ইরানি গিঁট ছাড়াতে পুতিনের দ্বারস্থ ট্রাম্প

ইরানি গিঁট ছাড়াতে পুতিনের দ্বারস্থ ট্রাম্প
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার রাতে ফোনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। স্পষ্টতই এটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধে দেখা দেওয়া কৌশলগত অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার একটি চেষ্টা।

ওয়াশিংটন এখনো কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তার রয়েছে। এমনকি দেশটির আধ্যাত্মিক নেতা নিয়োগের বিষয়েও তিনি ভাবছেন। একই সঙ্গে তিনি তেলবাহী জাহাজের অধিনায়কদের সাহস দেখাতে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রিপাবলিকান গার্ডের অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যেতে আহ্বান জানাচ্ছেন।

তবু ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সূচিত বৃহৎ যুদ্ধের গতি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। সংঘাতকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিবেশ এমনভাবে বদলাতে শুরু করেছে, যা আমেরিকার জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।

ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অংশীদারও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। জর্ডানের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার অন্যতম অনুগত মিত্র হিসেবে বিবেচিত কুয়েত জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলার জন্য তারা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়নি—যদিও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে সিরিয়ার কুর্দি গোষ্ঠীগুলো ইরাকি ও ইরানিদের আমেরিকাকে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানাচ্ছে। একই সময়ে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে, পাশাপাশি অন্যান্য আরব দেশ ও ইরানের মধ্যেও আড়ালে যোগাযোগের খবর প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনের জন্য আপেক্ষিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সম্ভাবনা সামনে আসতে শুরু করেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক এখনো একটি কৌশলগত জোট হিসেবেই রয়ে গেছে। কিন্তু সংঘাতের বর্তমান গতিপথ স্পষ্টতই সেই রকম নয়, যেমনটি তিনি ইরানের ওপর হামলার অনুমোদন দেওয়ার সময় কল্পনা করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে সেই যুক্তি—এখন মস্কোকে ফোন করার সময়।

ট্রাম্প ভেবেছিলেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি ‘ইরানি গিঁট’ খুলে ফেলতে পারবেন। চার দশকের সংঘাতকে দৃঢ় সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে শেষ করা যাবে—এ ধারণাটি ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে বেশ আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু বাস্তবে গিঁটটি আরও শক্ত হয়ে গেছে। এই গিঁটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাশিয়ার অংশগ্রহণ ছাড়া খোলা সম্ভব নয়।

শুরু থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট ছিল, যদিও ট্রাম্প ও তার দলের কাছে তা মূলত তাত্ত্বিক ধারণা হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। এখন তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।

প্রথম কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব কমে যাওয়া। শুধু এই অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক অবকাঠামো গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে তা নয়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কৌশলকে সমর্থনকারী বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর কিছু উপাদান—যার মধ্যে প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থার অংশও রয়েছে তা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাত আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আগের ধারণার তুলনায় অনেক কম নির্ভরযোগ্য। একবার এ ধরনের সন্দেহ জন্মালে তা সহজে দূর করা যায় না। সহজ করে বললে, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর প্রতি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আর পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

ট্রাম্প কি এটি বুঝতে পারছেন? বলা কঠিন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা ইঙ্গিত দেয়, তিনি হয়তো এখনো কৌশলগত পরিবর্তনের ব্যাপ্তি পুরোপুরি উপলব্ধি করেননি। তবু তিনি পুতিনকে ফোন করেছেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, তিনি বুঝতে পারছেন যে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করা শুধু ওয়াশিংটনের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমেরিকার অংশীদার প্রয়োজন। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপ স্পষ্টতই সেই অংশীদারদের মধ্যে নেই। ট্রাম্প কি এই অঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে যৌথ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, এবং তিনি কি গুরুতর সমঝোতায় যেতে রাজি—এটি এখনো একটি খোলা প্রশ্ন।

দ্বিতীয় কারণটি বৈশ্বিক হাইড্রোকার্বন বাজারকে ঘিরে। ট্রাম্প শুরুতে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে সাময়িক ‘খিঁচুনি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, এটি আমেরিকার পক্ষে জ্বালানি সরবরাহ পুনর্বণ্টনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের ফলাফল ওয়াশিংটনের জন্য মোটেও লাভজনক হবে না।

সংকট গভীর হলে বৈশ্বিক জনমত এবং মার্কিন ভোটাররা খুব ভালোভাবেই জানবে এর জন্য কে দায়ী। একই সঙ্গে এটি সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহনের দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসবে—যে ক্ষেত্রটিতে ওয়াশিংটন তার কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে চেয়েছিল।

বাস্তবে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক হাইড্রোকার্বন বাজার পুনর্গঠনের আরেকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য এটিকে এ ধরনের শেষ প্রচেষ্টা মনে করা সরলতা হবে।

তবে ওয়াশিংটন ও অন্য কিছু বড় শক্তির বিপরীতে মস্কো বহু বছর ধরেই এই ধরনের বাজার অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে পুতিনের দেওয়া প্রস্তাব—পাইপলাইনের মাধ্যমে আবার হাইড্রোকার্বন সরবরাহ শুরু করার সম্ভাবনা বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।

প্রথম নজরে এটি পারস্য উপসাগরের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি উপসাগরীয় সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর যে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে, তার গভীর উপলব্ধির প্রতিফলন।

যদি সমুদ্রপথে তেল ও গ্যাস পরিবহন, যা নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে পাইপলাইন আবার কৌশলগত গুরুত্ব ফিরে পেতে পারে।

এই প্রস্তাব পশ্চিম ইউরোপের জন্যও একটি পরীক্ষা। অন্তত এটি এসব রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের একটি নমুনা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়, যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সংঘাত ইতিমধ্যেই নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সংঘাত ইতিমধ্যেই নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে। ছবি: রয়টার্স

তৃতীয় কারণ হলো সংঘাতের প্রকৃতির পরিবর্তন। যুদ্ধের দশ দিনের মাথায় আমেরিকার সঙ্গে এই সংঘাত ইতিমধ্যেই নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে। প্রচলিত সামরিক অভিযানের পাশাপাশি নাশকতা ও সন্ত্রাসবাদ ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই পরিবর্তন সরাসরি হোয়াইট হাউস প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টার ফল, যেখানে তারা সংঘাতকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় নাশকতার প্রধান লক্ষ্য সম্ভবত ইসরায়েলি স্থাপনা হবে না। বরং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা আমেরিকান অবকাঠামো ও মার্কিন নাগরিকেরা ক্রমশ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। ইরান এবং অনেক উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে এই সংঘাতে প্রধান প্রতিপক্ষ আমেরিকা, ইসরায়েল নয়।

এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের ওপর মস্কোর সংযমী প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—যদি অবশ্য ট্রাম্প উত্তেজনা কমানোর দিকে প্রথম পদক্ষেপ নিতে রাজি হন।

সবশেষে রয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ওয়াশিংটনের কিছু মহল যে যুদ্ধটিকে প্রথমে মাত্র পাঁচ দিনের বলে ভেবেছিল, এখন সেটি কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এত দীর্ঘ সংঘাত আমেরিকার ভেতরে রাজনৈতিক সংকটের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন দুর্বল হচ্ছিল। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর রাজনৈতিক পরিণতিও ক্রমশ স্পষ্ট হবে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকান রাজনীতিকদের যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যার মধ্যে ইরানের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের অস্থিরতাও থাকবে।

তবে এই ক্ষেত্রে মস্কোর পক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব বেশি সাহায্য করা সম্ভব নয়। রাশিয়া হয়তো ‘ইরানি গিঁট’-এর কিছু অংশ আলগা করতে পারে, কিন্তু এই যুদ্ধ আমেরিকার ভেতরে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে, তার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনেরই।

লেখক: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব মিডিয়া, এইচএসই ইউনিভার্সিটি

(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে)

সম্পর্কিত