হাজাল ইয়ালিন

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত যতই তীব্র হচ্ছে, ততই এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত গভীরতর হচ্ছে। এই যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করার বদলে বরং মস্কো-তেহরান অক্ষকে আরও সুসংহত করছে এবং কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলকে একটি নতুন কৌশলগত সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত করছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের প্রত্যাশিত ফলাফল উল্টো দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষের বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা বোঝা যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার পরপরই মস্কো এটিকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দেয়–যা কেবল একটি কূটনৈতিক শব্দ নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একটি গুরুতর অভিযোগ। জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ শক্তি প্রয়োগ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শুরুতে খুব কম দেশই এই শব্দটি ব্যবহার করেছিল; এমনকি চীনও কিছুটা সময় নিয়ে একই অবস্থান নেয়। ফলে, রাশিয়ার এই অবস্থান শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং একটি নীতিগত অবস্থান– যা ইরানের প্রতি তার সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে।
তবে মস্কো খুব সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখছে। একদিকে, তারা ইরানের ওপর হামলাকে নিন্দা করছে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চাইছে না। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলাও সবসময় সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু সেটিকে একতরফাভাবে নিন্দা করা মানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া। এই অবস্থান রাশিয়ার কৌশলগত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে– যেখানে তারা একদিকে ইরানের পাশে দাঁড়াচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্যও বজায় রাখছে।
কিন্তু এই ভারসাম্য দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে কাস্পিয়ান অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে। ইরানের বন্দর আনজালিতে ইসরায়েলের হামলা এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং রাশিয়া-ইরান বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি প্রধান কেন্দ্র। ফলে, এই হামলা সরাসরি রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থকে আঘাত করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি কাস্পিয়ান সাগরের সেই বিশেষ আইনি কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে বহিরাগত শক্তির সামরিক উপস্থিতি নিষিদ্ধ।
২০১৮ সালের কাস্পিয়ান কনভেনশন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে শুধুমাত্র উপকূলবর্তী পাঁচটি দেশ–রাশিয়া, ইরান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। কোনো বহিরাগত শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ এই কাঠামোর পরিপন্থী। ফলে, ইসরায়েলের এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ওপরও আঘাত। এটি কাস্পিয়ানকে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ থেকে সম্ভাব্য সংঘর্ষক্ষেত্রে রূপান্তরিত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই তীব্র। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে। কিন্তু আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য কাস্পিয়ান রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা। এই নীরবতা হয়ত কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফল। কিন্তু তা একইসঙ্গে একটি ক্ষমতার শূন্যতাও নির্দেশ করে, যেখানে রাশিয়া ও ইরান নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও এই সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত রাশিয়া-ইরান ‘সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তি এই সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। যদিও এটি সরাসরি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, তবুও এতে সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করবে–যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সহযোগিতা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে কাস্পিয়ান করিডর এখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও সামরিক সরবরাহের প্রধান পথ। ফলে, এই করিডরে আঘাত মানে সরাসরি তাদের কৌশলগত সক্ষমতায় আঘাত। এ কারণেই আনজালিতে হামলা রাশিয়ার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ–এটি কেবল একটি বন্দর নয়, বরং একটি জিও-স্ট্র্যাটেজিক লাইফলাইন বা ভূ-কৌশলগত প্রাণভোমরা।
পাশাপাশি, গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়েও এক ধরনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রাখা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইরান কেউই সরাসরি স্বীকার করছে না যে তারা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে। কিন্তু তারা এটি অস্বীকারও করছে না। এই ধরনের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি একটি সচেতন কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তায় রাখে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশ্চিমা বর্ণনার ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া-ইরান সহযোগিতাকে ‘অবৈধ’ বা ‘চোরাচালান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে, দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী নয়। ফলে, এই বয়ানকে অনেকেই একটি তথ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছেন।
সবশেষে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো সামরিক নয়, বরং কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তা উল্টোভাবে রাশিয়া ও ইরানকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এই নতুন অক্ষ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং বৃহত্তর ইউরেশীয় ভূ-রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একটি আরও মজবুত রাশিয়া-ইরান জোট দেখতে পারি, যা পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। একটি অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো ক্রমশ আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে, তা সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সার্বিকভাবে, এই বিশ্লেষণ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়–যুদ্ধের ফলাফল সবসময় পূর্বানুমানযোগ্য নয়। কখনো কখনো, একটি সংঘাত প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার বদলে তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান ঘনিষ্ঠতা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
লেখক: ইতিহাসের গবেষক ও লেখক।
(দ্য ক্রেডেল অবলম্বনে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত।)

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত যতই তীব্র হচ্ছে, ততই এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত গভীরতর হচ্ছে। এই যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করার বদলে বরং মস্কো-তেহরান অক্ষকে আরও সুসংহত করছে এবং কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলকে একটি নতুন কৌশলগত সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত করছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের প্রত্যাশিত ফলাফল উল্টো দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষের বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা বোঝা যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার পরপরই মস্কো এটিকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দেয়–যা কেবল একটি কূটনৈতিক শব্দ নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একটি গুরুতর অভিযোগ। জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ শক্তি প্রয়োগ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শুরুতে খুব কম দেশই এই শব্দটি ব্যবহার করেছিল; এমনকি চীনও কিছুটা সময় নিয়ে একই অবস্থান নেয়। ফলে, রাশিয়ার এই অবস্থান শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং একটি নীতিগত অবস্থান– যা ইরানের প্রতি তার সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে।
তবে মস্কো খুব সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখছে। একদিকে, তারা ইরানের ওপর হামলাকে নিন্দা করছে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চাইছে না। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলাও সবসময় সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু সেটিকে একতরফাভাবে নিন্দা করা মানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া। এই অবস্থান রাশিয়ার কৌশলগত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে– যেখানে তারা একদিকে ইরানের পাশে দাঁড়াচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্যও বজায় রাখছে।
কিন্তু এই ভারসাম্য দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে কাস্পিয়ান অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে। ইরানের বন্দর আনজালিতে ইসরায়েলের হামলা এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং রাশিয়া-ইরান বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি প্রধান কেন্দ্র। ফলে, এই হামলা সরাসরি রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থকে আঘাত করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি কাস্পিয়ান সাগরের সেই বিশেষ আইনি কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে বহিরাগত শক্তির সামরিক উপস্থিতি নিষিদ্ধ।
২০১৮ সালের কাস্পিয়ান কনভেনশন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে শুধুমাত্র উপকূলবর্তী পাঁচটি দেশ–রাশিয়া, ইরান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। কোনো বহিরাগত শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ এই কাঠামোর পরিপন্থী। ফলে, ইসরায়েলের এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ওপরও আঘাত। এটি কাস্পিয়ানকে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ থেকে সম্ভাব্য সংঘর্ষক্ষেত্রে রূপান্তরিত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই তীব্র। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে। কিন্তু আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য কাস্পিয়ান রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা। এই নীরবতা হয়ত কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফল। কিন্তু তা একইসঙ্গে একটি ক্ষমতার শূন্যতাও নির্দেশ করে, যেখানে রাশিয়া ও ইরান নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও এই সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত রাশিয়া-ইরান ‘সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তি এই সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। যদিও এটি সরাসরি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, তবুও এতে সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করবে–যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সহযোগিতা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে কাস্পিয়ান করিডর এখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও সামরিক সরবরাহের প্রধান পথ। ফলে, এই করিডরে আঘাত মানে সরাসরি তাদের কৌশলগত সক্ষমতায় আঘাত। এ কারণেই আনজালিতে হামলা রাশিয়ার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ–এটি কেবল একটি বন্দর নয়, বরং একটি জিও-স্ট্র্যাটেজিক লাইফলাইন বা ভূ-কৌশলগত প্রাণভোমরা।
পাশাপাশি, গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়েও এক ধরনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রাখা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইরান কেউই সরাসরি স্বীকার করছে না যে তারা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে। কিন্তু তারা এটি অস্বীকারও করছে না। এই ধরনের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি একটি সচেতন কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তায় রাখে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশ্চিমা বর্ণনার ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া-ইরান সহযোগিতাকে ‘অবৈধ’ বা ‘চোরাচালান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে, দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী নয়। ফলে, এই বয়ানকে অনেকেই একটি তথ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছেন।
সবশেষে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো সামরিক নয়, বরং কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তা উল্টোভাবে রাশিয়া ও ইরানকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এই নতুন অক্ষ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং বৃহত্তর ইউরেশীয় ভূ-রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একটি আরও মজবুত রাশিয়া-ইরান জোট দেখতে পারি, যা পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। একটি অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো ক্রমশ আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে, তা সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সার্বিকভাবে, এই বিশ্লেষণ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়–যুদ্ধের ফলাফল সবসময় পূর্বানুমানযোগ্য নয়। কখনো কখনো, একটি সংঘাত প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার বদলে তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান ঘনিষ্ঠতা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
লেখক: ইতিহাসের গবেষক ও লেখক।
(দ্য ক্রেডেল অবলম্বনে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত।)