গণভোটের ব্যালটে ক্রমিক বিতর্ক

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
গণভোটের ব্যালটে ক্রমিক বিতর্ক
প্রতীকী ছবি

প্রবাসীদের জন্য পাঠানো গণভোটের পোস্টাল ব্যালটে কোনো মুদ্রণ বা ক্রমিক নম্বর না থাকাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় সাড়ে সাত লাখ প্রবাসী ভোটারের কাছে পাঠানো গোলাপি রঙের গণভোট ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন মহল।

নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংবেদনশীল এই পর্যায়ে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর না থাকা অতিরিক্ত ব্যালট ছাপা, গোপনে ব্যালট বাক্স ভরার মতো আশঙ্কাকে উসকে দিচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেছেন সমালোচকরা।

প্রশ্ন উঠছে, গণভোটের ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকলে কীভাবে এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে যেখানে নির্দিষ্ট নিয়মে মুদ্রণ বা সিরিয়াল নম্বর থাকে, সেখানে গণভোটের ব্যালটে তা না থাকার কারণ কী—তা নিয়েও আলোচনা জোরালো হচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকলে অতিরিক্ত ব্যালট ছাপিয়ে ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ থেকে যায়, যা গণভোটের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

এই বিতর্কের একটি চিত্র পাওয়া যায় প্রবাসী লেখক মঞ্জুরে খোদা টরিকের একটি ফেসবুক পোস্টে। নিজের ডাকযোগে পাওয়া ব্যালটের ছবি প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গণভোটের ব্যালটে সিরিয়াল নাম্বার নেই কেন?” পোস্টে তিনি লেখেন, এই ব্যালটে কোনো ধরনের সিরিয়াল নম্বর নেই এবং এটি তার ব্যক্তিগত ব্যালট পেপার। তার অভিযোগ, সরকার বা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষের লোকজন চাইলে অতিরিক্ত ব্যালট ছাপিয়ে বাক্স ভরে ফেলতে পারে, তখন তা চ্যালেঞ্জ করার কোনো উপায় থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে ব্যালট পেপার, ভুয়া ব্যালট সিল পাওয়া যাওয়ার খবর এসেছে। সংসদ নির্বাচনের মূল ব্যালট পেপারে যেখানে সিরিয়াল নম্বর থাকে, সেখানে গণভোটের ব্যালটে কেন তা নেই—সে প্রশ্নের জবাব চান তিনি। পোস্টে গণভোটকে “অবৈধ” ও “দূরভিসন্ধিমূলক” উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবিও তোলেন তিনি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতর থেকেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমালেন মাছউদ চরচাকে বলেন, ‘‘গণভোটের ব্যালটে সিরিয়াল নম্বর না থাকার বিষয়ে বিস্তারিত আমার জানা নেই, এই কর্মক্ষেত্রটি আমার অধীনে নয়। ব্যালট ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নাই।’’

তবে এর আগে ২৯ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন আয়োজিত মক ভোটিংয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—দুই ধরনের ব্যালটের নমুনা প্রদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সংসদ নির্বাচনের মতোই গণভোটের ব্যালট মুড়ি বাঁধাইকৃত। দুই ভোটের মুড়ি বইয়ের কাউন্টার পার্টে মুদ্রণ সংখ্যা রয়েছে। ভোট গ্রহণের সময় কাউন্টার পার্টে ভোটারের স্বাক্ষর নেওয়ার পর ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ব্যালট অংশটি ছিঁড়ে ভোটারকে দেন। তবে সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট—দুটিতেই মূল ব্যালট অংশে কোনো মুদ্রণ বা সিরিয়াল নম্বর ছিল না বলে জানানো হয়। এই ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যালট ব্যবস্থাপনায় ক্রমিক নম্বর শুধু শনাক্তকরণের জন্য নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার হিসাব ও জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি ব্যালটের মুদ্রণ নম্বর প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের মুড়ি বইয়ের কাউন্টার পার্টে নম্বর থাকে। অপর আরেকটি নম্বর থাকে বইয়ের ওপর। গণভোটের ব্যালটের বইয়েও হয়তো একই রকম হবে।’’

তার মতে, কত সংখ্যক ব্যালট ছাপা হয়েছে, সে তথ্য কমিশন আগেই জানায়। ব্যালট বইয়ের ওপরের একটি সিরিয়াল নম্বর থাকে, যার মাধ্যমে কোন জেলায় কোন ক্রমিকের ব্যালট গেছে—সে হিসাব রাখা হয়।

নির্বাচনী অংশীজনরা বলছেন, বই বা কাউন্টার পার্টে নম্বর থাকলেও ভোটারের হাতে যাওয়া ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকলে সন্দেহ থেকেই যায়। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে, যেখানে সরাসরি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার উপস্থিতি থাকে না, সেখানে ব্যালটের প্রতিটি ধাপ আরও বেশি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

সব মিলিয়ে গণভোটের ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকা এখন শুধু একটি কারিগরি বিষয় নয়, বরং এটি গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেয় এবং কীভাবে আস্থা ফেরাতে চায়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল ও ভোটাররা।

সম্পর্কিত