ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: ভোটের মাঠে ‘লাঙ্গলের’ অবস্থা কী?

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: ভোটের মাঠে ‘লাঙ্গলের’ অবস্থা কী?

দলের বিভক্তি নিয়ে নানা নাটকীয়তার পরও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের দখল ধরে রাখতে পেরেছে জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা)। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা ৪০ থেকে ৭০টি আসন পাবে বলে আশা জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর। যদিও দেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাসের আলোচিত–সমালোচিত প্রতীকটি এবারের ভোটের পথে নতুন এক প্রেক্ষাপটের সম্মুখীন।

‘লাঙ্গল’ নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে অংশ নিতে ২২৪ জন প্রার্থী ত্রয়োদশ নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিল করেছেন। এর মধ্যে ২৫ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও ইতোমধ্যে ১৭ জন আপিলে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন। ছয়জন প্রার্থী আপিল শুনানির অপেক্ষায়, দুজন প্রার্থী উচ্চ আদালতের শরণাপণ্ন হবেন।

লাঙ্গলের প্রতিনিধিদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ উচ্চ আদালতের একটি রুল। জুলাই অভ্যুত্থানে পতনের আগে আওয়ামী লীগ সরকার আয়োজিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার খেসারত হিসেবে এখন জাপার পদে পদে বিপত্তি। জাপা প্রার্থীদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রশ্নে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের রুল, মনোনয়ন যাচাই–বাছাই, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে জাপার নির্বাচনী যাত্রা এবার বেশ চ্যালেঞ্জিং।

জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, ‘‘যারা এই মামলাটা করেছেন, তারা জাপাকে ইলেকশন থেকে দূরে রাখতে চায়। তারা এই ইলেকশন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।” রুলের শুনানিতে জাপা প্রার্থীরা বৈধ ঘোষিত হবেন বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রুলটি হয়েছে গত বছরের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে। ওই প্রজ্ঞাপনে জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামীলীগ এবং এর ভাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। অভ্যুত্থানে পতনের আগে আওয়ামী লীগ আয়োজিত তিনটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে কখনো সরকারের অংশ কখনো বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে জাপা।

লাঙ্গল আপাতত কাদেরের

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হামলা-মামলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধে জর্জরিত হয় জাপা। নির্বাচনের আগে জাপার কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাপার নতুন একটি ধারা। যারা নিজেদের লাঙ্গল প্রতীকে প্রকৃত দাবিদার বলে আসলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) জিএম কাদেরের জাপাকেই লাঙ্গল প্রতীক দিয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই–বাছাইয়ে জিএম কাদের অংশের প্রার্থীরাই লাঙ্গল প্রতীক পেয়েছেন। আর গত শনি ও রোববার বাতিল হওয়া প্রার্থীদের আপিল শুনানিতে জিএম কাদের অংশের প্রার্থীদের মনোনয়ন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরাংশের নেতা মুজিবুল হক চুন্নুর কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে দাখিল করা মনোনয়নপত্রটি দলীয় মনোনয়নপত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর ছিল না বলে বাতিল করা হয়।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “জাতীয় পার্টির মূল অংশটি জিএম কাদেরের অধীনে আছে। লাঙ্গল জিএম কাদেরের আছে এবং সেই অংশটি শক্তিশালী। আমরা চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেও ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছি।”

ইসি সূত্র জানা গেছে, ইসির ওয়েবসাইটে জাতীয় পার্টির যে তথ্য আছে, তার ওপর ভিত্তি করেই আইন অনুযায়ী কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া জিএম কাদেরের সাক্ষরে মনোনীত প্রার্থীদের লাঙ্গল প্রতীক দিতে জাপার পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র।

ইসি সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে চরচাকে বলেন, “হাইকোর্টে লাঙ্গল মার্কা নিয়ে মামলা চলছে। তবে এ নিয়ে কোনো আদেশ নেই। এটা তাদের নিজেদের বিষয়। ইসির সার্ভারে জিএম কাদেরের সাক্ষর আছে। এখন আইন অনুযায়ী যেটা হয়, সেটাই ইসি ফলো করবে।”

উত্তর আর দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘিরে ছক

জাপা সূত্রে জানা গেছে, উত্তরবঙ্গে দলের ভোট ব্যাংক এবং সাতক্ষীরা অঞ্চলে নির্বাচনী ফলাফলের ইতিহাস মাথায় রেখে ভোটের মাঠে নামছে দলটি। এর সঙ্গে ভোটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের ভোটারদের গন্তব্যও জাপার দিকেই ঝুঁকবে বলে আশা করছেন নেতারা। সুষ্ঠু নির্বাচন ও সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি হলে লাঙ্গলের প্রকৃত শক্তি কতটা, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাবে ভোটের ফলাফলে।

গতকাল ইসির আপিলে গিয়ে শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, “যদি সুষ্ঠু ভোট হয়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে, আমি মনে করি ৪০ থেকে ৭০টি আসন পাব।” ভোটের প্রস্তুতি জানতে চাইলে তিনি চরচাকে দলের পুরোনো ভোট ব্যাংকের ওপর ভিত্তি করে জয়ের আশার কথা জানান।

চরচাকে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “রংপুর ও সাতক্ষীরায় আমাদের ভালো প্রার্থী রয়েছেন। সিলেটসহ কয়েকটি অঞ্চলে আমাদের প্রার্থীরা কাজ করছেন। সুষ্ঠু ভোট হলে জাপা অনেক জায়গায় ভালো করবে।”

আওয়ামী লীগ ভোটে অনুপস্থিত থাকায় তাদের ভোট জাপার পক্ষে যাবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা একাত্তরের পক্ষের শক্তি হিসেবে ভোটে নেমেছি। একাত্তরের পক্ষের শক্তিরা আমাদের ভোট দেবে আশা করতেই পারি। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলার কিছু নেই।”

সম্পর্কিত