Advertisement Banner

পিফাস: জনস্বাস্থ্যের ওপর অদৃশ্য হুমকি

পিফাস: জনস্বাস্থ্যের ওপর অদৃশ্য হুমকি
ঢাকা এবং আদমজী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (EPZ)-এর ভাটিতে অবস্থিত জলাশয়গুলোতে পিফাস–এর ঘনত্ব উজানের তুলনায় অনেক বেশি। ছবি: ফ্রিপিক

পার ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ (PFAS- পিফাস) হলো কৃত্রিম রাসায়নিকের একটি বৃহৎ পরিবার যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন যৌগ রয়েছে। এই রাসায়নিকগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এদের কার্বন-ফ্লোরিন (C-F) বন্ধন। জৈব রসায়নের ভাষায়, কার্বন-ফ্লোরিন বন্ধনটি প্রকৃতিতে বিদ্যমান অন্যতম শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন। এই বন্ধনের অজেয় শক্তির কারণে পিফাস রাসায়নিকগুলো উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, পানি এবং তেলের সাথে বিক্রিয়া করে না এবং পরিবেশের স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস হয় না। এই স্থিতিশীলতার কারণেই বিজ্ঞানিরা এদেরকে ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সাধারণত পিফাস-এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি যৌগ হলো পারফ্লুরোঅক্টানোয়িক অ্যাসিড (PFOA-পিএফওএ) যার সংকেত C7F15COOH এবং পারফ্লুরোঅক্টেন সালফোনিক অ্যাসিড (PFOS-পিএফওএস) যার সংকেত C8F17SO3H। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী, বায়োঅ্যাকুমুলেটিভ (শরীরে জমা হয়) এবং বিষাক্ত। এগুলো একবার পরিবেশে প্রবেশ করলে বায়ুমণ্ডলের মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং এমনকি উত্তর মেরুর তুষারেও এদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

পিফাস মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এগুলো শরীরে দীর্ঘদিন জমে থাকে এবং সহজে বের হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, পিফাস‑এর সংস্পর্শে এলে ক্যান্সার, লিভার ও কিডনির ক্ষতি, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গর্ভকালীন জটিলতা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে পিফাস নিয়ে গবেষণার যাত্রা শুরু হয় মূলত ২০১৬-১৭ সালের দিকে উপকূলীয় অঞ্চলের জলজ প্রাণী এবং সামুদ্রিক খাবারের ওপর গবেষণার মাধ্যমে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই গবেষণার ব্যাপ্তি সীমিত থাকলেও ২০১৯ সালের পর থেকে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোর নদ-নদীর পানি, সেডিমেন্ট বা তলদেশ এবং এমনকি বায়ুমণ্ডলে পিফাস-এর উপস্থিতি নিয়ে নিবিড় গবেষণা শুরু হয়।

ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পবর্জ্যের দূষণে জর্জরিত। ছবি: ফ্রিপিক
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পবর্জ্যের দূষণে জর্জরিত। ছবি: ফ্রিপিক

বাংলাদেশে পিফাস এনালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সহায়ক উপকরণ বর্তমানে পর্যাপ্তভাবে নেই। ফলে এখন পর্যন্ত যে গবেষণাগুলো হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিদেশি গবেষণাগার ব্যবহার করে সম্পন্ন করা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে একটি মাত্র পিফাস নমুনা এনালাইসিস করতে প্রায় ৪০০ মার্কিন ডলার প্রয়োজন হয়।

২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতে বাংলাদেশের নদ-নদীতে পিফাস-এর এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের গবেষকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইপিইএন (IPEN) এবং এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO) এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে।

২০২৫ সালে ‘জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল এক্সপোজার অ্যাসেসমেন্ট’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে এবং মাটিতে পিফাস-এর উচ্চমাত্রার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিটি নদীর পানির নমুনায় ১৫টি ভিন্ন ধরনের পিফাস-এর উপস্থিতি রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের শহুরে জলাশয়গুলো এখন এই বিষাক্ত রাসায়নিকের আধার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পবর্জ্যের দূষণে জর্জরিত। কিন্তু পিফাস-এর মতো অদৃশ্য এবং অবিনশ্বর রাসায়নিকের দূষণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বস্ত্র ও চামড়া শিল্পের ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগারগুলো পিফাসকে পানি থেকে আলাদা করতে সক্ষম নয়। ফলে এই রাসায়নিকগুলো সরাসরি নদীর পানিতে মিশছে এবং নদীর তলদেশের মাটিতে জমা হচ্ছে।

ঢাকার তিনটি প্রধান নদীর পিফাস-এর ঘনত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায় যে বুড়িগঙ্গা নদীতে সর্বোচ্চ মাত্রা (২৭.৯০–৫২.৩৬ ng/L), এরপর তুরাগ নদী (৮.১৩–২৫.০৯ ng/L) এবং তুলনামূলকভাবে শীতলক্ষ্যা নদীতে সবচেয়ে কম মাত্রা (১৩.৬৩–২৫.২৪ ng/L) পাওয়া গেছে, যা শিল্পবর্জ্যের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।

সবচেয়ে বেশি দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীকে। এখানে পিএফওএ (PFOA)-এর মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে। সাভারের কর্ণতলী নদীর গবেষণায় আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে পিফাস-এর ঘনত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত সীমার চেয়ে ৩০০ গুণেরও বেশি বলে রেকর্ড করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, নদীর তলদেশের মাটিতে বা সেডিমেন্টে পিএফওএস (PFOS)-এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হলো পিএফওএস রাসায়নিকটি তুলনামূলকভাবে ভারি এবং এটি সহজে পানির নিচে মাটির স্তরে জমা হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু এই শিল্পের পর্দার আড়ালে পিফাস-এর ব্যবহার পরিবেশের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকা এবং আদমজী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (EPZ)-এর ভাটিতে অবস্থিত জলাশয়গুলোতে পিফাস–এর ঘনত্ব উজানের তুলনায় অনেক বেশি। এটি নিশ্চিত করে যে, এই শিল্পাঞ্চলগুলোই দূষণের প্রধান উৎস।

২০২২ সালে আশুলিয়া হ্রদ এবং পলাশবাড়ী এলাকা থেকে সংগৃহীত পানির নমুনায় পিএফওএ (PFOA)-এর মাত্রা নেদারল্যান্ডসের পরামর্শমূলক সীমার চেয়ে ১৯ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, অনেক কোম্পানি এখন আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ লং-চেইন পিফাস (যেমন PFOA) থেকে সরে এসে শর্ট-চেইন পিফাস (যেমন PFBA, PFHxA) ব্যবহার করছে। যদিও এগুলো দ্রুত ভেঙে যাওয়ার দাবি করা হয়, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যে এগুলোও স্বাস্থ্যের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর এবং পানিতে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত রপ্তানিযোগ্য টেক্সটাইল পণ্য– বিশেষ করে ওয়াটারপ্রুফ ও ভোলাটাইল ফিনিশযুক্ত কাপড়ে পিফাস‑এর মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ৩০ গুণ এবং প্রায় ৭ হাজার গুণ বেশি, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের জন্য পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার, পিফাস দূষণের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অঞ্চলে অবস্থিত শিপব্রেকিং ইয়ার্ড বা জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং বন্দর কর্মকাণ্ডের ফলে সমুদ্রের পানিতে প্রচুর পরিমাণে পিফাস মিশছে ।

২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মাছ এবং শেলফিশের শরীরে পিফাস‑এর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। ফিনফিশের শরীরে এর মাত্রা ০.৩২ থেকে ১৪.৫৮ ng/g এবং শেলফিশের শরীরে ১.৩১ থেকে ৮.৩৪ ng/g পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এর মানে হলো, আমরা যে সামুদ্রিক মাছ খাচ্ছি তার মাধ্যমেও এই ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশ ২০০৭ সালে ‘স্টকহোম কনভেনশন অন পারসিস্টেন্ট অর্গানিক পলিউট্যান্টস’ (Stockholm Convention)-এ স্বাক্ষর করেছে এবং ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর পিএফওএস (PFOS) ও পিএফওএ (PFOA) সংক্রান্ত সংশোধনীগুলো অনুমোদন করেছে, যা ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশে কার্যকর হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও অভ্যন্তরীণভাবে পিফাস নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের আইনগত সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত দুর্বল।

এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা পিফাস-এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড বা নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। বর্তমানের ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ বা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩’-এ পিফাস‑এর উল্লেখ স্পষ্টভাবে নেই, যার ফলে শিল্পকারখানাগুলো কোনো আইনি বাধা ছাড়াই এই রাসায়নিকগুলো ব্যবহার করতে পারছে।

২০২৫ সালের খসড়া ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ (EPR) নীতিমালায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও পিফাস-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকের আমদানির ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন এখন অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের পরিবেশে পিফাস-এর উপস্থিতি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক সম্ভাবনা নয়, বরং এটি একটি কঠোর বাস্তব। গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, আমাদের নদীগুলো এই রাসায়নিকের দ্বারা বিষাক্ত হয়ে উঠছে এবং আমাদের রক্তে এই অবিনশ্বর বিষ জমা হচ্ছে।

লেখক: গবেষক ও পরিবেশ প্রকৌশলী

সম্পর্কিত