মুরাদ সাদিগজাদে

ইরানকে ঘিরে যা ঘটছে, তা কেবল আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়। এটি আটলান্টিক-কেন্দ্রিক বিশ্বের রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং নৈতিক সংহতির একটি গভীর পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থেকে উদ্ভূত বিস্তৃত সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক সংকটের চেয়েও অনেক বড় কিছু উন্মোচিত করছে। এটি এমন এক সময়ে পশ্চিমা ঐক্যের দ্রুত ভাঙন প্রকাশ করছে, যখন অবাধ আমেরিকান আধিপত্যের পুরোনো কাঠামো দৃশ্যত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই অর্থে, ইরানের ওপর হামলা শুধু একটি থিয়েটারে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনা নয়। এটি ন্যাটোর জন্য, ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে পশ্চিমা কৌশলগত ঐক্যের দাবির জন্য একটি ঐতিহাসিক চাপ-পরীক্ষা।
দশকের পর দশক ধরে, ন্যাটো জোট একটি সহজ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেবে, ইউরোপ অনুসরণ করবে এবং মতবিরোধ থাকলেও কাঠামো টিকে থাকবে। কারণ সবাই বিশ্বাস করত, আমেরিকার প্রাধান্য টিকিয়ে রাখাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা করা। এই সূত্রটি এখন বাস্তব সময়েই ভেঙে পড়ছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এটি আর অস্বীকার করার সুযোগ রাখেনি। পশ্চিম ইউরোপের নেতারা আর শুধু নীরব অস্বস্তি বা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন না। তারা প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে এমন এক মার্কিন সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে অস্বীকার করছেন, যার লক্ষ্য তারা বোঝেন না, যার পরিণতি তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, এবং যার খরচ শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হবে। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেন– সবাই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় নেতারা মূলত বলেছেন–এটি তাদের যুদ্ধ নয়, ইউরোপকে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং ওয়াশিংটন কোনো বিশ্বাসযোগ্য সাফল্যের পরিকল্পনা দেয়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বিরোধ শুধু কৌশলগত নয়। এটি জোট রাজনীতির মূলে আঘাত করে। যদি ওয়াশিংটন বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন একটি সংঘাত শুরু করে এবং পরে মিত্রদের সমর্থন দাবি করে, আর তা পরামর্শ বা বিশ্বাসযোগ্য সমাপ্তি পরিকল্পনা ছাড়াই–তাহলে ন্যাটো আর সমন্বিত কৌশলের জোট থাকে না। বরং এটি এক ধরনের সাম্রাজ্যিক আদেশ ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ইউরোপীয়রা এটি বুঝতে পেরেছে। তাদের প্রত্যাখ্যান একটি বার্তা–যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ মিত্রদের সার্বভৌম অংশীদার নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ব্যবহারযোগ্য উপকরণ হিসেবে দেখছে। যখন কৌশলগত কেন্দ্র অস্থির, একতরফা এবং ঝুঁকি বাইরে ঠেলে দিতে প্রস্তুত হয়, তখন প্রান্তিক অংশ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। যখন ন্যাটো সদস্যরা ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করে, তখন ট্রাম্প জোটের রক্ষকের মতো প্রতিক্রিয়া দেননি। বরং তিনি ক্ষুব্ধ পৃষ্ঠপোষকের মতো আচরণ করেছেন। এটা এমন যে, তার অধীনস্থরা আদেশ মানেনি। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, তিনি ন্যাটোর এই অস্বীকৃতিকে ‘মূর্খতা’ বলেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন–কথায় সবাই সমর্থন করলেও কাজে সাহায্য করতে চায়নি, যা যুক্তরাষ্ট্র মনে রাখবে। একই পরিবেশে তিনি ইঙ্গিত দেন, আমেরিকার সামরিক শক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোর প্রয়োজন নেই। ওয়াশিংটন ক্রমশ নিজের মিত্রদের হুমকি দেওয়া, অপমান করা বা ত্যাগ করতে প্রস্তুত–যখন তারা আর কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় থাকে না।
এই কারণেই বর্তমান বিভাজন এত গুরুতর। এটি শুধু ইউরোপের যুদ্ধ প্রত্যাখ্যান নয়। এটি এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া–যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উত্তেজনা কমানোর চেয়ে ন্যাটোর ঐক্য ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত। অর্থাৎ, আমেরিকা নিজের স্বাধীন পদক্ষেপ বজায় রাখতে চাইলে মিত্রদের স্বাচ্ছন্দ্য, স্থিতিশীলতা, এমনকি জোটের রাজনৈতিক ভিত্তিও ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ইতিহাসে সাম্রাজ্যের পতন প্রায় এমনই হয়–উত্থানের সময় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, পতনের সময় সেগুলোর অর্থ হারিয়ে যায়। ন্যাটো তখন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়, বরং আমেরিকার শক্তির প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে ওঠে।
এই নীতির অর্থনৈতিক পরিণতিও কূটনৈতিক পরিণতির মতোই গুরুতর। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ইতিমধ্যে জ্বালানি বাজারে বড় আঘাত হেনেছে। ইরান নতুন হামলার হুমকি দেওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি বাণিজ্য হয়–সেটিও চাপে রয়েছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাতের মতো।
ইউরোপের দুর্বলতা শুধু সরাসরি তেল আমদানির ওপর নির্ভর করে না। যদিও ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাত্র ৬% তেল সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে, তবুও বিশ্ববাজারের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, বীমা এবং বিকল্প সরবরাহের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইউরোপ এই সংকটে আক্রান্ত হয়।
গ্যাস ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ২০২৫ সালে ইউরোপের গ্যাস আমদানির ৪৫% এলএনজি ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৫৮%, রাশিয়া ১৪% এবং কাতার ৮% সরবরাহ করে। সরাসরি নির্ভরতা কম হলেও, বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সংকট তৈরি হলে ইউরোপ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তুরস্ক আরও বেশি ঝুঁকিতে, কারণ এটি জ্বালানি পরিবহন, বাণিজ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। তুরস্ক তার প্রায় ৯৯% গ্যাস আমদানি করে এবং এলএনজি এর বড় অংশ। ফলে এই সংকটের প্রভাব সরাসরি সেখানে পড়ে।
জ্বালানি কখনো শুধু জ্বালানি নয়–এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে সার, প্লাস্টিক, পরিবহন, কৃষি, খাদ্য–সবকিছুর খরচ বাড়ে। ফলে এটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় কাঠামোগত সংকট তৈরি করে।
সারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গ্যাসের দাম বাড়লে সার উৎপাদন কমে, খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং ফলন কমতে পারে। ফলে একটি যুদ্ধ সরাসরি খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরে বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করে এবং এই কৃষি পুরোপুরি জ্বালানিনির্ভর। তাই জ্বালানি সংকট সরাসরি খাদ্যের দাম বাড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা শুধু অর্থনীতি নয়, ইউরোপের সামরিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে। অস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন জ্বালানি, কাঁচামাল ও শিল্প অবকাঠামো–যা এই সংকটে চাপে পড়বে। ফলে ইউক্রেনসহ অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপের সহায়তা কমে যেতে পারে।
এই কারণে ইউরোপের প্রত্যাখ্যান এত স্পষ্ট। তারা শুধু যুদ্ধ এড়াতে চায় না, বরং নিজেদের ক্ষতি থেকেও বাঁচতে চায়। এখানে একটি ঐতিহাসিক বিদ্রূপ রয়েছে। ন্যাটো জোটকে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক বলা হতো। কিন্তু সংকটে ওয়াশিংটনের ভাষা এখন অনেক বেশি জবরদস্তিমূলক। এর ফলাফল সাময়িক বিরোধের চেয়েও বড় হতে পারে। এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে ক্ষমতা বহু কেন্দ্রে বিভক্ত হবে এবং পশ্চিমা ঐক্য আর স্বয়ংক্রিয় থাকবে না। এই রূপান্তর শান্ত হবে না–বরং অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে। এ কারণেই বর্তমান উত্তেজনা এত বিপজ্জনক। এটি আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে– যেখানে জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও জোট সবকিছুই অস্থির হয়ে উঠবে।
তবে এই বিপদের মধ্যেই নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে নতুন বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা দেখা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়টি হলো–ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ শুধু ইরানকে নিয়ে নয়। এটি পশ্চিমা ঐক্যের অবসান, আমেরিকার একতরফা নীতির মূল্য এবং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্মযন্ত্রণা নিয়ে।
লেখক: মস্কোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডিল ইস্ট স্ট্যাডিজ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট, যা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতা ও রাজনীতি বোঝার জন্য কাজ করে।
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে এবং সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত।)

ইরানকে ঘিরে যা ঘটছে, তা কেবল আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়। এটি আটলান্টিক-কেন্দ্রিক বিশ্বের রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং নৈতিক সংহতির একটি গভীর পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থেকে উদ্ভূত বিস্তৃত সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক সংকটের চেয়েও অনেক বড় কিছু উন্মোচিত করছে। এটি এমন এক সময়ে পশ্চিমা ঐক্যের দ্রুত ভাঙন প্রকাশ করছে, যখন অবাধ আমেরিকান আধিপত্যের পুরোনো কাঠামো দৃশ্যত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই অর্থে, ইরানের ওপর হামলা শুধু একটি থিয়েটারে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনা নয়। এটি ন্যাটোর জন্য, ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে পশ্চিমা কৌশলগত ঐক্যের দাবির জন্য একটি ঐতিহাসিক চাপ-পরীক্ষা।
দশকের পর দশক ধরে, ন্যাটো জোট একটি সহজ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেবে, ইউরোপ অনুসরণ করবে এবং মতবিরোধ থাকলেও কাঠামো টিকে থাকবে। কারণ সবাই বিশ্বাস করত, আমেরিকার প্রাধান্য টিকিয়ে রাখাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা করা। এই সূত্রটি এখন বাস্তব সময়েই ভেঙে পড়ছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এটি আর অস্বীকার করার সুযোগ রাখেনি। পশ্চিম ইউরোপের নেতারা আর শুধু নীরব অস্বস্তি বা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন না। তারা প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে এমন এক মার্কিন সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে অস্বীকার করছেন, যার লক্ষ্য তারা বোঝেন না, যার পরিণতি তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, এবং যার খরচ শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হবে। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেন– সবাই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় নেতারা মূলত বলেছেন–এটি তাদের যুদ্ধ নয়, ইউরোপকে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং ওয়াশিংটন কোনো বিশ্বাসযোগ্য সাফল্যের পরিকল্পনা দেয়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বিরোধ শুধু কৌশলগত নয়। এটি জোট রাজনীতির মূলে আঘাত করে। যদি ওয়াশিংটন বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন একটি সংঘাত শুরু করে এবং পরে মিত্রদের সমর্থন দাবি করে, আর তা পরামর্শ বা বিশ্বাসযোগ্য সমাপ্তি পরিকল্পনা ছাড়াই–তাহলে ন্যাটো আর সমন্বিত কৌশলের জোট থাকে না। বরং এটি এক ধরনের সাম্রাজ্যিক আদেশ ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ইউরোপীয়রা এটি বুঝতে পেরেছে। তাদের প্রত্যাখ্যান একটি বার্তা–যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ মিত্রদের সার্বভৌম অংশীদার নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ব্যবহারযোগ্য উপকরণ হিসেবে দেখছে। যখন কৌশলগত কেন্দ্র অস্থির, একতরফা এবং ঝুঁকি বাইরে ঠেলে দিতে প্রস্তুত হয়, তখন প্রান্তিক অংশ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। যখন ন্যাটো সদস্যরা ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করে, তখন ট্রাম্প জোটের রক্ষকের মতো প্রতিক্রিয়া দেননি। বরং তিনি ক্ষুব্ধ পৃষ্ঠপোষকের মতো আচরণ করেছেন। এটা এমন যে, তার অধীনস্থরা আদেশ মানেনি। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, তিনি ন্যাটোর এই অস্বীকৃতিকে ‘মূর্খতা’ বলেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন–কথায় সবাই সমর্থন করলেও কাজে সাহায্য করতে চায়নি, যা যুক্তরাষ্ট্র মনে রাখবে। একই পরিবেশে তিনি ইঙ্গিত দেন, আমেরিকার সামরিক শক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোর প্রয়োজন নেই। ওয়াশিংটন ক্রমশ নিজের মিত্রদের হুমকি দেওয়া, অপমান করা বা ত্যাগ করতে প্রস্তুত–যখন তারা আর কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় থাকে না।
এই কারণেই বর্তমান বিভাজন এত গুরুতর। এটি শুধু ইউরোপের যুদ্ধ প্রত্যাখ্যান নয়। এটি এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া–যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উত্তেজনা কমানোর চেয়ে ন্যাটোর ঐক্য ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত। অর্থাৎ, আমেরিকা নিজের স্বাধীন পদক্ষেপ বজায় রাখতে চাইলে মিত্রদের স্বাচ্ছন্দ্য, স্থিতিশীলতা, এমনকি জোটের রাজনৈতিক ভিত্তিও ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ইতিহাসে সাম্রাজ্যের পতন প্রায় এমনই হয়–উত্থানের সময় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, পতনের সময় সেগুলোর অর্থ হারিয়ে যায়। ন্যাটো তখন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়, বরং আমেরিকার শক্তির প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে ওঠে।
এই নীতির অর্থনৈতিক পরিণতিও কূটনৈতিক পরিণতির মতোই গুরুতর। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ইতিমধ্যে জ্বালানি বাজারে বড় আঘাত হেনেছে। ইরান নতুন হামলার হুমকি দেওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি বাণিজ্য হয়–সেটিও চাপে রয়েছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাতের মতো।
ইউরোপের দুর্বলতা শুধু সরাসরি তেল আমদানির ওপর নির্ভর করে না। যদিও ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাত্র ৬% তেল সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে, তবুও বিশ্ববাজারের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, বীমা এবং বিকল্প সরবরাহের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইউরোপ এই সংকটে আক্রান্ত হয়।
গ্যাস ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ২০২৫ সালে ইউরোপের গ্যাস আমদানির ৪৫% এলএনজি ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৫৮%, রাশিয়া ১৪% এবং কাতার ৮% সরবরাহ করে। সরাসরি নির্ভরতা কম হলেও, বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সংকট তৈরি হলে ইউরোপ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তুরস্ক আরও বেশি ঝুঁকিতে, কারণ এটি জ্বালানি পরিবহন, বাণিজ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। তুরস্ক তার প্রায় ৯৯% গ্যাস আমদানি করে এবং এলএনজি এর বড় অংশ। ফলে এই সংকটের প্রভাব সরাসরি সেখানে পড়ে।
জ্বালানি কখনো শুধু জ্বালানি নয়–এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে সার, প্লাস্টিক, পরিবহন, কৃষি, খাদ্য–সবকিছুর খরচ বাড়ে। ফলে এটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় কাঠামোগত সংকট তৈরি করে।
সারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গ্যাসের দাম বাড়লে সার উৎপাদন কমে, খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং ফলন কমতে পারে। ফলে একটি যুদ্ধ সরাসরি খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরে বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করে এবং এই কৃষি পুরোপুরি জ্বালানিনির্ভর। তাই জ্বালানি সংকট সরাসরি খাদ্যের দাম বাড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা শুধু অর্থনীতি নয়, ইউরোপের সামরিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে। অস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন জ্বালানি, কাঁচামাল ও শিল্প অবকাঠামো–যা এই সংকটে চাপে পড়বে। ফলে ইউক্রেনসহ অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপের সহায়তা কমে যেতে পারে।
এই কারণে ইউরোপের প্রত্যাখ্যান এত স্পষ্ট। তারা শুধু যুদ্ধ এড়াতে চায় না, বরং নিজেদের ক্ষতি থেকেও বাঁচতে চায়। এখানে একটি ঐতিহাসিক বিদ্রূপ রয়েছে। ন্যাটো জোটকে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক বলা হতো। কিন্তু সংকটে ওয়াশিংটনের ভাষা এখন অনেক বেশি জবরদস্তিমূলক। এর ফলাফল সাময়িক বিরোধের চেয়েও বড় হতে পারে। এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে ক্ষমতা বহু কেন্দ্রে বিভক্ত হবে এবং পশ্চিমা ঐক্য আর স্বয়ংক্রিয় থাকবে না। এই রূপান্তর শান্ত হবে না–বরং অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে। এ কারণেই বর্তমান উত্তেজনা এত বিপজ্জনক। এটি আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে– যেখানে জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও জোট সবকিছুই অস্থির হয়ে উঠবে।
তবে এই বিপদের মধ্যেই নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে নতুন বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা দেখা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়টি হলো–ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ শুধু ইরানকে নিয়ে নয়। এটি পশ্চিমা ঐক্যের অবসান, আমেরিকার একতরফা নীতির মূল্য এবং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্মযন্ত্রণা নিয়ে।
লেখক: মস্কোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডিল ইস্ট স্ট্যাডিজ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট, যা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতা ও রাজনীতি বোঝার জন্য কাজ করে।
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে এবং সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত।)