সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪৪, সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব

সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪৪, সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব

সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ২৫ হাজার ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করা সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল রিপোর্ট আগামীকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে পে-কমিশন। প্রস্তাবে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ জন্য সরকারের বাড়তি দরকার হবে, প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

এতে সবচেয়ে বেশি ১৪৪ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ২০তম গ্রেডে। ফলে ৮ হাজার ২০০ টাকার মূল বেতন হয়ে যাচ্ছে ২৫ হাজার ৮০০ টাকা, সর্বসাকুল্যে যা দাঁড়াতে পারে ৪২ হাজারে।

প্রস্তাবিত ২০২৫ সালের পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২.১২ থেকে ৩.১২ পর্যন্ত ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ (Fitment Factor) ধরার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বিষয়টা কী?

নতুন বেতন কাঠামোতে আগের বেতন কাঠামোর মূল বেতন যতগুণ বৃদ্ধি করা হয়, তাই হলো ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। এবারের প্রস্তাবে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.১২ থেকে ৩.১২ অর্থ হলো–আগের মূল বেতন থেকে অন্তত ২.১২ গুণ বাড়বে। আর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হবে ৩.১২ গুণ পর্যন্ত।

ফলে বিদ্যমান ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫,৮০০ টাকা এবং ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬৫,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১০ম গ্রেডের অ্যান্ট্রি পদকে ১০ম গ্রেডেই রাখা এবং ক্যাডার কর্মকর্তাদের অ্যান্ট্রি পদ ৭ম গ্রেড করার সুপারিশ করা হয়েছে।

পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট: বেতন বৈষম্য দূর করতে সকল গ্রেডের জন্য বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ন্যূনতম ৩,০০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রমোশন ট্রি’ এবং নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, যাতে একজন কর্মচারী তার সমগ্র চাকরি জীবনে অন্তত চারটি পদোন্নতি পেতে পারেন। পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল (৩ থেকে ৫ বছর) নির্ধারণের সুপারিশও করা হয়েছে।

ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা: পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষা সহায়ক ভাতা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। চিকিৎসা ভাতা হিসেবে মাসিক ৫,০০০ থেকে ৭,৫০০ টাকা ও প্রতিবন্ধী সন্তানদের ক্ষেত্রে ভাতা ১০,০০০ থেকে বাড়িয়ে ১২,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা সহায়ক ভাতা প্রতি সন্তানের জন্য ২,৫০০ টাকা এবং দুই সন্তানের জন্য ৫,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০১৫ সালের সর্বশেষ বেতন স্কেলের পর গত ১০ বছরে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়লেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। উৎসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতির পুঞ্জীভূত হার প্রায় ২.১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এবং প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে এই নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবে সচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ উচ্চতর স্কেল এবং ব্যক্তিগত পরিচারক ভাতার সুপারিশ রয়েছে। এ ছাড়া এই গ্রেডের অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের পেনশন হার ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ এবং গ্র্যাচুইটির হার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘সিভিল সার্ভিস ভাতা’ প্রবর্তনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত এ পে-স্কেল সরকারি কর্মজীবীদের খুশি করবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ডক্টর সালেহউদ্দিন আহমেদ। আগামীকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করে জাতীয় বেতন কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে বলেও জানিয়েছেন এই উপদেষ্টা।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করা হচ্ছে।

২০১৫ সালের পর আর সরকারি কর্মজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়নি। তখন ১০১ শতাংশ বাড়িয়ে নিম্ন বেতন করা হয়েছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। আর সবোর্চ্চ ৭৮ হাজার টাকা। বেতন বাড়ানো প্রয়োজন বিবেচনায় গতবছর জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা খুশি হবেন–এমন সুপারিশ থাকবে প্রতিবেদনে। তবে, এই সরকার নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা কোনো মন্তব্য না করে অপেক্ষা করতে বলেন।

২০১৫ সালের তুলনায় প্রস্তাবিত ২০২৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের একটি তুলনা করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালের বিদ্যমান কাঠামোর তুলনায় ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত কাঠামোতে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে:

সর্বনিম্ন গ্রেড (২০তম গ্রেড): ২০১৫ সালে এই গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা। ২০২৫ সালের প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ২৫,৮০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ গ্রেড (১ম গ্রেড): ২০১৫ সালে প্রথম গ্রেডের বেতন ছিল নির্ধারিত ৭৮,০০০ টাকা। ২০২৫ সালের প্রস্তাবে এটি বাড়িয়ে ১,৬৫,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বেতন বৃদ্ধির হার: ২০১৫ সালের বেতন নির্ধারণে ১.৮৮ থেকে ২.০১ ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে ২০২৫ সালের প্রস্তাবে ২.১২ থেকে ৩.১২ পর্যন্ত ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ধরার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট

২০১৫ সালের নিয়ম: বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে নির্ধারিত ছিল।

২০২৫ সালের প্রস্তাব: উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূর করতে সকল গ্রেডের জন্য ন্যূনতম ৩,০০০ টাকা বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুদ্রাস্ফীতি

উৎসগুলোতে এই বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা হিসেবে গত ১০ বছরের অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে–

মুদ্রাস্ফীতি: ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পুঞ্জীভূত মুদ্রাস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ২.১২ গুণ।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: উৎস অনুযায়ী, গত ১০ বছরে গরুর মাংসের দাম ২.১৫ গুণ, চালের দাম ১.৮৫-২.০ গুণ এবং স্বর্ণের দাম ৪.৮৫ গুণ বেড়েছে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার ১.৬২ গুণ বেড়েছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অ্যান্ট্রি পদ ও কাঠামোগত পরিবর্তন

অ্যান্ট্রি গ্রেড: ক্যাডার কর্মকর্তাদের অ্যান্ট্রি পদ ২০১৫ সালে সাধারণত ৯ম গ্রেড থাকলেও ২০২৫ সালের প্রস্তাবে তা ৭ম গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

পদোন্নতি: ২০১৫ সালের ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট পদোন্নতি নীতিমালা না থাকলেও ২০২৫ সালের প্রস্তাবে একটি প্রমোশন ট্রি তৈরির কথা বলা হয়েছে, যাতে একজন কর্মচারী চাকরি জীবনে অন্তত চারটি পদোন্নতি নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন।

পেনশন ও গ্র্যাচুইটি

অবসরোত্তর সুবিধাতেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে–

পেনশন: কমপক্ষে ২৫ বছর চাকরি করেছেন–এমন সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান পেনশনের হার ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে শতভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

গ্র্যাচুইটি: আনুতোষিক বা গ্র্যাচুইটির হার ২৩০-২৪৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭০-৩০০ গুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন প্রায় তিন গুণ এবং সর্বোচ্চ বেতন দুই গুণেরও বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে কর্মচারীরা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন।

প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল বেতন এখন সচিবদের ৭৮ হাজার টাকা। ১০৫ শতাংশ বাড়িয়ে যা প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ৬০ হাজার। এর সাথে অন্যান্য ভাতা ও আনুতোষিক মিলিয়ে একজনের মোট বেতন ছাড়াতে পারে তিন লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাবাবদ বরাদ্দ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তবে কমিশনের সুপারিশ বাস্তুবায়ন হলে এই খাতে খরচ বাড়বে আরও প্রায় ১ লাখ কোটি।

সম্পর্কিত