এক সময় খবরের কাগজকে মনে করা হতো লোকশিক্ষার বাহন। সে এক সময় ছিল যখন ছাপার অক্ষরে যা কিছুই পাওয়া যেত তাকেই বেশির ভাগ লোক সত্যি বলে মনে করত। এমনকি আমাদের তরুণ বয়সেও স্বল্পশিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত অনেককে আলোচনা বা তর্ক-বিতর্কের একটা পর্যায়ে কোনো ঘটনা বা তথ্যের অভ্রান্তি প্রতিপাদনে ‘পেপারে লিখেছে’ কথাটা বলতে শুনেছি। তখনও পত্রিকায় ভুল খবর বা তথ্য যে একেবারে ছাপা হতো না তা কিন্তু নয়। একই খবর ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপনের ফলেও তা ভিন্ন মাত্রা বা তাৎপর্য পেত। পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত। আর বলা বাহুল্য সেটা অস্বাভাবিক নয়। তবে কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর বা তাতে উল্লেখিত কোনো তথ্য ভুল বলে প্রমাণিত হলে কিংবা প্রকাশের পর তার প্রতিবাদ এলে পত্রিকার তরফে তার সংশোধনী বা সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব বোধ করা হতো। এখনও যে হয় না তা বলছি না, তবে সবসময় হয় না। অনেকক্ষেত্রে বিষয়টি এড়িয়ে বা চেপে যাওয়া হয়। যদি না বিষয়টি হয় স্পর্শকাতর অথবা প্রতিবাদটা আসে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহল থেকে।
ভাষা বা বানানের ক্ষেত্রে ভুল বা অশুদ্ধতার চর্চা তো এখন পত্রিকাগুলোতে প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যদিও সেটা প্রধানত অজ্ঞতাপ্রসূত, তবে কিছুক্ষেত্রে দায়িত্বহীন নতুনত্ব সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাও এর পেছনে কাজ করে। একটি পত্রিকার নিজস্ব ভাষারীতি এবং শব্দ ব্যবহারে বিশেষ ঝোঁক থাকতে পারে। তবে বানানের বেলায় যথেচ্ছাচার কিছুতেই কাম্য নয়। পাঠ্যপুস্তকে আমরা একটি শব্দের একরকম বানান শিখব, দাপ্তরিক কাজে বা ব্যবহারিক জীবনে সেটিই বা কিঞ্চিৎ ভিন্ন আরেক বানান লিখব, আবার সংবাদপত্রে নিত্যদিন সেই একই শব্দের অন্য বানানের সঙ্গে পরিচিত হব, এমনটি কিছুতেই হওয়া উচিত নয়। তাতে ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে যে একরকম নৈরাজ্য সৃষ্টি হয় শুধু তাই নয়। সামগ্রিকভাবে মাতৃভাষায় বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বর্তমানে যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বলছি না এটাই বাংলাভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ব্যাপারে আমাদের বর্তমান অনাগ্রহ বা উদাসীনতার একমাত্র বা প্রধান কারণ। তবে একটা কারণ তো অবশ্যই।
আমরা জানি বাংলা ভাষার দুটি লেখ্য রূপ আছে: একটি সাধু এবং অপরটি চলিত বা কথ্য। এক সময় সকল বাংলা সংবাদপত্রের ভাষাই ছিল সাধু। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বাংলাদেশ-পূর্ব এমনকি পরবর্তী সময়েও আমাদের দুটি প্রধান দৈনিক আজাদ ও ইত্তেফাক-এর ভাষা ছিল সাধু। খবর, প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, ফিচার ইত্যাদি সবই লেখা হতো সাধু বাংলায়। যদিও এই দুটি দৈনিকেরই সমসাময়িককালে সংবাদ, দৈনিক পাকিস্তান ও পূর্বদেশ এই পত্রিকাগুলো কথ্য বা চলিত বাংলাকেই তাদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। আবার আজাদ ও ইত্তেফাক উভয় পত্রিকারই ভাষা সাধু হলেও, শব্দ ব্যবহারের দিক থেকে তাদের মধ্যে কিন্তু বরাবরই কমবেশি তফাত কিংবা প্রথমোক্ত পত্রিকাটির বিশেষ ঝোঁক লক্ষ করা যেত। এরই পাশাপাশি কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার কথা বলতে পারি, তারা তাদের অন্য সব রচনায় কথ্য বাংলা ব্যবহার করলেও, পত্রিকাটির সম্পাদকীয় লেখা হতো সাধু বাংলায়। আমাদের দেশে ইত্তেফাক ও সমকাল এখনও এই রীতি অনুসরণ করে। খুব সম্ভব এই ধারণা থেকে যে, ভাষার এই সাধু রূপটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তথা ভাবগাম্ভীর্য প্রকাশে অধিক উপযোগী। যে-বিবেচনায় আমাদের সরকারি কাজকর্মে সাধু বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে, এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগঠনের প্রস্তাব ও সভার কার্যবিবরণী এখনও সাধারণত সাধু ভাষায়ই লেখা হয়। তবে সাধু বা চলিত যে-ভাষায়ই লেখা হোক, দু-তিন দশক আগেও আমাদের পত্রপত্রিকায় বানান বা শব্দ ব্যবহারে ভুল কিংবা বাক্য গঠনে ত্রুটি পাওয়া যেত না বললেই চলে। ক্বচিৎ তেমন ঘটলেও পরদিনই সে বিষয়ে সংশোধনী দেওয়া হতো। দৈনিক পাকিস্তান (ও পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা) ছিল সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা, সাধারণভাবে সরকারি নীতির সমর্থক। কিন্তু ১৯৬০ দশকেই আমাদের দেশে আধুনিক ও স্মার্ট সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল এ পত্রিকাটি। কি বিষয় পরিকল্পনা, কি উপস্থাপনা, কি ভাষা ব্যবহার, সব ব্যাপারেই। তিন দশক আগেও দৈনিক সংবাদ-এর চিঠিপত্র কলামে মাসের পর মাস বাংলা বানানের শুদ্ধাশুদ্ধ নিয়ে চিঠিপত্র ছাপা হতে আমরা দেখেছি। কারণ বিষয়টিকে তখন প্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছিল। আর এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে পত্রিকার ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো। কিন্তু সে সবই এখন মনে হয় বিগতকালের কথা। আজ যখন অগ্রসর মানের কোনো দৈনিকের খবরেও পরপর কয়েকদিন “পুলিশ সন্দিগ্ধ (‘সন্দেহভাজন’ অর্থে) ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে”এমন বাক্যের সাক্ষাৎ মেলে কিংবা চার্চিলকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করা হয় (এবং পরে ‘সংশোধনী’ দিতে গিয়েও আবার লেখা হয় ‘যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেন্ট) তখন জনশিক্ষার দিক থেকে সংবাদপত্রের দায়িত্বশীলতা আশা না করাই বোধহয় ভালো। যদিও ইদানীংকালে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি আর সবার মতো সংবাদকর্মীদের জন্যও এক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্বশীলতার বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আর বহুক্ষেত্রে তারা সে সুযোগের সদ্ব্যবহারও করছেন।
সংবাদপত্র পরিচালনায় পেশাদারিত্বের প্রতি গুরুত্ব ও তার চর্চা একটা সময় পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। পত্রিকার মালিক ও সম্পাদকরা অনেকেই তখন এমনকি সরাসরি রাজনীতিও করতেন। সাংবাদিকরাও করতেন। মালিক বা সম্পাদকের ভিন্ন বা বিপরীত আদর্শের অনুসারী ছিলেন কর্মরত সাংবাদিকদের অনেকে। কিন্তু তাঁদের যোগ্যতা, পেশাদারি দক্ষতাই কর্মক্ষেত্রে, একমাত্র না হলেও, প্রধান বিবেচ্য ছিল। দৈনিক আজাদ-এর মালিক ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মৌলানা আকরম খাঁ ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা। আর শাসক দল হিসেবে মুসলিম লীগের অবস্থান ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে। ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তিনি নিজেও ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগ দলীয় একজন সদস্য। কিন্তু ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি পরিষদের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। শুধু তাই নয়, পরদিন শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গনে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের উদ্বোধনও করেছিলেন তিনি। এজন্য তাকে সম্পাদকের পদ খোয়াতে হয়নি। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে, পত্রিকাটিতে অনেক বামপন্থী (গোপন কমিউনিস্ট পার্টি ও আরএসপির সক্রিয় সদস্য) চাকুরি করতেন।
দলীয় সদস্য না হলেও, তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তার পত্রিকা ইত্তেফাক-কে গণ্য করা হতো আওয়ামী লীগের মুখপত্র বলে। ছিলেন তিনি সোহরাওয়ার্দীর একান্ত অনুরাগী এবং তীব্ররকম কমিউনিস্ট বিরোধী। ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনের সময় থেকে মওলানা ভাসানীর কঠোর সমালোচক। তাঁর নিজস্ব কলামে ও পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এই মনোভাব প্রকাশ পেত। কিন্তু আজ হয়তো অনেকে শুনে আশ্চর্য হবেন, তাঁর পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগসহ বিভিন্ন উচ্চপদে কর্মরত সাংবাদিকদের কয়েকজনই তাঁদের কমিউনিস্ট বা বাম দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সুপরিচিত ছিলেন। দুজনের নাম এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : আহমেদুর রহমান ও আলী আকসাদ। ইত্তেফাক-এর পাতায়ই ‘ভীমরুল’ নামে লেখা আহমেদুর রহমানের ‘মিঠেকড়া’ উপসম্পাদকীয় কলামটি সে সময় ‘মুসাফির’ ছদ্মনামে লেখা মানিক মিয়ার ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামের চেয়ে কম পাঠকপ্রিয় ছিল না। আর তাতে তিনি পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী নীতির সমালোচনা বেশ কড়াভাবেই করতেন।
পাকিস্তান অবজারভার ও পূর্বদেশ (প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক) পত্রিকার মালিক ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী। আইনজীবী পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় রাজনীতিক। পাকিস্তান আমলে প্রদেশে ও কেন্দ্রে মন্ত্রী হয়েছিলেন। অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম কিংবা পূর্বদেশ-এর কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসও রাজনীতি করতেন। এঁদের মধ্যে কাজী ইদ্রিস ন্যাপ নেতা হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। উভয়েই তারা সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে ছিলেন প্রথিতযশা। সরকারি চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পেশার ক্ষেত্রে সততা, বস্তুনিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সব সময় মালিকের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলেননি, তাদের আজ্ঞাবহ হননি কিংবা হতে হয়নি তাদের। কর্তৃপক্ষ তাদের যোগ্যতা ও পেশাদারি মনোভাবকে কম-বেশি সম্মান বা স্বীকৃতি দিয়েছেন। কারণ তারাও দেখেছেন এতে আখেরে পত্রিকারই লাভ। স্বাধীনতার পরও কয়েক বছর এই ধারাটি বজায় ছিল। মন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানের মালিকানাধীন দৈনিক জনপদ-এ সরকারের সমালোচনা করে লেখা হতো। সম্পাদক আবদুল গাফফার চৌধুরী তো নিজ নামেই এমন একাধিক স্মরণযোগ্য সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। তখনও পাঠক তথা জনগণকেই পত্রিকার আরাধ্য জ্ঞান করা হতো। বণিকপুঁজির স্বার্থরক্ষা করাই তার একমাত্র বা প্রধান কাজ হয়ে ওঠেনি।
ড. মোরশেদ শফিউল হাসান: প্রাবন্ধিক ও গবেষক। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।