ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণকে নিরাপদ করতে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার, কোস্ট গার্ড এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। ভোটের দিন ছাড়াও আগের চারদিন ও পরের দুদিন মিলিয়ে টানা সাত দিন কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকবে দেশ।
নির্বাচন কমিশন (ইসি), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা ও স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদন এবং অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সারা দেশের ৪২ হাজার ৭০০ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত তিন হাজার ১৫৫টিকে ‘উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে সহিংসতা, প্রভাব বিস্তার, ব্যালট ছিনতাই, সংঘর্ষ বা নাশকতার আশঙ্কা থাকায় বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় শতাধিক আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র, থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা
পুলিশ ও ইসি সূত্রে জানা গেছে, মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র রয়েছে আট হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। অর্থাৎ মোট কেন্দ্রের বড় একটি অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এরমধ্যে তিন হাজার ১৫৫টিকে ‘উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উচ্চঝুঁকির তালিকায় থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ৮৪, পটুয়াখালীতে ৮০, কুষ্টিয়ায় ৭২ এবং ঢাকায় ৭০টি কেন্দ্র রয়েছে। রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়ে ১৪, লালমনিরহাটে ৪০, রংপুর সদরে ৩৩, গাইবান্ধায় ৩২টি কেন্দ্র উচ্চঝুঁকিতে। রাজশাহী বিভাগে বগুড়ার বিভিন্ন আসনে ৩১, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫, রাজশাহীর দুটি আসনে ২৮, নাটোরে ১৩, সিরাজগঞ্জে ১৮ ও পাবনায় ২৯টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়ায় ৭২, চুয়াডাঙ্গায় ২২, ঝিনাইদহে ২১, যশোরে ১৩, খুলনা সদরে ৫৮ এবং বাগেরহাটে ৫৯টি কেন্দ্র তালিকাভুক্ত। বরিশাল বিভাগের বরগুনায় ১৪, ঝালকাঠিতে ১৮ ও পটুয়াখালীতে ৮০টি কেন্দ্র রয়েছে উচ্চঝুঁকিতে।
ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জে ৩০, মানিকগঞ্জে ৩৪, মুন্সীগঞ্জে ১৭ ও ঢাকা সদরে ৭০টি কেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে।
সারা দেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৩টি আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা-৭, পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। মধ্যম ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি আসন। এ ছাড়াও আরও শতাধিক আসনকেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে তালিকা করা হয়েছে। এসব আসনের প্রতিটি কেন্দ্রেও থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়।
পুলিশের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মাঠপর্যায়ে পেশাদার শ্যুটার, সন্ত্রাসী ও সম্ভাব্য দখলদারদের তালিকা করে তাদের ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানও চলছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ছবি: চরচামাঠে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য
নির্বাচনকে সুস্থ ও সংঘাতমুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ সদস্যের মধ্যে ১ লাখ ৫৮ হাজার সরাসরি ভোটকেন্দ্র ও স্ট্রাইকিং ফোর্সে দায়িত্ব পালন করবেন। বাকি সদস্যরা সাপোর্ট ইউনিটে থাকবেন। সেনাবাহিনীর এক লাখ সদস্য ২০ জানুয়ারি থেকেই মাঠে কাজ করছে। বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ সদস্য, র্যাবের সাত হাজার ৭০০ সদস্য এবং কোস্ট গার্ডের তিন হাজার ৫৮৫ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
সবচেয়ে বড় জনবল দিচ্ছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী-মোট পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ সদস্য। এর মধ্যে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ জন সরাসরি ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকবেন। নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এ ছাড়াও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ হাজার ৩৯০ সদস্য প্রস্তুত রয়েছে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জন্য মাঠে থাকবে।
দেশজুড়ে ৭০০টির বেশি টহল টিম কাজ করবে। প্রতি কেন্দ্রে গড়ে ১৩ জন আনসার সদস্য থাকবেন। উপজেলা ভেদে দুই থেকে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিজিবির র্যাপিড অ্যাকশন টিম ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। র্যাবের প্রতিটি ব্যাটালিয়নে দুটি টহল টিম রিজার্ভ থাকবে এবং সদর দপ্তরে রয়েছে ১৫টি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ টিম। স্থাপন করা হয়েছে ২৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প।
প্রযুক্তির নজরদারি: বডিক্যাম ও ড্রোন
এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৫ হাজার ৫০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে ১৫ হাজার অনলাইনে যুক্ত থাকবে, বাকিগুলো অফলাইনে ভিডিও ধারণ করবে। কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে লাইভ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্যামেরায় রয়েছে নাইট ভিশন, জিপিএস ও এসওএস অ্যালার্ম সুবিধা।
আকাশপথে নজরদারির জন্য এক হাজার ড্রোন এবং বিস্ফোরক শনাক্তে ৫০টি ডগ স্কোয়াড প্রস্তুত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং টিম কাজ করছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, “শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ক্যামেরা ব্যবহার হবে।”
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, “ভোটাররা যেন শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে লক্ষ্যে বিজিবি অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করছে।”
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। ছবি: চরচাত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বড় কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যাহত করা, জালভোট, ব্যালট ছিনতাই বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জঙ্গি হামলার নির্দিষ্ট হুমকি না থাকলেও সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রয়েছে। সারা দেশের ৬৪ জেলা ও আট মেট্রোপলিটন শহরে স্ট্যাটিক ও মোবাইল টিম মোতায়েন করে তিন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা
ঢাকা মহানগরীতে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানান, মহানগরের দুই হাজার ১৩১ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৭টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ৬১৪ কেন্দ্রে চারজন করে, ৫১৭ সাধারণ কেন্দ্রে তিনজন করে এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ৩৭ কেন্দ্রে সাতজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, “ভোটকেন্দ্রের বাইরে ১৮০টি স্ট্রাইকিং টিম ও ৫১০টি মোবাইল টিম টহলে থাকবে। বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কেউ আইনশৃঙ্খলার অবনতির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মিরপুর ক্যাম্প কমান্ডার লে. কর্নেল এস এম ফুয়াদ মাসরুর জানান, ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের প্রায় ১৮ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-১৪ ও ১৬ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
নাশকতার শঙ্কা ও সতর্কতা
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সহিংসতা, টার্গেট কিলিং, ককটেল বিস্ফোরণ ও ভোটকেন্দ্র দখলের আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহন ও সংরক্ষণে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ব্যালট পেপার ও সরঞ্জাম পরিবহনে সশস্ত্র পাহারা ও নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক শাহাদাত হোসাইন (এআইজি-মিডিয়া) বলেন, “বড় কোনো শঙ্কা নেই; তবে আমরা কোনো ঝুঁকি নিচ্ছি না। সন্দেহভাজনদের ওপর কড়া নজরদারি রয়েছে।”
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি, নির্বাচন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে দমন করা হবে। ভোটারদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স, সিসিটিভি ও বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা রাখা হয়েছে।