Advertisement Banner

ফ্যাটি লিভার কী, ঝুঁকি এড়াতে যা করবেন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ফ্যাটি লিভার কী, ঝুঁকি এড়াতে যা করবেন
ফ্যাটি লিভার বা স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ হলো লিভারে চর্বি জমা। প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক

বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বাড়ছে নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত ফ্যাটি লিভার রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের মতো কারণেই লিভারে চর্বি জমে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে সময়মতো শনাক্ত ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে অনেক ক্ষেত্রেই এর ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আমেরিকার স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভার বা স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ হলো লিভারে চর্বি জমা। একটি সুস্থ ও কার্যকর লিভারে অল্প পরিমাণ চর্বি থাকতে পারে। তবে লিভারের মোট ওজনের ৫ শতাংশের বেশি চর্বি জমলে তা সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।

রোগের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকরা ফ্যাটি লিভারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।

অ্যালকোহল-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার

এই ধরনের রোগে অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে লিভারে চর্বি জমে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, লিভার যখন অ্যালকোহল পরিশোধন (ফিল্টার) করে, তখন কিছু কোষ নষ্ট হয়। সাধারণত নতুন কোষ তৈরি হয়ে ক্ষতি পুষিয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ক্ষেত্রে লিভার সেই সক্ষমতা হারালে চর্বি জমতে শুরু করে।

মেটাবলিক ডিসফাংশন-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার

এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যালকোহল নয়, বরং কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি–যেমন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা হলো লিভারে চর্বি জমার মূল কারণ। এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে: স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, লিপিডের (লিপিড বলতে কোষে উপস্থিত চর্বিসদৃশ পদার্থকে বোঝায়) অস্বাভাবিকতা। তুলনামূলক কম পরিমাণ অ্যালকোহল গ্রহণ করলেও এটি হতে পারে।

মেটাবলিক ডিসফাংশন-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারের সমস্যা আরও বাড়লে লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ তৈরি হয়, যা পরে টিস্যুর ক্ষতি ও দাগ (ফাইব্রোসিস) সৃষ্টি করে।

মেটাবলিক ঝুঁকি অ্যালকোহলের সম্মিলিত প্রভাব

এই ধরনের রোগে কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি ও অ্যালকোহল–দুইয়ের প্রভাবেই লিভারে চর্বি জমে। এ ক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে অন্তত একটি মেটাবলিক ঝুঁকি থাকে এবং একই সঙ্গে তুলনামূলক বেশি অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকে।

চিকিৎসকদের মতে, অ্যালকোহল বা মেটাবলিক ঝুঁকি–কোনটি বেশি ভূমিকা রাখবে, তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক
প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক

অন্যান্য ধরন

অ্যালকোহল বা মেটাবলিক ঝুঁকি ছাড়াও কিছু ওষুধ বা রোগের কারণে লিভারে চর্বি জমতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায় না। এ ধরনের অবস্থাকে ক্রিপ্টোজেনিক ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

লক্ষণ উপসর্গ

ফ্যাটি লিভার সব সময় উপসর্গ তৈরি করে না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে সেগুলো হতে পারে–

  • পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা বা ভরা ভরা অনুভূতি
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা (ফ্যাটিগ)

সাধারণত রোগটি লিভারের সিরোসিসে পরিণত হলে উপসর্গ বেশি স্পষ্ট হয়। তখন দেখা দিতে পারে–

  • বমিভাব
  • ক্ষুধামন্দা
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
  • পেটে পানি জমা
  • পা, পায়ের পাতা বা হাতে ফোলা
  • খাদ্যনালী, পাকস্থলী বা মলদ্বারে রক্তক্ষরণ (চিকিৎসক পরীক্ষায় শনাক্ত করেন)

ফ্যাটি লিভার হওয়ার কারণ

ফ্যাটি লিভারের একাধিক কারণ রয়েছে। তবে যাদের কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি আছে, যারা অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করেন বা উভয়ই– তাদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি বলে সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা।

যেসব কারণে ফ্যাটি লিভার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি–

  • অতিরিক্ত বা নিয়মিত অ্যালকোহল সেবন
  • মেটাবলিক সিনড্রোম (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড)
  • টাইপ-২ ডায়াবেটিস
  • অতিরিক্ত ওজন
  • স্থূলতা (বিএমআই ৩০ বা তার বেশি)
  • পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)
  • অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া হল এমন একটি অবস্থা যেখানে ঘুমের সময় বারবার শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়)
  • হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড হরমোন কম থাকা)
  • হাইপোপিটুইটারিজম (পিটুইটারি হরমোন কম থাকা)
  • হাইপোগোনাডিজম (যৌন হরমোন কম থাকা)
  • কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন, যেমন: অ্যামিওডারোন, ডিলটিয়াজেম, ট্যামোজিফেন বা স্টেরয়েড–যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় লিভারে চর্বি জমতে পারে।
প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক
প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, চিকিৎসা না নিলে ফ্যাটি লিভার ধীরে ধীরে লিভারের সিরোসিসে রূপ নিতে পারে, যা থেকে লিভার বিকল হওয়া, লিভার ক্যানসার এমনকি শরীরের অন্য অঙ্গেও ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, মেটাবলিক ডিসফাংশন-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগের ঝুঁকিও বেশি থাকে। এ ক্ষেত্রে লিভারের রোগ নয়, বরং হৃদরোগই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায়।

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা

চিকিৎসকরা জানান, ফ্যাটি লিভারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা একক চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। তাই রোগটির ঝুঁকি তৈরি করে এমন কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে। সেই সঙ্গে ওজন কমাতে হবে। এজন্য নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন (পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে) এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সার্জারির কথাও বিবেচনা করা হয়।

এ ছাড়া ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই এবং থায়াজোলিডিনডায়োনস শ্রেণির ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।

পাশাপাশি হেপাটাইটিস এ ও বি-এর টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ লিভারের রোগ থাকলে এসব সংক্রমণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তাছাড়া, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় লিভারে চর্বি জমলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন করতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।

ফ্যাটি লিভারকে ভবিষ্যতের মারাত্মক লিভার জটিলতার আগাম সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা মানেই তাৎক্ষণিকভাবে সিরোসিস তৈরি হওয়া নয়, তবে এটি উপেক্ষা করলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, রোগীদের উচিত নিজেদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং লিভারে প্রদাহ বা সিরোসিস তৈরির সম্ভাবনা আছে কি না তা নির্ধারণে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা। সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে লিভার সুরক্ষিত রাখা, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং গুরুতর জটিলতা– এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব।

সম্পর্কিত