Advertisement Banner

জ্বালানি সংকট: অনলাইন ক্লাসে কি বৈষম্য বাড়বে?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
জ্বালানি সংকট: অনলাইন ক্লাসে কি বৈষম্য বাড়বে?
সপ্তাহে ৩ দিন অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ছবি: চরচা

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্কুল পর্যায়ে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইনের সমন্বয়ে পাঠদান চালুর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এমন পদক্ষেপে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাংবাদিকদের জানান, আগামী বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, রমজানসহ বিভিন্ন কারণে ক্লাসে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে আগামী শনিবারও স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস চালু রাখতে গিয়ে জ্বালানি সংকট, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব—সব মিলিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, সবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে সশরীরে উপস্থিতির পাশাপাশি অনলাইনেও পাঠদান চালুর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সপ্তাহে কতদিন বা কত বেলা অনলাইনে ক্লাস হবে, তা মন্ত্রিসভার বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে।

তবে সরকারের এই ভাবনার সমালোচনা করছেন শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া অনলাইন ক্লাস চালু হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী চরচাকে বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাস আদর্শ কোনো বিকল্প নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ এবং উপযুক্ত ডিভাইস ছাড়া অনলাইন শিক্ষা কার্যকর করা সম্ভব নয়। দেশের কতজন শিক্ষার্থী বাস্তবে এই সুবিধা পাবে—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এই শিক্ষাবিদ স্মরণ করিয়ে দেন, করোনাকালে অনলাইন শিক্ষায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বস্তিবাসী শিশু, চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে সুবিধা পাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। শহরাঞ্চলেও সব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এক রকম নয়।

রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, “সবার জন্য একযোগে অনলাইন ক্লাস বাধ্যতামূলক করলে বৈষম্য প্রকট হতে পারে।” তিনি বিকল্প হিসেবে অভিজাত ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা বাধ্যতামূলক স্কুলবাস চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়।”

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, “বাসায় অনলাইন ক্লাস করলে প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ সাশ্রয় কতটা হবে, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। স্কুলে সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় বাসায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।”

এদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদও বিষয়টি সুপরিকল্পিতভাবে বিবেচনার ওপর জোর দিয়েছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ সময়কার অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা খুব ইতিবাচক ছিল না। অনেক জায়গায় কার্যক্রম সফল হলেও অনেক অঞ্চলে তা ভেঙে পড়ে এবং বৈষম্য বাড়ে।”

তার মতে, “সারা দেশে এক নীতি প্রয়োগের বদলে অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। শহরাঞ্চলে অনলাইন ক্লাস কিছুটা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায় সেই সুযোগ সীমিত।”

ড. মনজুর আহমেদ বলেন, “অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষাকে আলাদা না রেখে সমন্বিত মডেল তৈরি করতে হবে। যদি সপ্তাহে কয়েকদিন অনলাইন ক্লাস রাখা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে, তা পরে সরাসরি ক্লাসে আলোচনা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।”

মনজুর আহমেদ সতর্ক করে বলেন, “শুধু অনলাইনে লেসন দেওয়া আর অফলাইনে আলাদা করে ক্লাস নেওয়ার গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাজ হবে না। কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট বাস্তব হলেও শিক্ষা খাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং বৈষম্যের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি। তা না হলে সংকট মোকাবিলার উদ্যোগই নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।

সম্পর্কিত