১৯৯৩ সনের ২রা অক্টোবর আমি আরডিআরএস কুড়িগ্রামে একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসাবে যোগ দেই। দীর্ঘ ১৮ বছর এই সংস্থায় কর্মরত অবস্থায় মঙ্গা নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ পাই। সে সময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য মঙ্গা ছিলো একটি ভয়াবহ আভিশাপ!
১৯৯৮ সনে মঙ্গার কারণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, মঙ্গা কী? কেন এই মঙ্গা? কেনইবা রংপুর অঞ্চলে? অন্য অঞ্চলে কেন নয়? কেন আশ্বিন-কার্তিকে? কেন অন্য মাসে নয়?
গবেষণায় দেখতে পেলাম, রংপুর অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৬৭ ভাগই কৃষিশ্রমিক। এদের নিজেদের জায়গা জমি নেই। অন্যের জমিতে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পায়, তা দিয়েই পরিবারের ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়। রংপুর অঞ্চলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে আমন ধান কাটার পরে কৃষকরা বোরো ধান, আলু, ভুট্টা, সরিষা, গম, শীতকালীন সবজি, তামাকসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করেন।
এতে, এই ৬৭ ভাগ কৃষি শ্রমিকরা সারা মৌসুম ব্যাপী প্রতিদিনই কর্মব্যস্ত থাকেন এবং আয়-উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে আমন ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে মাসগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফসল কাটা, মাড়াইসহ বিভিন্ন কাজে এই কৃষিশ্রমিকরা নিয়োজিত থাকেন।
কিন্ত বর্ষা মৌসুম এলেই সব কৃষককে আমন ধান চাষাবাদ করতে হয়। অর্থাৎ প্রায় শতভাগ কৃষক প্রায় শতভাগ জমিতে বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষাবাদ করেন। দেখা গেছে, এই এলাকায় যেসব জাতের আমন ধান চাষাবাদ করা হয়, সেসব জাতের জীবনকাল খুবই দীর্ঘ। বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত ১৫০-১৭০ দিন লেগে যায়।
অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে আমন ধানের বীজতলা, চারা তৈরি ও জমি তৈরিসহ চারা লাগানোর পর আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমন ধানের জমিতে নিড়ানি, সার দেওয়াসহ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের কাজ কৃষি শ্রমিকরা করে থাকেন।
কিন্ত এরপর দুই মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মাঝামঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ পুরো আশ্বিন-কার্তিক মাসে ধানের জমিতে কোনো কাজ থাকে না। যেহেতু ধান ছাড়া এই সময়ে আর কোনো ফসল থাকে না, সে কারণে এই ৬৭ ভাগ কৃষিশ্রমিকদের এই সময়ে কৃষি কাজ করার কোনো সুযোগ থাকে না।
আর কাজ না থাকার কারণে তাদের আয়-রোজগার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। খাদ্য কেনার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকে না। ফলে ঘরে ঘরে হাহাকার দেখা দেয়। খাদ্য ক্রয়ের জন্য তারা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। জীবন বাঁচাতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পানির দরে বিক্রি করতে হয়। অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কাজের খোঁজে নিজ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। মানবেতর জীবন-যাপন করে। স্থানীয় ভাষায় এটিই মঙ্গা। উত্তরাঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিকে এ এক ভয়াবহ অভিশাপ। অর্ধাহারে, অনাহারে থাকার এক ভয়ানক জীবন সংগ্রাম।
ছবি: লেখক
উত্তরাঞ্চলে এভাবেই আশ্বিন-কার্তিক মাসে মঙ্গা চলত যুগ যুগ ধরে। অঘ্রাণ মাসে, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বর মাসে ধান পাকলে কৃষিশ্রমিকরা আবার ধান কাটার কাজ পায়। কাটা ধান মাড়াই করে! তখন মঙ্গা অদৃশ্য হয়ে যায়!
মঙ্গার কারণ নির্ণয়ের এই গবেষণার তথ্য-উপাত্তে আমি নিশ্চিত হলাম, উত্তরাঞ্চলে আমন মৌসুমে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদী আমন ধান চাষাবাদের সাথে মঙ্গার কারণ নিহিত! তাই, আমন ধান চাষাবাদের এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে, যেখানে অঘ্রাণ মাসের পাশাপাশি আশ্বিন-কার্তিক মাসেও কৃষকরা আমন ধান কাটতে পারে। তাহলে, মঙ্গার সময়ে কৃষিশ্রমিক কাজ পাবে। কৃষক ধান পাবে, গরু খড় পাবে, মঙ্গা দূর হবে।
তাই, মঙ্গা নিরসনে এই এলাকার জন্য দরকার প্রচলিত জাতের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত, যাতে অঘ্রাণ মাসের পাশাপাশি আশ্বিন-কার্তিক মাসেও কৃষক যেন ভালো ফলনসহ পাকা আমন ধান ঘরে তুলতে পারে। একই সাথে এই প্রযুক্তির আয়-ব্যয়ের বিষয়টিও গবেষণায় যুক্ত করলাম। কারণ আমরা সবাই জানি, কৃষক শুধুমাত্র লাভজনক প্রযুক্তিই গ্রহণ করবে, অলাভজনক প্রযুক্তি নয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট কর্তৃক ১৯৯৭ সনে উদ্ভাবিত ব্রি ধান৩৩ জাতটি সেই সময়ে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত ছিল। এই জাতটি ১৫০-১৬০ দিনের পরিবর্তে মাত্র ১২০ দিনেই পেকে যায়। ফলনও আশানুরূপ। দীর্ঘমেয়াদি জাতের কাছাকাছি।
কিন্তু ২০০২ সনে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের কোথাও কোনো কৃষকের মাঠে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত চাষাবাদ করে এমন একজন কৃষকও খুঁজে পেলাম না। তবে ওই বছর রংপুর আরডিআরএস ফার্মে মঙ্গা নিরসনে আমি সাইটা, পারিজা, কটকতারাসহ আরও ৯টি স্বল্পমেয়াদি স্থানীয় জাতের ধানবীজ সংগ্রহ করে গবেষণার কাজ শুরু করলাম। দেখলাম, স্থানীয় এই কয়েকটি জাতের ধান অনেক কম সময়ে অর্থাৎ মঙ্গার শুরুতেই পেকে গেল। কিন্তু ফলন অনেক কম। বুঝতে পারলাম, এত কম ফলনে কৃষকের মন ভরবে না।
২০০৩ সনে মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩ এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইরি-পেট্রা-আইসিএম প্রকল্পে আমি ব্রি ধান৩৩ এর ট্রায়াল প্লট স্থাপন করি। অত্যন্ত আশাব্যঞ্জকভাবে কার্তিকের প্রথমেই ধান পাকতে শুরু করল। তবে বিস্তীর্ণ সবুজ আমন ধানের মাঠে ওই এক টুকরো প্লটে ধান পাকতে না পাকতেই পাখি ও ইঁদুরের উপদ্রবে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। তবে এই ট্রায়াল প্লট থেকে অনেক বাস্তব তথ্য পাওয়া গেল, যা আমার পরবর্তী গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
২০০৪ সনে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফলিত গবেষণা বিভাগের প্রধান ড. মো. মোশাররফ হোসেন ব্রি ধান৩৩ জাতের বীজ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করলেন। আরডিআরএস ফার্মে ট্রায়াল প্লট স্থাপন হলো। একই সাথে ইরির ড. এম এ হামিদ মিঞার সহযোগিতায় ইরি উদ্ভাবিত ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন পদ্ধতিতেও গবেষণার সুযোগ পেলাম। রংপুর আরডিআরএস ফার্মে সরাসরি বপন ও রোপণ পদ্ধতিতে ব্রি ধান৩৩ জাতের ট্রায়াল প্লট স্থাপন করলাম।
ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন পদ্ধতিতে ব্রি ধান৩৩ জাতের ধান ১২০ দিনের পরিবর্তে ১০৫ দিনেই কাটা গেল। অর্থাৎ মঙ্গার শুরুতেই ধান পাওয়া গেল। ফলনও ভালো। হেক্টরে ৪ টন। তবে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি বপন পদ্ধতিতে ধান চাষাবাদ প্রযুক্তিটি কৃষক গ্রহণ করেনি।
তবে রোপণ পদ্ধতিতে জুনের শেষে বা জুলাই মাসের প্রথমদিকে চারা রোপণ করলে অক্টোবরের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এমনকি পুরো কার্তিক মাসের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হলো। ফলন আশানুরূপ ছিল হেক্টর প্রতি ৩.৫-৩.৮ টন।
২০০৪ সনের ২২ অক্টোবর (৭ কার্তিক) রংপুর আরডিআরএস ফার্মে আমার এই গবেষণা কার্যক্রম দেখতে সেদিন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশে পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, এনজিও প্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ শতাধিক স্থানীয় কৃষক সমবেত হয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো রংপুরের মানুষ ৭ কার্তিকে আমন ধান কাটতে দেখলেন। বিভিন্ন টেলিভিশন ও খবরের কাগজে তা ব্যাপক প্রচার হলো। সারা দেশবাসী দেখল, মঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের সম্ভাব্য চিত্র।
কার্তিক মাসে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটতে পারার কারণে রংপুরের কৃষকরা বিশাল এক সুযোগ পেয়ে গেলেন। আমন ধান কাটার পর রবিশস্য বা শীতকালীন ফসল চাষাবাদের প্রকৃত সময় নভেম্বর মাস। কিন্তু সে সময় জমিতে আমন ধান থাকার ফলে কৃষকরা আলু, ভুট্টা, গম, শীতকালীন শাকসবজি সহ বিভিন্ন ফসল সঠিক সময়ে আবাদ করতে পারতো না। সঠিক সময়ে আবাদ করতে না পারার কারণে ফসল ভালো হতো না। ফলন কম হতো। দেরিতে চাষাবাদের কারণে ফসলে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব হতো। ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেত।
কার্তিকে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার ফলে কৃষকরা সঠিক সময়ে অর্থাৎ অঘ্রাণেই রবি ফসল বা শীতকালীন ফসল চাষাবাদ করতে পারছে। এতে ফসল ভালো হচ্ছে, ফলন বেশি হচ্ছে। আগাম হওয়ার কারণে কৃষক ফসলের বাজারমূল্য বেশি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে কৃষক ভালো আয় নিশ্চিত করতে পারছে। তাই, স্বল্পমেয়াদি আমন ধান চাষাবাদ করলে কৃষিশ্রমিক একদিকে যেমন মঙ্গার সময়ে কাজ পাবে, কৃষক ধান পাবে। পাশাপাশি পরবর্তী ফসল থেকেও কৃষক অধিক আয় নিশ্চিত করতে পারবে।
২০০৫ সনের ১৪ মে তারিখে নীলফামারীর ডালিয়াতে এনসিডিপি প্রকল্প ‘মঙ্গা গবেষণার আপডেট’ বিষয়ক একটি জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন তৎকালীন উপমন্ত্রী জনাব আসাদুল হাবিব দুলু।
আমিসহ তিনজন সেই কর্মশালায় গবেষণা উপস্থাপক হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলাম। প্রধান গবেষণা উপস্থাপক ছিলেন রংপুরের ধান গবেষণার একজন বিজ্ঞানী। তিনি ধানের খোসা/তুষ থেকে তেল উৎপাদন বিষয়ে উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয় গবেষণা উপস্থাপক মঙ্গা বিষয়ের বাইরের একটি বিষয় উপস্থাপন করেন। তৃতীয় গবেষণা উপস্থাপক হিসেবে আমি ‘স্বল্পমেয়াদি আমন ধান প্রযুক্তির মাধ্যমে মঙ্গার স্থায়ী সমাধান’ গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করি।
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে শুধু আমার গবেষণাপত্রটিই উক্ত কর্মশালার মূল বিষয়ভিত্তিক বলে মন্তব্য করেন। আমার এই গবেষণাটি উত্তরাঞ্চলের মঙ্গার স্থায়ী সমাধানের জন্য আশা জাগানিয়া এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাপূর্ণ বলে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ গবেষণার বিষয়ে তিনি আমাকে সমস্ত রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আমার এই গবেষণার বিষয়ে তিনি কৃষিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন বলে জানালেন। এই কর্মশালার পরপরই দেখা গেল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একটু নড়েচড়ে বসছেন।
এর কিছুদিন পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমাকে আমন্ত্রণ জানান। বেশ কয়েকজন সচিব ও উচ্চ পর্যায়ের প্রায় এক শ নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে আমি আমার গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করি। আমার উপস্থাপনার পরে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে ড. কামাল সিদ্দিকী গবেষণাটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে সকল ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আরডিআরএস-এর নির্বাহী পরিচালক আমাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং প্রযুক্তিটির আরও উৎকর্ষ সাধনে এবং রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে দিতে আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা করেন।
২০০৫ সনে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের ফলন কৃষক পর্যায়ে কীভাবে বাড়ানো যায়, তার ওপর গবেষণা শুরু করি এবং মাঠ পর্যায়ে এর গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি জেলায় কৃষকদের জমিতে কৃষকদের সাথে নিয়ে ১৮টি গবেষণা মাঠ স্থাপন করি।
এ পর্যায়ে আমার গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র তিনটি সহজ বিষয় মাথায় রেখে স্বল্পমেয়াদি ধান চাষাবাদ করলে ফলন আশানুরূপ বৃদ্ধি পায়। সেই তিনটি বিষয় হলো-
- সোলারাইজেশন পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি: এই পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করে বীজ বপন করলে বীজতলায় চারা অনেক সবল হয় এবং চারা কম সময়ে অনেক বড় হয়। এতে প্রচলিত ৩০-৪০ দিনের পরিবর্তে ২৫-২৬ দিনের মধ্যেই চারা বীজতলা থেকে সহজেই উঠানো যায় এবং রোপণ করতে সুবিধা হয়। এই পদ্ধতিতে ধানের ফলনও বেশি পাওয়া যায়।
- যেহেতু স্বল্পমেয়াদি ধানের চারাতে কুশির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হয়, তাই ৮-১০ ইঞ্চির পরিবর্তে ৬-৭ ইঞ্চি দূরত্বে চারা রোপণ করলে জমিতে মোট ধানের ছড়ার সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদী ধানের ছড়ার ন্যায় হবে এবং ধানের ফলন ভালো হবে।
- স্বল্পমেয়াদি ধানে যেহেতু কম সময়ে কাচ থোর আসে, তাই সবশেষ উপরি সার প্রয়োগ চারা রোপণের ৪০-৫০ দিনের পরিবর্তে ২৫-৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হবে।
উপরের এই তিনটি বিষয় সামনে রেখে স্বল্পমেয়াদি ধান চাষাবাদ করলে দীর্ঘমেয়াদি ধানের সমপরিমাণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি ফলন পাওয়া যেতে পারে।
২০০৬ সনে আরডিআরএস বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি মঙ্গাপীড়িত জেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২২টি এনজিওর মাধ্যমে ৯ হাজার ৪২৭ জন কৃষকের মাঝে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করে। এ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি আরইবি নামক একটি সংস্থা এই প্রযুক্তি এক শ একর জমিতে আরডিআরএসসহ চারটি সংস্থার মাধ্যমে সম্প্রসারণে সহায়তা করে।
২০০৭ সনে আরডিআরএস ২৫টি স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে ডিএই-এর সহায়তায় ৫ হাজার ৯২৮ জন কৃষকের মাঝে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করে। ২০০৭ সনের ৪ অক্টোবর রংপুর অঞ্চলের জিওসি মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগাম ধান উৎপাদনের প্রযুক্তি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন এবং কৃষক মাঠ দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং গবেষণার ফলাফলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
২০০৮ সনে বাংলাদেশ সরকার এই প্রযুক্তিটিকে জাতীয় কার্যক্রমে অর্ন্তভূক্ত করে উত্তরাঞ্চলের ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি আরডিআরএস রংপুরের পাঁচটি মঙ্গাপীড়িত জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২৮টি এনজিওর মাধ্যমে ৭ হাজার কৃষকের মাঝে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করে।
এভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রচলিত শস্য বিন্যাস পরিবর্তন করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপ্রবণ এলাকায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ করছে এবং বেশ কয়েকটি মানসম্পন্ন উচ্চ ফলনশীল স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যেগুলো ব্রি ধান৩৩ এর চেয়েও ফলন বেশি। কৃষক কিন্তু এখন আর ব্রি ধান৩৩ জাতের ধান আবাদ করছে না। নতুন উদ্ভাবিত স্বল্পমেয়াদি ধানের জাতগুলো আবাদ করছে। পাশাপাশি কৃষক এখন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় উন্নত জাতের স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদন করছে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে সেই পাকা ধান কাটছে।
মনে পড়ে, ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মঙ্গা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সময়, যেখানে একজন কৃষকের মাঠেও আশ্বিন-কার্তিক মাসে পাকা ধান দেখা যায়নি, সেখানে ২০২৫ সালে এসে উত্তরাঞ্চলের কৃষক কার্তিক মাসে প্রায় ৫০ ভাগ জমিতে স্বল্পমেয়াদি পাকা আমন ধান এবং স্বল্পমেয়াদি পাকা হাইব্রিড ধান কাটছে। যার ফলে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গার অবসান ঘটেছে। কৃষক এখন আশ্বিন-কার্তিক মাসসহ সারা বছরই কৃষিকাজ করছে। মঙ্গা আজ স্থায়ীভাবে দূর হয়েছে।
এই গবেষণাই মঙ্গার স্থায়ী নির্বাসনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কর্মকাণ্ড। যেটি আমার পিএইচডির গবেষণাও। মঙ্গা নিরসনে আমার এই পূর্ণাঙ্গ গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার আমাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। এজন্য আমি সরকার ও দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ আরডিআরএসএর কাছেও।
লেখক: কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষক