প্রতিদিন যে মানুষগুলোকে চিনি, তাদের আসল রূপ দেখি না। দেখি তাদের সম্পর্কে নির্মিত বর্ণনার প্রতিফলন। সেই বর্ণনাটি তৈরি হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে, বিশেষ মুহূর্তে, বিশেষ স্বার্থে। আয়নাটি নিরপেক্ষ নয়। আয়নাটি কেউ ধরে আছে।
ম্যাকবেথে ডাইনিদের সেই অমোঘ পঙতি মনে করুন, “Fair is foul, and foul is fair।” ভালো আসলে মন্দ, মন্দ আসলে ভালো। এই উলটো জগতে চেহারা আর সত্য কখনো মেলে না। ম্যাকবেথের দরবারে যে হাসিমুখে বুকে ছুরি মারে, সে জানে হাসিটুকুই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। হ্যামলেট তাই বলেছিলেন মর্মভেদী সেই কথা, “That one may smile, and smile, and be a villain।” একজন মানুষ অবিরাম হাসতে পারে, আর তবুও ভেতরে ভেতরে খলনায়ক হতে পারে। এই হাসি ও খলনায়কির মাঝখানে বাস করে বর্ণনা।
রুমি তার মসনভিতে বলেছিলেন, নলের কান্নার কথা। নলখাগড়া নলবনে থাকার সময় জানত না সে নল। যখন কেটে বাঁশি হলো, তখন শুরু হলো বিচ্ছেদের সুর। সেই সুর কান্না, নাকি সংগীত-তা নির্ভর করে শ্রোতার উপর। এই রূপকটি মানবিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। একজন মানুষ যখন তার পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হন, যখন তার কর্মের মূল্যায়ন তার হাতে থাকে না, অন্যের ভাষায় নির্ধারিত হয়-তখন তার কান্নাটুকুও অন্যের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। কে শুনছে, কীভাবে শুনছে, কার স্বার্থে শুনছে-সেটাই ঠিক করে দেয় সেই কান্না ন্যায্য কি না।
আর আত্তারের তত্ত্বে আছে ফানা বা আত্মবিলোপের কথা। সুফিরা বলেন, নিজেকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে না পারলে সত্যের মুখ দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে এই ফানা ঘটে উল্টোভাবেও। একজন মানুষের প্রকৃত সত্তাকে মুছে দেওয়া হয় বাইরে থেকে, জোর করে। তার জায়গায় বসানো হয় একটি নির্মিত পরিচয়, একটি আরোপিত গল্প। এটি আত্মার মুক্তি নয়। এটি পরিচয়ের নিঃশব্দ হরণ।
এখানে একটি পুরনো গল্প মনে পড়ে। রাজার দরবারে একজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, রাজ্যের মানুষ তাকে চেনে, বিশ্বাস করে। কিন্তু দরবারের ভেতরে একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যাদের স্বার্থ এই মন্ত্রীর সততার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, মন্ত্রীকে সরাতে হবে। কিন্তু সরাবে কীভাবে? সরাসরি অভিযোগ আনলে প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ নেই। তাহলে? তারা গল্প তৈরি করল। ছোট ছোট সত্যের টুকরো নিল। এখানে একটি সিদ্ধান্ত যেটা হয়তো বিতর্কযোগ্য, সেখানে একটি নিয়োগ যেটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ-আর সেগুলোকে জুড়ে দিলো এমনভাবে যেন পুরো ছবিটা অন্ধকার দেখায়। আলো যেখানে ছিলো, সেটা ফ্রেমের বাইরে রাখা হলো। ছায়াটুকু বড় করে তুলে ধরা হলো।
শেক্সপিয়ার বলেছেন এই সত্যটি সরাসরি, “Oftentimes, to win us to our harm, the instruments of darkness tell us truths; win us with honest trifles, to betray’s in deepest consequence (Macbeth)।” অন্ধকারের হাতিয়ারেরা সত্যই বলে। কিন্তু সেই সত্য ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জন করে, আর তারপর সবচেয়ে গভীর ক্ষতিটি করে। মন্ত্রী অবাক হয়ে দেখলেন, তার সারা জীবনের সুনাম কয়েক সপ্তাহের গল্পের কাছে হেরে যাচ্ছে। কারণ গল্পটি সংগঠিত, সত্যটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।
এই গল্পটি কোনো বিশেষ রাজ্যের নয়, কোনো বিশেষ কালের নয়। ইতিহাসের পাতায় এই গল্প বারবার এসেছে-রোমের সিনেটে, মুঘল দরবারে, আধুনিক রাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে। যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই এই গল্পের মঞ্চ প্রস্তুত থাকে।
দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো বাস্তবতার বিকৃতি। মানুষকে শারীরিকভাবে আঘাত করার আগেই তার উপলব্ধির জগতটিকে দখল করে নেওয়া। বার্নার্ড শ’ এর একটি কথা এখানে মনে পড়ে, “The liar’s punishment is not in the least that he is not believed, but that he cannot believe anyone else।” মিথ্যাবাদীর সবচেয়ে বড় সাজা এই নয় যে অন্যরা তাকে বিশ্বাস করে না, বরং এই যে সে নিজেও আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। বর্ণনার এই জগতে সবাই একদিন এই সাজা পায়- যারা মিথ্যা বর্ণনা তৈরি করে, তারাও। কারণ যে ব্যবস্থা সত্যকে বিকৃত করে, সে ব্যবস্থা একদিন নিজের তৈরি বর্ণনার ভেতরেই হারিয়ে যায়।
শ’ আরও বলেছিলেন, “All great truths begin as blasphemies।” সব বড় সত্য শুরু হয় ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে। যে প্রথম বলেছিল পৃথিবী গোল, সে ধর্মদ্রোহী ছিল। যে বলেছিল রাজা ভুল করেছেন, সে বিশ্বাসঘাতক ছিল। প্রতিষ্ঠিত বর্ণনার বিরুদ্ধে সত্য বলা সবসময়ই বিপজ্জনক, সবসময়ই একাকীত্বের। একটি দাবার ছক কল্পনা করুন। গুটিগুলো কে কোথায় বসবে সেটা ঠিক হওয়ার কথা তাদের গুণে, তাদের সক্ষমতায়। কিন্তু ছকটি যদি হেলে পড়ে, যদি নিয়মের চেয়ে গল্পের জোর বেশি হয়, তাহলে গুটির চলন আর যুক্তির নিয়ম মানে না। সেই ছকে যোগ্য গুটি কোণে পড়ে থাকে, অযোগ্য গুটি চলে আসে কেন্দ্রে। খেলাটি চলতে থাকে, দর্শক তালি দেয়, কিন্তু ছকের হেলানোটুকু কেউ দেখে না।
চাণক্য বলেছিলেন, রাজার প্রিয়পাত্র হওয়াই যোগ্যতার প্রমাণ নয়, কিন্তু রাজার দরবারে প্রিয়পাত্র না হলে যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই। এই নির্মম সত্যটি যুগে যুগে বদলায়নি, কেবল রাজদরবারের রূপ পাল্টেছে।
টি. এস. এলিয়ট তার The Hollow Men কবিতায় লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত পঙতি—
Between the idea
And the reality
Between the motion
And the act
Falls the Shadow
ধারণা আর বাস্তবতার মাঝখানে, ইচ্ছা আর কর্মের মাঝখানে পড়ে থাকে ছায়া। এই ছায়াটুকুই বর্ণনার আবাসভূমি। ধারণাটি এক, কিন্তু বাস্তব বলে প্রচার করা হয় আরেকটি। ইচ্ছাটি এক, কিন্তু কর্মের আড়ালে লুকানো থাকে ভিন্ন উদ্দেশ্য। সেই ছায়ায় বাস করে আধুনিক সময়ের সেই Hollow men —যাদের এলিয়ট বর্ণনা করেছিলেন, “Shape without form, shade without colour, paralysed force, gesture without motion”, হিসেবে। আকৃতি আছে কিন্তু রূপ নেই, ছায়া আছে কিন্তু রং নেই, শক্তি আছে কিন্তু গতি নেই। এই শূন্যগর্ভ মানুষেরাই বর্ণনার সবচেয়ে বড় ভোক্তা এবং উৎপাদক।
আর বেকেট? Waiting for Godot-তে তার দুই চরিত্র অপেক্ষা করছে কারো জন্য যে আসবে না, অথচ চলেও যেতে পারছে না। কারণ তারা নিশ্চিত নয়, আসলে তারা কি অপেক্ষা করছে, নাকি অপেক্ষার অভিনয় করছে? বেকেট লিখেছিলেন, “We always find something, eh Didi, to give us the impression we exist।” আমরা সবসময় কিছু না কিছু খুঁজে পাই। এমন কিছু, যা দিয়ে আমরা নিজেদের বোঝাতে পারি যে আমরা টিকে আছি, আমরা প্রাসঙ্গিক আছি। বর্ণনাও সেই কাজটিই করে। প্রতিটি নির্মিত গল্প আসলে বলে, আমি আছি, আমার গোষ্ঠী আছে, আমার ক্ষমতা আছে। এবং বেকেটের সেই অমর পঙতি, “Words are the clothes thoughts wear।” শব্দ হলো চিন্তার পোশাক। কিন্তু পোশাক যখন চিন্তাকে ঢেকে দেয়, তখন আর চিন্তার খোঁজ থাকে না, শুধু পোশাকটুকু দেখা যায়। বর্ণনা ঠিক এই কাজটিই করে, ঘটনার গায়ে এমন পোশাক পরিয়ে দেয় যাতে আসল ঘটনাটি আর দেখা না যায়।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বদ্রিয়া বলেছিলেন Simulacrum বা অনুকৃতির কথা। এমন একটি সময় আসে যখন প্রতিলিপি এতটাই শক্তিশালী হয় যে মূলটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। মানচিত্র এতটাই বিস্তৃত হয় যে ভূখণ্ডটি হারিয়ে যায়। সুফিরা এই বিপদকে চিনতেন। তারা বলতেন, যে হৃদয় আয়নার মতো পরিষ্কার, সে সত্য প্রতিফলিত করে। কিন্তু যে আয়নায় মরিচা পড়েছে, সে কেবল বিকৃতি দেখায়। আর সুফিদের কাশফ বা অন্তর্দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি যদি একবার জাগে, তাহলে বর্ণনার আড়ালে ঘটনাটি দেখা যায়। আয়নার মরিচা সরে যায়। ছায়া আর বাস্তব মনে হয় না।
এই লেখাটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে না। কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের কথা বলে না। এটি কেবল একজন পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ। যিনি দেখছেন যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এবং সমান্তরালভাবে দেখছেন সেই ঘটনাগুলোকে কীভাবে বলা হচ্ছে। এই দুটির মধ্যে যে ফাঁকটুকু প্রতিদিন বাড়ছে-সেই ফাঁকের ভেতরে বাস করছে একটি নীরব সত্য। হেমিংওয়ে বলেছিলেন, “The best people possess a feeling for beauty, the courage to take risks, the discipline to tell the truth, the capacity for sacrifice. Ironically, their virtues make them vulnerable; they are often wounded, sometimes destroyed।” সৎ মানুষেরা ভঙ্গুর হয়। কারণ সততাই তাদের দুর্বলতা। এটি বিধির নিষ্ঠুর পরিহাস।
প্লেটোর গুহায় ফিরে যাই শেষবারের মতো। সেই বন্দিরা কিন্তু সুখী ছিল। ছায়াকে বাস্তব মনে করে তারা একটি পরিচিত, স্থিতিশীল জীবন যাপন করছিল। সমস্যা তখনই শুরু হলো যখন একজন ফিরে এসে বললো, এগুলো আসল নয়। সত্যের সমস্যা সেখানেই, সে স্বস্তিদায়ক নয়। এলিয়ট লিখেছিলেন, “This is the way the world ends. Not with a bang but a whimper।” পৃথিবীর পরিসমাপ্তি ঘটে না বিস্ফোরণে, ঘটে ক্ষীণ একটি আওয়াজে। সত্যের মৃত্যুও তেমনি, হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে। প্রতিটি নির্মিত বর্ণনা একটু একটু করে সরিয়ে দেয় বাস্তবতাকে। প্রতিটি আরোপিত পরিচয় একটু একটু করে মুছে দেয় সত্যিকারের মানুষটিকে।
রুমি বলেছিলেন, বাতি নেভানো সহজ, কিন্তু অন্ধকারকে সত্য বলে মেনে নেওয়া — সেটি মৃত্যুর চেয়েও কঠিন পরাজয়। ঘটনা ঘটতে থাকবে। বর্ণনাও প্রস্তুত হতে থাকবে। কিন্তু ঘটনা ও বর্ণনার মধ্যবর্তী সেই ফাঁকটুকুর দিকে তাকানোর সাহস—সেটুকু যদি টিকে থাকে, তাহলে হয়তো গুহার দেয়াল একদিন সরে যাবে।
আর সেই আলোর জন্য অপেক্ষা করাটাই, এই মুহূর্তে, সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
লেখক : সরকারি চাকরিজীবী

(নথির ভিড়ে নিজেকে খুঁজি)
“That one may smile, and smile, and be a villain.”
-William Shakespeare, Hamlet
প্লেটো একটি গুহার কথা বলেছিলেন। সেই গুহায় কিছু মানুষ জন্ম থেকে শিকলে বাঁধা। তারা কেবল সামনের দেয়ালটুকু দেখতে পায়। তাদের পেছনে জ্বলে আগুন, আর সেই আগুনের আলোয় দেয়ালে পড়ে নানারকম ছায়া। বন্দিরা সেই ছায়াকেই সত্য মনে করে। ছায়ার নাম রাখে, ছায়াকে চেনে, ছায়াকেই বলে—বাস্তব। যেদিন কেউ একজন শিকল ছিঁড়ে ফিরে আসে এবং বলে, “ওগুলো আসল নয়, ছায়া মাত্র”—বন্দিরা তাকে বিশ্বাস করে না। বরং বিরক্ত হয়। কারণ, তাদের পরিচিত বাস্তবতাকে সে প্রশ্ন করেছে। আড়াই হাজার বছর পরেও সেই গুহাটি কোথাও না কোথাও বিদ্যমান। শুধু শিকলের জায়গায় এসেছে বর্ণনা, আর ছায়ার জায়গায় এসেছে narrative!
একটি ঘটনা ঘটে। মনে করুন, একটি পুকুরে ঢিল পড়ল। তরঙ্গ উঠল। কিন্তু যারা পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে তারা তরঙ্গটুকু দেখে না-তারা দেখে কার হাত থেকে ঢিলটা পড়েছে বলে বলা হচ্ছে। সেই বলাটুকুই সত্য হয়ে যায়। ঢিল কার হাত থেকে আসলে পড়েছিল, সেটি তখন গৌণ। হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন, একটি হিমশৈলের মাত্র এক-অষ্টমাংশ দেখা যায় জলের উপরে-বাকি সাত-অষ্টমাংশ থাকে অদৃশ্য গভীরে। কিন্তু সেই অদৃশ্য অংশটিই হিমশৈলকে তার গতি ও গাম্ভীর্য দেয়। ক্ষমতার বর্ণনাও ঠিক তেমনি। যা দেখা যায়-কাগজ, নিয়ম, আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন—সেটি এক-অষ্টমাংশ মাত্র। বাকি সবটা চলে অদৃশ্যে, গভীরে, যেখানে আলো পৌঁছায় না।
এই সত্য নির্মাণের শিল্পটি নতুন নয়। চাণক্য তার অর্থশাস্ত্রে বলেছিলেন, শত্রুকে সরাসরি পরাজিত করার চেয়ে তার সম্পর্কে জনমত গড়ে তুলতে পারলে যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। মৌর্য সাম্রাজ্যের সেই বৃদ্ধ কূটনীতিবিদ জানতেন, তলোয়ারের চেয়ে কথার ধার তীক্ষ্ণ। শত্রুকে মাঠে হারানো কঠিন, কিন্তু তার চরিত্রের গায়ে একটি গল্প সেঁটে দিতে পারলে সে নিজেই মাঠ ছেড়ে যায়। চাণক্যের রাজনীতি কেবল রাজদরবারের পাঠ ছিল না। এটি ছিল মানব প্রকৃতির এক নির্মম ও চিরন্তন পাঠ।
আর ম্যাকিয়াভেলি? তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, মানুষ যা আছে তার চেয়ে যা মনে হয়, তার দ্বারা বেশি শাসিত হয়। একজন শাসকের সিংহের শক্তি ও শিয়ালের চতুরতা দুটোই চাই। সিংহ জাল চেনে না, শিয়াল নেকড়ে তাড়াতে পারে না। কিন্তু যে শাসক কেবল বর্ণনা দিয়ে শাসন করে, সে আসলে সিংহও নয়, শিয়ালও নয়। সে এক দক্ষ যাদুকর, যে বাস্তবতার বদলে বাস্তবতার ভ্রম তৈরি করে। আর সেই ভ্রমের জগতে মানুষ বাস করে, বিচার করে, সিদ্ধান্ত নেয়, বাস্তবকে একবারও না ছুঁয়ে।
সুফি সাধকেরা একটি কথা বলতেন, আয়নায় যে মুখ দেখ, সেটি তোমার মুখ নয় আয়নার মুখ। এই কথাটির গভীরে যে সত্য লুকিয়ে আছে, তা কেবল আধ্যাত্মিক নয় সাংসারিকও বটে। আমরা প্রতিদিন যে মানুষগুলোকে চিনি, তাদের আসল রূপ দেখি না। দেখি তাদের সম্পর্কে নির্মিত বর্ণনার প্রতিফলন। সেই বর্ণনাটি তৈরি হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে, বিশেষ মুহূর্তে, বিশেষ স্বার্থে। আয়নাটি নিরপেক্ষ নয়। আয়নাটি কেউ ধরে আছে।
ম্যাকবেথে ডাইনিদের সেই অমোঘ পঙতি মনে করুন, “Fair is foul, and foul is fair।” ভালো আসলে মন্দ, মন্দ আসলে ভালো। এই উলটো জগতে চেহারা আর সত্য কখনো মেলে না। ম্যাকবেথের দরবারে যে হাসিমুখে বুকে ছুরি মারে, সে জানে হাসিটুকুই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। হ্যামলেট তাই বলেছিলেন মর্মভেদী সেই কথা, “That one may smile, and smile, and be a villain।” একজন মানুষ অবিরাম হাসতে পারে, আর তবুও ভেতরে ভেতরে খলনায়ক হতে পারে। এই হাসি ও খলনায়কির মাঝখানে বাস করে বর্ণনা।
রুমি তার মসনভিতে বলেছিলেন, নলের কান্নার কথা। নলখাগড়া নলবনে থাকার সময় জানত না সে নল। যখন কেটে বাঁশি হলো, তখন শুরু হলো বিচ্ছেদের সুর। সেই সুর কান্না, নাকি সংগীত-তা নির্ভর করে শ্রোতার উপর। এই রূপকটি মানবিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। একজন মানুষ যখন তার পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হন, যখন তার কর্মের মূল্যায়ন তার হাতে থাকে না, অন্যের ভাষায় নির্ধারিত হয়-তখন তার কান্নাটুকুও অন্যের ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। কে শুনছে, কীভাবে শুনছে, কার স্বার্থে শুনছে-সেটাই ঠিক করে দেয় সেই কান্না ন্যায্য কি না।
আর আত্তারের তত্ত্বে আছে ফানা বা আত্মবিলোপের কথা। সুফিরা বলেন, নিজেকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে না পারলে সত্যের মুখ দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে এই ফানা ঘটে উল্টোভাবেও। একজন মানুষের প্রকৃত সত্তাকে মুছে দেওয়া হয় বাইরে থেকে, জোর করে। তার জায়গায় বসানো হয় একটি নির্মিত পরিচয়, একটি আরোপিত গল্প। এটি আত্মার মুক্তি নয়। এটি পরিচয়ের নিঃশব্দ হরণ।
এখানে একটি পুরনো গল্প মনে পড়ে। রাজার দরবারে একজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, রাজ্যের মানুষ তাকে চেনে, বিশ্বাস করে। কিন্তু দরবারের ভেতরে একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যাদের স্বার্থ এই মন্ত্রীর সততার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, মন্ত্রীকে সরাতে হবে। কিন্তু সরাবে কীভাবে? সরাসরি অভিযোগ আনলে প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ নেই। তাহলে? তারা গল্প তৈরি করল। ছোট ছোট সত্যের টুকরো নিল। এখানে একটি সিদ্ধান্ত যেটা হয়তো বিতর্কযোগ্য, সেখানে একটি নিয়োগ যেটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ-আর সেগুলোকে জুড়ে দিলো এমনভাবে যেন পুরো ছবিটা অন্ধকার দেখায়। আলো যেখানে ছিলো, সেটা ফ্রেমের বাইরে রাখা হলো। ছায়াটুকু বড় করে তুলে ধরা হলো।
শেক্সপিয়ার বলেছেন এই সত্যটি সরাসরি, “Oftentimes, to win us to our harm, the instruments of darkness tell us truths; win us with honest trifles, to betray’s in deepest consequence (Macbeth)।” অন্ধকারের হাতিয়ারেরা সত্যই বলে। কিন্তু সেই সত্য ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জন করে, আর তারপর সবচেয়ে গভীর ক্ষতিটি করে। মন্ত্রী অবাক হয়ে দেখলেন, তার সারা জীবনের সুনাম কয়েক সপ্তাহের গল্পের কাছে হেরে যাচ্ছে। কারণ গল্পটি সংগঠিত, সত্যটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।
এই গল্পটি কোনো বিশেষ রাজ্যের নয়, কোনো বিশেষ কালের নয়। ইতিহাসের পাতায় এই গল্প বারবার এসেছে-রোমের সিনেটে, মুঘল দরবারে, আধুনিক রাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে। যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই এই গল্পের মঞ্চ প্রস্তুত থাকে।
দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো বাস্তবতার বিকৃতি। মানুষকে শারীরিকভাবে আঘাত করার আগেই তার উপলব্ধির জগতটিকে দখল করে নেওয়া। বার্নার্ড শ’ এর একটি কথা এখানে মনে পড়ে, “The liar’s punishment is not in the least that he is not believed, but that he cannot believe anyone else।” মিথ্যাবাদীর সবচেয়ে বড় সাজা এই নয় যে অন্যরা তাকে বিশ্বাস করে না, বরং এই যে সে নিজেও আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। বর্ণনার এই জগতে সবাই একদিন এই সাজা পায়- যারা মিথ্যা বর্ণনা তৈরি করে, তারাও। কারণ যে ব্যবস্থা সত্যকে বিকৃত করে, সে ব্যবস্থা একদিন নিজের তৈরি বর্ণনার ভেতরেই হারিয়ে যায়।
শ’ আরও বলেছিলেন, “All great truths begin as blasphemies।” সব বড় সত্য শুরু হয় ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে। যে প্রথম বলেছিল পৃথিবী গোল, সে ধর্মদ্রোহী ছিল। যে বলেছিল রাজা ভুল করেছেন, সে বিশ্বাসঘাতক ছিল। প্রতিষ্ঠিত বর্ণনার বিরুদ্ধে সত্য বলা সবসময়ই বিপজ্জনক, সবসময়ই একাকীত্বের। একটি দাবার ছক কল্পনা করুন। গুটিগুলো কে কোথায় বসবে সেটা ঠিক হওয়ার কথা তাদের গুণে, তাদের সক্ষমতায়। কিন্তু ছকটি যদি হেলে পড়ে, যদি নিয়মের চেয়ে গল্পের জোর বেশি হয়, তাহলে গুটির চলন আর যুক্তির নিয়ম মানে না। সেই ছকে যোগ্য গুটি কোণে পড়ে থাকে, অযোগ্য গুটি চলে আসে কেন্দ্রে। খেলাটি চলতে থাকে, দর্শক তালি দেয়, কিন্তু ছকের হেলানোটুকু কেউ দেখে না।
চাণক্য বলেছিলেন, রাজার প্রিয়পাত্র হওয়াই যোগ্যতার প্রমাণ নয়, কিন্তু রাজার দরবারে প্রিয়পাত্র না হলে যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই। এই নির্মম সত্যটি যুগে যুগে বদলায়নি, কেবল রাজদরবারের রূপ পাল্টেছে।
টি. এস. এলিয়ট তার The Hollow Men কবিতায় লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত পঙতি—
Between the idea
And the reality
Between the motion
And the act
Falls the Shadow
ধারণা আর বাস্তবতার মাঝখানে, ইচ্ছা আর কর্মের মাঝখানে পড়ে থাকে ছায়া। এই ছায়াটুকুই বর্ণনার আবাসভূমি। ধারণাটি এক, কিন্তু বাস্তব বলে প্রচার করা হয় আরেকটি। ইচ্ছাটি এক, কিন্তু কর্মের আড়ালে লুকানো থাকে ভিন্ন উদ্দেশ্য। সেই ছায়ায় বাস করে আধুনিক সময়ের সেই Hollow men —যাদের এলিয়ট বর্ণনা করেছিলেন, “Shape without form, shade without colour, paralysed force, gesture without motion”, হিসেবে। আকৃতি আছে কিন্তু রূপ নেই, ছায়া আছে কিন্তু রং নেই, শক্তি আছে কিন্তু গতি নেই। এই শূন্যগর্ভ মানুষেরাই বর্ণনার সবচেয়ে বড় ভোক্তা এবং উৎপাদক।
আর বেকেট? Waiting for Godot-তে তার দুই চরিত্র অপেক্ষা করছে কারো জন্য যে আসবে না, অথচ চলেও যেতে পারছে না। কারণ তারা নিশ্চিত নয়, আসলে তারা কি অপেক্ষা করছে, নাকি অপেক্ষার অভিনয় করছে? বেকেট লিখেছিলেন, “We always find something, eh Didi, to give us the impression we exist।” আমরা সবসময় কিছু না কিছু খুঁজে পাই। এমন কিছু, যা দিয়ে আমরা নিজেদের বোঝাতে পারি যে আমরা টিকে আছি, আমরা প্রাসঙ্গিক আছি। বর্ণনাও সেই কাজটিই করে। প্রতিটি নির্মিত গল্প আসলে বলে, আমি আছি, আমার গোষ্ঠী আছে, আমার ক্ষমতা আছে। এবং বেকেটের সেই অমর পঙতি, “Words are the clothes thoughts wear।” শব্দ হলো চিন্তার পোশাক। কিন্তু পোশাক যখন চিন্তাকে ঢেকে দেয়, তখন আর চিন্তার খোঁজ থাকে না, শুধু পোশাকটুকু দেখা যায়। বর্ণনা ঠিক এই কাজটিই করে, ঘটনার গায়ে এমন পোশাক পরিয়ে দেয় যাতে আসল ঘটনাটি আর দেখা না যায়।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বদ্রিয়া বলেছিলেন Simulacrum বা অনুকৃতির কথা। এমন একটি সময় আসে যখন প্রতিলিপি এতটাই শক্তিশালী হয় যে মূলটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। মানচিত্র এতটাই বিস্তৃত হয় যে ভূখণ্ডটি হারিয়ে যায়। সুফিরা এই বিপদকে চিনতেন। তারা বলতেন, যে হৃদয় আয়নার মতো পরিষ্কার, সে সত্য প্রতিফলিত করে। কিন্তু যে আয়নায় মরিচা পড়েছে, সে কেবল বিকৃতি দেখায়। আর সুফিদের কাশফ বা অন্তর্দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি যদি একবার জাগে, তাহলে বর্ণনার আড়ালে ঘটনাটি দেখা যায়। আয়নার মরিচা সরে যায়। ছায়া আর বাস্তব মনে হয় না।
এই লেখাটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে না। কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের কথা বলে না। এটি কেবল একজন পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ। যিনি দেখছেন যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এবং সমান্তরালভাবে দেখছেন সেই ঘটনাগুলোকে কীভাবে বলা হচ্ছে। এই দুটির মধ্যে যে ফাঁকটুকু প্রতিদিন বাড়ছে-সেই ফাঁকের ভেতরে বাস করছে একটি নীরব সত্য। হেমিংওয়ে বলেছিলেন, “The best people possess a feeling for beauty, the courage to take risks, the discipline to tell the truth, the capacity for sacrifice. Ironically, their virtues make them vulnerable; they are often wounded, sometimes destroyed।” সৎ মানুষেরা ভঙ্গুর হয়। কারণ সততাই তাদের দুর্বলতা। এটি বিধির নিষ্ঠুর পরিহাস।
প্লেটোর গুহায় ফিরে যাই শেষবারের মতো। সেই বন্দিরা কিন্তু সুখী ছিল। ছায়াকে বাস্তব মনে করে তারা একটি পরিচিত, স্থিতিশীল জীবন যাপন করছিল। সমস্যা তখনই শুরু হলো যখন একজন ফিরে এসে বললো, এগুলো আসল নয়। সত্যের সমস্যা সেখানেই, সে স্বস্তিদায়ক নয়। এলিয়ট লিখেছিলেন, “This is the way the world ends. Not with a bang but a whimper।” পৃথিবীর পরিসমাপ্তি ঘটে না বিস্ফোরণে, ঘটে ক্ষীণ একটি আওয়াজে। সত্যের মৃত্যুও তেমনি, হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে। প্রতিটি নির্মিত বর্ণনা একটু একটু করে সরিয়ে দেয় বাস্তবতাকে। প্রতিটি আরোপিত পরিচয় একটু একটু করে মুছে দেয় সত্যিকারের মানুষটিকে।
রুমি বলেছিলেন, বাতি নেভানো সহজ, কিন্তু অন্ধকারকে সত্য বলে মেনে নেওয়া — সেটি মৃত্যুর চেয়েও কঠিন পরাজয়। ঘটনা ঘটতে থাকবে। বর্ণনাও প্রস্তুত হতে থাকবে। কিন্তু ঘটনা ও বর্ণনার মধ্যবর্তী সেই ফাঁকটুকুর দিকে তাকানোর সাহস—সেটুকু যদি টিকে থাকে, তাহলে হয়তো গুহার দেয়াল একদিন সরে যাবে।
আর সেই আলোর জন্য অপেক্ষা করাটাই, এই মুহূর্তে, সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
লেখক : সরকারি চাকরিজীবী

‘লা ফিনালিসিমা’য় গত মার্চে দুই দলের দেখা হওয়ার কথা ছিল কাতারে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ম্যাচটাই শেষ পর্যন্ত হলোই না! সেই স্পেন আর আর্জেন্টিনাই আজ মুখোমুখি বিশ্বকাপ ফাইনালে। তবে দুই দল ছাপিয়েও এই ম্যাচের বড় বিজ্ঞাপন দুটি নাম - লিওনেল মেসি আর লামিন ইয়ামাল।